বিজ্ঞাপন
স্পেনে বিশেষ নিয়মিতকরণে রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ
তদন্তের দাবি প্রবাসীদের
স্পেন প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
বিজ্ঞাপন
১৭ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্পেনে চালু হওয়া বিশেষ নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলো প্রায় ১৮ হাজারো বাংলাদেশি। তবে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহে বিলম্ব, দূতাবাসের সমন্বয়হীনতা এবং বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পিত বিশেষ সহায়ক দল সময়মতো স্পেনে না পৌঁছানোর ঘটনায় স্পেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি। তাদের দাবি, এসব প্রশাসনিক জটিলতার কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আবেদনকারী নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ ও আবেদন সম্পন্ন করতে পারেননি।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ও অনুসন্ধানে পাওয়া সরকারি নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও কনস্যুলার সেবা জোরদারে একটি বিশেষ সহায়ক দল স্পেনে পাঠানোর উদ্যোগ নিলেও রাষ্ট্রদূতের আপত্তির কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়।
২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি স্পেন সরকার বিশেষ নিয়মিতকরণ কর্মসূচি ঘোষণা করে। কর্মসূচির আওতায় আবেদনকারীদের নিজ দেশের বৈধ পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স এবং স্পেনে নিরবচ্ছিন্নভাবে পাঁচ মাস অবস্থানের প্রমাণ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার বাংলাদেশি এই সুযোগে আবেদন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেন।
কর্মসূচি ঘোষণার পর প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি মাদ্রিদে বাংলাদেশ দূতাবাসে ভিড় করেন। শুরুতে দূতাবাস জনবল সংকটের কথা জানালেও পরে প্রবাসীদের দাবি ও কমিউনিটির প্রতিনিধিদের চাপের মুখে কনস্যুলার সেবা বাড়ানো হয় এবং ছুটির দিনেও সেবা চালু রাখা হয়।
এ সময় স্পেনের বিভিন্ন শহরে বিশেষ সেবাকালে অফলাইন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স আবেদনের অথোরাইজেশন ফর্ম সত্যায়নের জন্য ২০ ইউরো করে ফি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, বাংলাদেশ সরকারের অনলাইন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা স্পেনে গ্রহণযোগ্য ছিল এবং আবেদনকারীরা অনলাইনের মাধ্যমে তুলনামূলক দ্রুত সনদ সংগ্রহ করতে পারতেন। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের অভিযোগ, দূতাবাস দীর্ঘ সময় কার্যকরভাবে অনলাইন পদ্ধতিকে উৎসাহিত না করায় অনেকেই অফলাইন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এতে প্রয়োজনীয় সনদ সংগ্রহে বিলম্ব হয় এবং অনেকে সময়মতো আবেদন সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হন।
প্রবাসীদের ধারাবাহিক আবেদনের পর বাংলাদেশ সরকার পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও কনস্যুলার সেবা জোরদারে একটি বিশেষ সহায়ক দল স্পেনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রদূত মাসুদুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি (স্মারক নং: ১৯.০১.৩৪০১.২০০.৭৭.০০১.২১/১৮) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে দেশ থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সেবা দিতে প্রস্তাবিত বিশেষ সহায়ক দল পাঠানোর বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করা হয় এবং প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করা হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের দাবি, রাষ্ট্রদূতের ওই অবস্থানের কারণে বিশেষ সহায়ক দল স্পেনে পাঠানোর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। ফলে কর্মসূচির শুরুর দিকে হাজারো আবেদনকারী প্রয়োজনীয় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহ করতে পারেননি। তাদের ভাষ্য, শুরুতেই প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে পারলে স্পেন সরকারের ঘোষিত প্রাথমিক আবেদনকারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি ছিল।
পরবর্তীতে প্রায় দুই মাস পর, গত ৯ মে চার সদস্যের একটি বিশেষ সহায়ক দল বার্সেলোনায় এসে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও কনস্যুলার সেবা কার্যক্রম শুরু করে। তবে প্রবাসীদের অভিযোগ, ততদিনে অনেক আবেদনকারী মূল্যবান সময় হারান এবং দূতাবাসের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিলম্বিত সমন্বয়ের কারণে পুরো প্রক্রিয়াই জটিল হয়ে ওঠে।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে স্পেনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে স্পেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, প্রবাসী সেবায় চরম অবহেলাসহ বিভিন্ন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রদূত মাসুদুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোন ও খুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।