বিজ্ঞাপন
ঢাকায় হানি ট্র্যাপে ফেলে নিউইয়র্কের ব্যবসায়ীর পুত্রকে হত্যা
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৭ পিএম
বিজ্ঞাপন
ঢাকার ভাটারা এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ব্যবসায়ীর ছেলে শিহাব উদ্দিন মালেক সাগরের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ তুলেছে তাঁর পরিবার। স্বজনদের দাবি, প্রেমের ফাঁদ বা ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে অর্থ আত্মসাতের পর তাঁকে হত্যা করে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং পরিবারের অভিযোগের সত্যতা তদন্তে এখনো নিশ্চিত হয়নি।
নিহত সাগরের বয়স ৩৬। তাঁর বাবা আব্দুল মালেক যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের বাসিন্দা ও কনস্ট্রাকশন ব্যবসায়ী। তাঁদের পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ আগস্ট ভাটারা থানা এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে সাগরের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরিবার জানিয়েছে, সাগর ২০১৮ সালে চট্টগ্রামে রেস্তোরাঁ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ঢাকায় এসে গাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। একপর্যায়ে মাহজাবিন ইসলাম রিয়া নামের এক নারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
স্বজনদের অভিযোগ, ওই নারী নিজের বিবাহিত হওয়ার তথ্য গোপন রেখে সাগরের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান এবং তাঁর অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করেন। সাগর বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর টালবাহানা ও পরে অসম্মতি জানানো নিয়ে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি হয় বলে পরিবারের দাবি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ওই নারীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবারের সন্দেহের অন্যতম কারণ হিসেবে একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্বজনদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ওই নারীকে বটি হাতে সাগরকে হত্যার হুমকি দিতে দেখা যায়। তবে ভিডিওটির সত্যতা, ধারণের সময় ও পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
স্বজনেরা আরও দাবি করেছেন, ঘটনার সময় অ্যাপার্টমেন্টে একজন নারী ও আরেকজন পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে কারা ছিলেন এবং তাঁদের ভূমিকা কী ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সাগরের ভাই সাইফ উদ্দিন মালেক মামুন জানান, ১৯ আগস্ট বিকেল ৪টা ৩৩ মিনিটে তিনি সাগরকে ফোন করেন। সাড়া না পেয়ে বিকেল ৪টা ৪৭ মিনিটে বার্তা পাঠান। পরে একটি ভয়েস মেসেজে সাগর জানান, তিনি অ্যাপার্টমেন্টে রয়েছেন, কিন্তু সেখানে অন্য লোকজন থাকায় কথা বলতে পারছেন না। মামুনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ১৪ মিনিটে ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথোপকথন হয়।
মামুন বলেন, পরে রাত ১০টা ১০ মিনিটের দিকে অ্যাপার্টমেন্টের কেয়ারটেকার ও সাগরের সহকারী হিসেবে কাজ করা মুসার সঙ্গে কথা হলে তিনি মৃত্যুর খবর পান। মুসা তখন সাগর অ্যাপার্টমেন্টে একা ছিলেন বলে জানান। তবে পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে মুসা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন কথা বলেছেন। কখনো মরদেহ মেঝেতে পড়ে থাকার কথা, আবার কখনো বাইরে নিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলেছেন বলে মামুন দাবি করেন।
পরিবার আরও জানিয়েছে, মুসা সাগরের এক রুমমেটের কাছে একটি ছবি পাঠিয়েছিলেন। ওই রুমমেট তখন ওমরাহ পালনে মক্কায় ছিলেন। স্বজনদের দাবি, ছবিতে সাগরের হাতে আঘাত বা ভাঙনের মতো অবস্থা দেখা যাচ্ছিল। তবে আঘাতের প্রকৃতি ও কারণ ময়নাতদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
পরিবারের দেওয়া বিবরণে সর্বশেষ যোগাযোগ, মৃত্যুর খবর পাওয়া এবং মরদেহ উদ্ধারের সময়ক্রমে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। এসব বিষয়ও তদন্তে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
স্বজনেরা জানান, সাগর ১৯ আগস্ট সকালে উড়োজাহাজে ঢাকায় আসেন এবং ২১ আগস্ট ফিরে যাওয়ার টিকিট করেছিলেন। গত প্রায় তিন মাস ধরে তিনি স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঢাকার আসবাবপত্র ও অন্যান্য মালামাল কোথায় রাখবেন, তা নিয়েও বাবার সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত করছিলেন তিনি।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর স্বজনেরা ঢাকায় এসে ভাটারা থানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। গত ২৫ আগস্ট ভাটারা থানায় একটি মামলা করা হয়েছে বলেও পরিবার জানিয়েছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলা নম্বর ৪৪। তবে ময়নাতদন্তের ফল সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. চাঁদ মিয়া জানিয়েছেন, ঘটনার প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্তকে আটক করতে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
সাগরের চাচা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আনোয়ার হোসেন সিপিএ অভিযোগ করেন, তাঁর ভাতিজাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে। তিনি মৃত্যুর আগে ও পরে সাগরের সঙ্গে যোগাযোগকারী ব্যক্তি এবং অ্যাপার্টমেন্টে উপস্থিত সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান। এজাহারভুক্ত আসামিদের পুলিশে ধরিয়ে দিতে সহায়তার জন্য পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
পরিবারের দাবি, সাগরের ফোনের কথোপকথন ও বার্তা, অ্যাপার্টমেন্টে উপস্থিত ব্যক্তিদের তথ্য, সংশ্লিষ্ট ভিডিও এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন মিলিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। তাঁরা দ্রুত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।