বিজ্ঞাপন
আশ্রয় সুবিধা কমিয়ে ইইউ আইন লঙ্ঘন জার্মানির, শীর্ষ আদালতের রায়
ইনফোমাইগ্র্যান্টস
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:১০ পিএম
বিজ্ঞাপন
ইউরোপীয় বিচার আদালত (ইসিজে) রায় দিয়েছে, শুধু বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম সুবিধা নয়, বরং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া উচিত প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের৷ কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন চুক্তি চালু হওয়ার পর এই স্বস্তি কি স্বল্পস্থায়ী হতে চলেছে?
আশ্রয় আবেদন করার সময় এবং এক ইউরোপীয় দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরের অপেক্ষায় একজন মানুষ কীভাবে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারেন? এই প্রশ্নটি ইউরোপীয় বিচার আদালতের (ইসিজে) বিচারকদের সামনে রাখা হয়েছিল। সেইসময় তারা জার্মানির দেওয়া সুবিধাগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রত্যাশা পূরণ করে কিনা তা নিয়ে রায় দেন।
ইসিজেকে এক আফগান আশ্রয়প্রার্থীর (এফবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তাকে) অধিকার ব্যাখ্যা করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল৷ জার্মানি তার আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং তাকে রোমানিয়ায় স্থানান্তরিত করার কথা ছিল। তিনি ২০২১ সালে সেই দেশে প্রথম আশ্রয় চেয়েছিলেন৷
স্থানান্তরের অপেক্ষায় থাকার সময় তাকে খাবার, হিটিং সিস্টেম রয়েছে এমন বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ দেওয়া হলেও পোশাক এবং অন্যান্য গৃহস্থালী জিনিসপত্র সংক্রান্ত কোনো সহায়তা দেওয়া হয়নি। একটি আইনে প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য সুবিধা কমানো হয়েছিল জার্মানিতে। একে অধিকার কর্মীরা ‘বিছানা, রুটি এবং সাবান’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
২০২২ সালে সুবিধা কমে যাওয়ার পর বাভারিয়ান জেলা শোয়াইনফুর্টের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওই আফগান নাগরিক কিন্তু শেষ পর্যন্ত মামলাটি ইসিজেতে গিয়ে পৌঁছায়। গত বৃহস্পতিবার, আদালত প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীর পক্ষে রায় দেন। আদালত বলে, আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও পোশাক এবং গৃহস্থালীর জিনিসপত্রের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয়তাগুলো প্রত্যাহার করা যাবে না।
আদালত জানিয়েছে, পোশাক হল ‘মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে একটি’, দৈনিক প্রয়োজনীয়তার জন্য নগদ আর্থিক সুবিধা যেমন যাতায়াতের টিকিট এবং ফোন, সেই দেশের ‘সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে ন্যূনতম অংশগ্রহণ’ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে ওই ব্যক্তি বাস করেন। এই ভাতা ‘আবেদনকারীর ভাল থাকা নিশ্চিত করতে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখতে’ সাহায্য করে।
ইউরোপের ডানপন্থি এবং কিছু রক্ষণশীল রাজনীতিবিদরা আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য "কল্যাণমূলক সহায়তা" দেওয়ার প্রতিবাদ করেছেন। তাদের দাবি, এর ফলে ইউরোপে আসতে অভিবাসীরা আকৃষ্ট হন। ফাইল ছবি: মার্টিন মেইসনার/এপি ফটো/পিকচার অ্যালায়েন্স
ইউরোপের ডানপন্থি এবং কিছু রক্ষণশীল রাজনীতিবিদরা আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য "কল্যাণমূলক সহায়তা" দেওয়ার প্রতিবাদ করেছেন। তাদের দাবি, এর ফলে ইউরোপে আসতে অভিবাসীরা আকৃষ্ট হন। ফাইল ছবি: মার্টিন মেইসনার/এপি ফটো/পিকচার অ্যালায়েন্স
অধিকার কর্মীরা এই রায়কে স্বাগত জানান। তাদের আশা ছিল, ইউরোপ জুড়ে এই রায়ের প্রভাব পড়বে। কিন্তু নতুন অভিবাসন চুক্তির কারণে পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালে আশ্রয় সুবিধা সীমিত করে জার্মানি
২০২১ সালে জার্মানিতে আশ্রয় চেয়েছিলেন এফবি নামে ওই ব্যক্তি। এক বছর পর, তার আবেদনকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ ঘোষণা করা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতি ডাবলিন বিধানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যার আওতায় একটি আশ্রয় আবেদন তখনই অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয় যখন অন্য কোনো অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র ইতিমধ্যেই সেই আবেদনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বা দায়িত্ব নিয়েছে।
এটি দ্বিতীয়বারের মতো অভিবাসনকে নিরুৎসাহিত করতে এবং আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়ে কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশে চাপ পড়ার বদলে সমগ্র ইউরোপজুড়ে অভিবাসী বণ্টনের উদ্দেশ্যে এই নিয়ম আনা হয়েছিল।
গত দশ বছরে অভিবাসন জার্মানির একটি প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে, যা ডানপন্থি অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দল ভোটারদের সমর্থন বাড়াতে ব্যবহার করেছে। ভোটারদের মন জয় করতে জার্মান সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের সুবিধা কমানোর মতো একাধিক চাপের মুখোমুখি হয়েছে।
২০২৪ সালে আশ্রয়প্রার্থীদের সুবিধা আইনে সংশোধনের মাধ্যমে, খাবার, আবাসন এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে সম্মত হলেও নগদ অর্থ প্রদান কমিয়েছে জার্মানি।
ইউরোপে মানবাধিকার এবং শরণার্থী সুরক্ষার জন্য কাজ করে প্রো অ্যাসিল। এই জার্মান এনজিওর নীতি ও উপদেষ্টা অফিসার ভিবকে ইয়ুডিথ ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, "বাস্তবে, এর মানে হল নগদ অর্থ না দেওয়া বা খুব কম পরিমাণে দেওয়া।"
কর্মীরা দাবি করেছেন, পোশাক এবং নগদ অর্থের অভাব পর্যাপ্ত জীবনমান নিশ্চিত করে না। এটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যর্থনার শর্তগুলো লঙ্ঘন করেছে। এটা গোটা ইউরোপ জুড়ে আশ্রয় আবেদনকারীদের জন্য সহায়তার ন্যূনতম মান নির্ধারণ করে, যার মধ্যে প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীরাও অন্তর্ভুক্ত।
প্রো অ্যাসিল এক বিবৃতিতে বলেছে, জার্মানির আশ্রয়প্রার্থী সুবিধা আইনে ‘‘বেঁচে থাকার ন্যূনতম সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদান বিলুপ্ত করা হয়েছে।’’ সংগঠনটি জানিয়েছে, আদালতের রায় জার্মানির এই ‘সুবিধা কমানোর এই সিদ্ধান্তকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।’’
আদালতের রায় ইঙ্গিত দেয়, প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদেরও স্থানান্তর সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া উচিত।
ইউরোপের ডানপন্থি এবং কিছু রক্ষণশীল রাজনীতিবিদরা আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য "কল্যাণমূলক সহায়তা" দেওয়ার প্রতিবাদ করেছেন। তাদের দাবি, এর ফলে ইউরোপে আসতে অভিবাসীরা আকৃষ্ট হন।
এএফডির দাবি, অভিবাসীরা নগদ সহায়তা নিজেদের কাছে রাখে বা নিজ দেশের পরিবারের কাছে পাঠায়। ২০২৪ সালে জার্মান সরকার একটি ডেবিট কার্ড চালু করলে কৃতিত্ব নেয় এএফডি। এর মাধ্যমে নগদ অর্থের বদলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যায়ের জন্য ব্যবহার করা যেতো।
অধিকারকর্মীরা বলেছেন, এই ধরনের সীমাবদ্ধতা অভিবাসীদের নিরুৎসাহিত করবে না বরং তাদের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ হতে বাধ্য করবে। জুডিথ আগে বলেছিলেন, ভাতার হেরফের হলে যুদ্ধ এবং দারিদ্র থেকে পালিয়ে আসা মানুষেরা অভিবাসনে নিরুৎসাহী হবেন এমনটা নয়।
ইইউর অভিন্ন আশ্রয়নীতি চালু হলে স্বস্তি কি স্বল্পস্থায়ী হবে?
গত বৃহস্পতিবারের রায়টি স্থানান্তর প্রক্রিয়া চলাকালীন আশ্রয়প্রার্থীদের সঙ্গে আচরণের জন্য জাতীয় কর্তৃপক্ষকে ইউরোপ জুড়ে নির্দেশনা দিয়েছে, যা আশ্রয় প্রক্রিয়া জুড়ে মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করে।
১২ জুন থেকে নতুন ইউরোপীয় অভিবাসন চুক্তি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসিজের এই জয় তেমন কোনো অর্থ বহন করবে না বলে উদ্বেগ রয়েছে।
লা সিমাড নামের ফ্রান্সের একটি এনজিও-এর আশ্রয় ব্যবস্থাপক জেরার্ড সাদিক ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘এটি খুব বেশি দিন সাহায্য করবে না।’’ এই এনজিও আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আইনি সহায়তা প্রদান করে। নতুন অভিবাসন চুক্তি ‘‘কম সুবিধা দেয়।’’
সুইডিশ রাজনৈতিক বিজ্ঞানী বেয়ার্ন্ড পারুসেল ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘১২ জুন থেকে নতুন নিয়মগুলো কার্যকর হলে, অন্য সদস্য রাষ্ট্রে উপস্থিত থাকতে বাধ্য, এমন আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলো দৈনিক ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা কমাতে বা প্রত্যাহার করতে পারে।’’
তিনি বলেন, ‘‘পাশাপাশি দেশগুলোকে ইইউয়ের আইন অনুযায়ী জীবনমান নিশ্চিত করতে হবে, যার মধ্যে মৌলিক অধিকার সনদ এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতাও রয়েছে।’’
প্রো অ্যাসাইলের জুডিথ আরো আশাবাদী। আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট জুডিথ বলেন, ‘‘এই রায় ব্যক্তিগত সুবিধাগুলোকে সম্মানজনক জীবনের জন্য অপরিহার্য হিসেবে বিবেচনা করেছে।’’