Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

প্রবাস

রেস্টুরেন্টের কিচেন থেকে টাওয়ার হ্যামলেটসের স্পিকার

ব্যারিস্টার মুশতাক আহমদের অনুপ্রেরণার গল্প

Icon

প্রবাস ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৩:৩৫ এএম

রেস্টুরেন্টের কিচেন থেকে টাওয়ার হ্যামলেটসের স্পিকার

বিজ্ঞাপন

লন্ডনের ব্যস্ত নগরীতে একসময় যিনি জীবিকার তাগিদে রেস্টুরেন্টে কিচেন পোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন, আজ তিনিই টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের “ফার্স্ট সিটিজেন” — স্পিকার। সংগ্রাম, অধ্যবসায় আর আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন কাউন্সিলর ব্যারিস্টার মুশতাক আহমদ।

২০ মে বুধবার সন্ধ্যায় টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের বার্ষিক সাধারণ সভায় তাঁকে ২০২৬–২৭ পৌর বছরের নতুন স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। একই সভায় ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন ল্যান্সবারি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন।

নির্বাহী মেয়র লুৎফর রহমান নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্পিকার ও ফার্স্ট সিটিজেন হিসেবে কাউন্সিলর মুশতাক আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন নির্বাচিত হওয়ায় তাদের আন্তরিক অভিনন্দন। আমাদের এই নেতৃত্বদানকারী টিম বাসিন্দাদের সেবায় নিরলসভাবে কাজ করবে।”

কিন্তু এই অর্জনের পেছনের গল্পটি শুধুই রাজনীতির নয়; এটি এক অভিবাসীর অদম্য সংগ্রামের গল্প।

বাংলাদেশের সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমার জালালপুরের খতিরা গ্রামে জন্ম নেওয়া মুশতাক আহমদ ১৮ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে আসেন। নতুন দেশে জীবন শুরু হয় কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। জীবিকার প্রয়োজনে কাজ করেন রেস্টুরেন্টে কিচেন পোর্টার হিসেবে। পরে নিজের পরিশ্রম আর মেধায় গড়ে তোলেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা এবং দীর্ঘ ১২ বছর সফলভাবে ক্যাটারিং খাতে কাজ করেন।

অনেকেই যেখানে জীবনযুদ্ধের চাপে স্বপ্ন ভুলে যান, সেখানে ৩২ বছর বয়সে নতুন করে শিক্ষাজীবন শুরু করার সাহস দেখান তিনি। ভর্তি হন টাওয়ার হ্যামলেটস কলেজে এবং “স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার” নির্বাচিত হন। এরপর আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

তিনি পড়াশোনা করেন কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন এবং ওপেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পরে ল’ বিশ্ববিদ্যালয় (ইউনিভার্সিটি অব ল’) থেকে বার-অ্যাট-ল সম্পন্ন করেন। ২০১৭ সালে ইনার টেম্পল থেকে ব্যারিস্টার হিসেবে অভিষিক্ত হন।

বর্তমানে তিনি ট্রেইনি সলিসিটর ও লিটিগেশন কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন। দেওয়ানি, চাকরি ও অভিবাসন আইনে দক্ষতার পাশাপাশি পুলিশ স্টেশন প্রতিনিধি হিসেবেও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

শুধু পেশাগত জীবনেই নয়, জনসেবামূলক কাজেও তিনি রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। প্রায় ১৫ বছর রয়্যাল লন্ডন হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে চাকরি, দক্ষতা ও উন্নয়নবিষয়ক কেবিনেট সদস্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া কমিউনিটি সংগঠন, মসজিদ পরিচালনা, স্কুল গভর্নর ও পুলিশ কাস্টডি ভিজিটর প্যানেলেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি তাঁর চ্যারিটি হিসেবে দুটি সংগঠনকে বেছে নিয়েছেন। এর একটি হলো ‘মারি সেলেস্টে সামারিটান সোসাইটি অব দ্য রয়্যাল লন্ডন হাসপাতাল’, যারা অসহায় ও গৃহহীন রোগীদের সহায়তা করে। অন্যটি ‘ভ্যালান্স কমিউনিটি স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন’, যারা খেলাধুলা ও প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।

ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি একজন পরিবারমুখী মানুষ। নিজের সাফল্যের পেছনে স্ত্রীর অবদানকে সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করেন তিনি। তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে, যাদের মধ্যে বড় ছেলে ও মেয়ে ইতোমধ্যেই আইন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

রেস্টুরেন্টের কিচেন থেকে ব্যারিস্টার, আর সেখান থেকে টাওয়ার হ্যামলেটসের স্পিকার — ব্যারিস্টার মুশতাক আহমদের জীবন যেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাফল্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার