বিজ্ঞাপন
যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন ছাত্র সংসদে বাংলাদেশিদের ঐতিহাসিক উত্থান
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে যাওয়া শিক্ষার্থীরা শুধু অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রেই নয়, নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়ে শিক্ষার্থীদের অধিকার, কল্যাণ এবং প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এই ধারাবাহিক সাফল্য তাদের নেতৃত্বগুণ ও সক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। উচ্চশিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের এই অর্জন প্রশংসিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা, প্রশাসনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং ক্যাম্পাস জীবনে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
এর মধ্যে অ্যাঙ্গলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটির লন্ডন ক্যাম্পাস ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন নোয়াখালীর সন্তান নাঈম হাসান। ১ হাজার ৬২৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়া নাঈম বর্তমানে আইন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবিষয়ক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত রয়েছেন।
ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ড (ইউডব্লিউই) ব্রিস্টলের স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট (এডুকেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খাদিজা হোসেন অড়লা। প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর অ্যাকাডেমিক স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী খাদিজা শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং আবাসন ও রেন্টার্স রাইটস ইস্যুতে কাজ করছেন।
ইউনিভার্সিটি ফর দ্য ক্রিয়েটিভ আর্টস (ইউসিএ)-এর এপসম ক্যাম্পাস স্টুডেন্টস ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কুষ্টিয়ার শায়েখ হাসান। ডিজিটাল মার্কেটিং বিভাগের এই শিক্ষার্থী শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সফল ভূমিকার কারণে টানা দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়েছেন।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস স্টুডেন্টস ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইরফান রহমান। কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক ইরফান এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ সোসাইটির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বর্তমানে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সহায়তায় কাজ করছেন।
ইউনিভার্সিটি অব গ্লস্টারশায়ার স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ডাইভারসিটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইফফাত জাহান। প্রায় এক দশক পর শিক্ষাজীবনে ফিরে এসে তিনি ৬৭৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হোন। তার উদ্যোগে শিশু পরিচর্যাসুবিধা, মাতৃদুগ্ধ কর্নার ও নামাজের কক্ষ স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে।
রেভেন্সবর্ন ইউনিভার্সিটি লন্ডনের স্টুডেন্টস ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন চট্টগ্রামের সন্তান রায়াস বিন নিজাম। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়টির স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি বর্তমানে শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, মতামত তুলে ধরা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। বিশেষ করে নতুন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সহায়তা ও দিকনির্দেশনায় তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
মোহাম্মদ আশরাফুল গালিব ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে সোলেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টস ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা এবং টিউশন ফিতে নমনীয়তা আনার মতো উদ্যোগে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে তিনি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহায়ক ক্যাম্পাস গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।
গাজীপুরের টঙ্গীর সন্তান মো. সাইফ মোল্লা চঞ্চল গ্রিনউইচ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। কম্পিউটার সায়েন্সের এই শিক্ষার্থী মানসিক স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধী ও সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাম্পাস পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছেন।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট (এডুকেশন) এ বি এম রাহাত মুবাশশির ইতিহাসের সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে এবং প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর অ্যাকাডেমিক প্রতিনিধিত্ব করছেন।
লন্ডন মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টস ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশি শিক্ষার্থী রাজ্য মন্ডল। ৮৭৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের অধিকার, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট (অ্যাকটিভিটিজ অ্যান্ড অপরচুনিটিজ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাহিদ বিনতে ইসলাম। টানা দুবার নির্বাচিত নাহিদ সহশিক্ষা কার্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করছেন।
ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি লন্ডন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন নাফি হাসান খান। অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই শিক্ষার্থী এর আগে বাংলাদেশ সোসাইটির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বর্তমানে শিক্ষার্থী সম্পৃক্ততা ও ক্যাম্পাস উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
হাসিব লগ্নো নর্থ ওয়েলসের ব্যাঙ্গর বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তিনি এই পদে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি এবং দ্বিতীয় এশীয় শিক্ষার্থী। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কল্যাণ এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন।
লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইকুইটি অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার) সৌমিত্র পাল। নোয়াখালীর এই শিক্ষার্থী মানসিক স্বাস্থ্য, অ্যান্টিরেসিজম, অ্যান্টিহ্যারাসমেন্ট এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করার বিষয়ে কাজ করছেন।
ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ার স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন জুবায়ের আহম্মেদ। প্রায় ৩৮ হাজার শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্বকারী এই পদে থেকে তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসপেকস অফিসার ও বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন রংপুরের মুহতাসিম সাদাত নিবির। তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি অ্যাকাডেমিক অভিজ্ঞতা উন্নয়ন ও পরিবহনসেবার মানোন্নয়নে কাজ করেছেন।
ওয়েলসের রেক্সহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের সন্তান হাফসা আজমারি ফারজু। তিনি ‘সাসটেইনেবিলিটি চ্যাম্পিয়ন অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার, সমতা ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ওয়েলফেয়ার) এম ইমাম হোসাইন টানা দুবার সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, সহায়তা ও সংকট মোকাবিলায় তার ভূমিকা ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
নাঈম হাসান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চাই। আমি সমতা, ন্যায়বিচার ও সাম্যের ভিত্তিতে একটি সুন্দর সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখি। পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই, বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবী রেখে যেতে চাই।’
খাদিজা হোসেন অড়লা বলেন, ‘শিক্ষার্থী অবস্থায় নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জননীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, মানসম্মত শিক্ষা, সমান সুযোগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই সমাজ গঠনের ভিত্তি। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার স্বপ্ন দেখি।’
উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও সক্ষমতার একটি ইতিবাচক পরিচয় বহন করছে।