Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

বিশেষ প্রতিবেদন

পুরুষের আফসোস: বাসায় থাকার চেয়ে অফিসে যাওয়াই ভালো

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম

পুরুষের আফসোস: বাসায় থাকার চেয়ে অফিসে যাওয়াই ভালো

বিজ্ঞাপন

সামছুল আলম শিমুল

এমনিতেই ছুটির দিন, তার ওপর সকাল থেকেই ঝুম বৃষ্টি। ঘুম থেকে উঠেই সারাদিনের কর্মসূচি ঠিক করে ফেললাম ঘুম, ঘুম, আবার ঘুম। মাঝে ক্ষুধা লাগলে একটু খাওয়া, তারপর আবার ঘুম। এত নিখুঁত পরিকল্পনা জীবনে আর কোনো দিন করতে পেরেছি বলে মনে পড়ে না।

কিন্তু কবি যেমন বলেছেন, যাহা চাই তাহা পাই না...। ঠিক তেমনি আমি চেয়েছিলাম ঘুম, কিন্তু পেলাম একখানা ছাতা আর বাজারের লিস্ট।

বউ বললো, তাড়াতাড়ি বাজারে যাও। ঘরে চাল ছাড়া কিছুই নেই। আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে বললাম, এই বৃষ্টিতে দোকানপাট খোলা থাকবে?

বউ বললো,না থাকলে না খেয়েই থাকবে।

করুন সুরে বললাম, অন্য কোনো অপশন?

বউ বললো, আছে। বাজারে যাও... অথবা না খেয়ে থাকো। চয়েস ইজ ইয়োরস।

গণতান্ত্রিকভাবে আমাকে একনায়কতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হলো। ছাতা হাতে বেরিয়ে ভাবলাম, আজ নিশ্চয়ই বাজারে ভিড় কম হবে। বাজারে ঢুকেই বুঝলাম, দেশের বাকি মানুষও সম্ভবত একই বুদ্ধি নিয়ে বেরিয়েছে।

একজনের ছাতার পানি আমার ঘাড়ে পড়ছে, আরেকজনের বাজারের ব্যাগ হাঁটুতে ধাক্কা দিচ্ছে। মাছওয়ালা এমনভাবে ইলিশ ধরিয়ে দিল, যেন আমি না কিনলে মাছটার আত্মসম্মানেই আঘাত লাগবে। সবজিওয়ালা লাউ হাতে দিয়ে এমনভাবে তাকিয়ে রইলো, মনে হলো লাউটার ভবিষ্যৎ এখন আমার হাতেই।

বাজার শেষে ব্যাগের ওজন দেখে মনে হলো, আমি বাজার করে ফিরছি না; পুরো মহল্লার রেশন নিয়ে ফিরছি। ছাতাটাও যথাসাধ্য চেষ্টা করছিল আমাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচানোর নয়, বৃষ্টিটাকে শরীরের সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছে দেওয়ার।
তবু মন ভালো। কারণ এবার শুধু ঘুম আর ঘুম।

বাড়ি ফিরে গরম ভাত, ইলিশ ভাজা, লাউ-চিংড়ি আর মুগডাল দিয়ে এমন এক রাজকীয় খাবার খেলাম যে মনে হলো, পৃথিবীর সব সুখ এই এক প্লেটেই পরিবেশন করা হয়েছে। খাওয়া শেষ। এবার বিছানায় যাব। ঠিক তখনই-এই শুনছো?

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, তাড়াতাড়ি বলো। ঘুমটা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

বউ বললো, ঘুমাবে মানে? দশ মিনিটের মধ্যে বের হতে হবে।
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, কোথায়?

বউ বললো, গত সপ্তাহে কেনাকাটার সময় একটা ভাউচার জিতেছিলাম না? আজই শেষ দিন। পঞ্চাশ শতাংশ ডিসকাউন্ট!
আমি শেষ চেষ্টা করলাম। এই বৃষ্টিতে না গেলে হয় না?

বউ বললো, বৃষ্টি? সুনামি হলেও যেতে হবে।

কী কিনবে? ওভেন আর এয়ার ফ্রায়ার। তোমার ছয়-সাত হাজার টাকা বাঁচবে। তারপর রহস্যময় হাসি দিয়ে বললো, আর হ্যাঁ... দুইটা সারপ্রাইজও আছে।

টাকা বাঁচবে আর সারপ্রাইজ এই দুই শব্দের ফাঁদে পড়ে কত পুরুষ যে ঘর থেকে বেরিয়েছে, তার কোনো সরকারি হিসাব নেই। আমিও সেই পরিসংখ্যানে নাম লিখিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

দোকানে গিয়ে দেখি বড় বড় অক্ষরে লেখা-দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে অফার সাময়িকভাবে স্থগিত। বোর্ডটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, ভাগ্য আজ ব্যক্তিগতভাবে আমাকে নিয়ে বিনোদনের আয়োজন করেছে।

বউ নির্বিকার। তারপর বললো, যেহেতু এসেই গেছি, চলো। প্রথম সারপ্রাইজ!

সোজা তার বান্ধবীর বাসা। নাস্তা খাওয়া শেষ হতেই শুরু হলো দুই বান্ধবীর জীবনের সমস্যা ও সমাধান বিষয়ক মুক্ত আলোচনা। সেখানে আমার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমি চুপচাপ বসে প্রয়োজনমতো মাথা নাড়ছিলাম। একবার ভুল করে ভিন্নমত দিয়েছিলাম। তারপর বুঝলাম, সংসারে অনেক সময় যুক্তির চেয়ে ঘাড় নাড়ার দাম বেশি।

সন্ধ্যায় বউ বললো, এবার দ্বিতীয় সারপ্রাইজ।

আমাকে নিয়ে হাজির হলো একটি সেমিনারে। বিষয়-নারীর উন্নয়নে পুরুষের সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা ও অন্যান্য।
আর ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আমাকে বসানো হলো একেবারে প্রথম সারিতে। মনে হচ্ছিল, আমি শ্রোতা নই; প্রদর্শনীর নমুনা।

প্রথম বক্তা বললেন, পুরুষেরা নিজের ভুল স্বীকার করে না। আমি প্রতিবাদ করতে গিয়েও থেমে গেলাম।
দ্বিতীয় বক্তা বললেন, পুরুষেরা সংসারের কাজে অংশ নেয় না। আমার কাদামাখা স্যান্ডেল তখনও শুকায়নি। কিন্তু সেটা দেখানোর সাহসও হলো না। কারণ আমার ঠিক পাশেই বসেছিল আমার স্ত্রী।
তৃতীয় বক্তা বললেন, পুরুষদের বদলাতে হবে।

আমার মনে হলো, আমি বুঝি ভুল করে সেমিনারে নয়, নিজের বিরুদ্ধে চার্জশিট পাঠের অনুষ্ঠানে চলে এসেছি।
এরপর থেকে প্রতিটি বক্তৃতায় আমি এমনভাবে মাথা নাড়ছিলাম, যেন জন্মের পর থেকে যত ভুল করেছি, সব আজই স্বীকার করছি। ওই মুহূর্তে সত্যের চেয়ে নিরাপত্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

রাত সাড়ে দশটায় বাসায় ফিরলাম। সকাল থেকে যে ঘুমটার পেছনে দৌড়াচ্ছিলাম, সে ততক্ষণে আমাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। বিছানায় শুয়ে জানালার কাঁচে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে শুধু একটা প্রার্থনা করলাম, হে সৃষ্টিকর্তা, আগামীবার ছুটির দিনে বৃষ্টি দিও, কিন্তু কোনো ভাউচার দিও না। শুধু মনে হলো অফিসে যাওয়াই ভালো ছিল।

তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম, টেরই পেলাম না। সেদিন ভাউচারে কোনো ছাড় পাইনি। কিন্তু রাতের সেই ঘুমটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ডিসকাউন্ট।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার