Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

প্রবাস

স্পেনে বৈধতার অপেক্ষায় বাংলাদেশি অভিবাসী সুনন্দা

Icon

ইনফোমাইগ্রেন্টস

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ এএম

স্পেনে বৈধতার অপেক্ষায় বাংলাদেশি অভিবাসী সুনন্দা

বিজ্ঞাপন

স্পেনের বার্সেলোনায় বসবাসরত ২৬ বছর বয়সি বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী সুনন্দা প্রমির কাছে দেশটির বিশেষ নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া শুধু নিয়মিত হওয়ার সুযোগ নয়, বরং একটি নতুন জীবনের সম্ভাবনা। তার মতে, বৈধতা পেলে কাজ, বাসস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর হবে।

স্পেন সরকারের ঘোষিত এই বিশেষ নিয়মিতকরণ কর্মসূচি নিয়ে দেশটিতে বসবাসরত অভিবাসীদের সঙ্গে কথা বলতে সম্প্রতি স্পেনের বিভিন্ন শহর সফর করেছে ইনফোমাইগ্রেন্টস।

অনেক অভিবাসীর মতে, এই উদ্যোগ তাদের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

নিয়ম অনুযায়ী, যেসব অনিয়মিত অভিবাসী ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে থেকে স্পেনে অবস্থান করছেন এবং অন্তত পাঁচ মাসের ধারাবাহিক উপস্থিতির প্রমাণ দিতে পারবেন, তারা বৈধতার আবেদন করতে পারবেন। এছাড়া তাদেরকে অপরাধসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে।

এই নিয়মে চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। আবেদন গৃহীত হলে তারা এক বছরের জন্য বসবাস ও কাজের অনুমতি পাবেন। এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ আবেদন করেছেন। অনুমোদন পেলে তারা স্পেনের যেকোনো খাতে এবং দেশের যেকোনো অঞ্চলে কাজ করতে পারবেন।

এরই ধারাবাহিকতায় এক বছরের বেশি সময় ধরে স্পেনে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসী সুনন্দাও আবেদন করেছেন। বর্তমানে তিনি আবেদনের ফলাফলের অপেক্ষায় আছেন। তার আশা, আইনি মর্যাদা পেলে জীবন আরও স্থিতিশীল হবে এবং ন্যায্য কর্মপরিবেশে কাজ করার সুযোগ পাবেন।

সুনন্দা জানান, স্পেনে আসার প্রধান কারণ ছিল বৈধভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়া। তবে তিনি দেশটিকে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যও উপযুক্ত মনে করেন।

তার ভাষায়, “স্পেনের আবহাওয়া খুব ভালো।” ইউরোপের অন্যান্য দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি জানান, স্পেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছ থেকে অনেক সহায়তা পেয়েছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশি নারীরা তাকে সহযোগিতা করেছেন। এছাড়া স্পেনে আগে থেকে বসবাসরত পরিবারের সদস্যদের সহায়তা পাওয়ায় নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়েছে।

সুনন্দা বলেন, এই নিয়মিতকরণ কর্মসূচির ঘোষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর আগে অনিয়মিত অভিবাসীদের বৈধতার জন্য অন্তত দুই বছর অপেক্ষা করতে হতো, যার ফলে অনেক অভিবাসীকে চাকরির অনিশ্চয়তা, অস্থায়ী বাসস্থান এবং বিভিন্ন ধরনের শোষণের মধ্যে জীবন কাটাতে হতো।

তিনি বলেন, “সরকার যখন নিয়মিতকরণের ঘোষণা দিল, তখন আমরা যারা অনিয়মিত অবস্থায় এখানে আছি তারা সবাই খুব খুশি হয়েছিলাম। কারণ এখানে অনিয়মিত অবস্থায় দুই বছর থাকা খুব কঠিন।”

তার ভাষায়, একজন অনিয়মিত অভিবাসীর জন্য জীবন খুব কঠিন। সহজে কাজ পাওয়া যায় না। আর কাজ পেলেও অনেক সময় নিয়োগকর্তারা সঠিক বেতন দেন না।

সুনন্দা বলেন, বাংলাদেশি কমিউনিটির অধিকাংশ মানুষ সহযোগিতাপরায়ণ হলেও অল্পসংখ্যক কিছু ব্যক্তি নতুন আসা অভিবাসীদের দুর্বল অবস্থার সুযোগ নেয়।

তিনি জানান, একবার তিনি এক মাস কাজ করার পরও বেতন পাননি।

তার মতে, অনিয়মিত অভিবাসীদের অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয়। তারা পর্যাপ্ত বিশ্রাম পান না, ছুটি পান না এবং বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তাও থাকে না।

তিনি বলেন, “আপনার কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই। কোনো ছুটির দিন নেই। এখানে টিকে থাকা খুব কঠিন।”

কিছু নিয়োগকর্তার কাছে অনিয়মিত অভিবাসীদের নিয়োগ দেওয়া লাভজনকও হতে পারে বলে উল্লেখ করেন সুনন্দা। কারণ সেক্ষেত্রে তাদের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নির্ধারিত অবদান বা কর দিতে হয় না। যদিও আইন লঙ্ঘনের দায়ে বড় অঙ্কের জরিমানার ঝুঁকি থাকে।

সুনন্দার মতে, নিয়মিতকরণ কর্মসূচি শ্রমিকদের শোষণ থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করবে। কারণ অনেক নিয়োগকর্তা জানেন যে, অনিয়মিত অভিবাসীরা অভিযোগ করতে ভয় পান।

তিনি বলেন, “আপনি যদি অনিয়মিত অবস্থায় থাকেন, তাহলে নিয়োগকর্তার জন্যও ঝুঁকি থাকে। তাই অধিকাংশ নিয়োগকর্তা অনিয়মিত কর্মীদের রাখতে চান না।”

সুনন্দার মতে, আইনি মর্যাদা শুধু কর্মক্ষেত্রের অবস্থার উন্নতি করবে না, মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনবে।

তিনি বলেন, “আপনার বৈধ কাগজপত্র বা রেসিডেন্স পারমিট থাকলে প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। কিন্তু রেসিডেন্স পারমিট না থাকলে মানুষ আপনার সাথে খারাপ আচরণ করতে থাকে।”

বাসস্থানও অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য বড় একটি সমস্যা বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তার ভাষায়, বৈধ কাগজপত্র এবং এনআইই নম্বর ছাড়া অনেক অভিবাসী বাসা ভাড়া নিতে পারেন না। ফলে অনেককে গাদাগাদি করে অন্যদের সঙ্গে থাকতে হয় বা চরম ক্ষেত্রে রাস্তায় রাত কাটাতে হয়।

তিনি বলেন, “নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রেসিডেন্স পারমিট পেলে বিশাল পরিবর্তন আসবে বলে আমি মনে করি। অনিয়মিত অভিবাসীরা একা বাসা ভাড়া নেওয়ার সুযোগ পান না, কারণ বাসা নিতে এনআইই নম্বর প্রয়োজন।”

সুনন্দা জানান, শীতকালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, “আমি অনেক মানুষকে রাস্তায় থাকতে দেখি। এটা আমাকে খুব কষ্ট দেয়। তারা কাগজপত্র বা রেসিডেন্স কার্ড পেলে বাসা পাওয়া অনেক সহজ হবে।”

ভবিষ্যতের পরিকল্পনা

সুনন্দার কাছে নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়াটি ভবিষ্যৎ গড়ার একটি সুযোগও। তিনি স্বামীর সঙ্গে স্পেনে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান। ভবিষ্যতে নার্স হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে তার।

তিনি বলেন, রেসিডেন্স কার্ড পাওয়ার পর আমি এখানে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। প্রথম কাজ হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া।

সংগীত এখনও তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুনন্দা হারমোনিয়াম বাজান এবং বার্সেলোনার বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

তার মতে, এসব আয়োজন তাকে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অপেক্ষার সময়টাও কিছুটা সহজ করে তোলে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার