বিজ্ঞাপন
হার্টের ভাল্ভ সুস্থ রাখতে যে অভ্যাসগুলো মেনে চলা জরুরি
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:১৭ এএম
বিজ্ঞাপন
মানুষের হৃদযন্ত্র বা হার্ট সারাক্ষণ শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত সরবরাহ করে। এই রক্তের মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ ও টিস্যু অক্সিজেন এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়। রক্ত যেন সঠিক পথে চলাচল করে এবং উল্টো দিকে ফিরে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হার্টের চারটি ভাল্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কাউকে যদি বলা হয় তার হার্টের এক বা একাধিক ভাল্ভে ব্লক বা সমস্যা রয়েছে, তাহলে সাধারণত এর অর্থ হলো ভাল্ভটি সরু হয়ে গেছে অথবা ঠিকমতো খুলতে পারছে না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাল্ভ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় রক্ত উল্টো দিকে ফিরে যায়।
এ ধরনের সমস্যায় হার্টকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে ধীরে ধীরে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
হার্টের ভাল্ভ কীভাবে কাজ করে?
মানুষের হার্টে চারটি প্রকোষ্ঠ বা চেম্বার রয়েছে। এর মধ্যে ওপরের দুটি হলো অ্যাট্রিয়াম এবং নিচের দুটি হলো ভেন্ট্রিকল। এই চারটি প্রকোষ্ঠের মধ্যে এবং হার্ট থেকে রক্ত বের হওয়ার পথে চারটি ভাল্ভ থাকে।
শরীর থেকে অক্সিজেন কম থাকা রক্ত প্রথমে হার্টের ডান পাশের অ্যাট্রিয়ামে আসে। এরপর ট্রাইকাসপিড ভাল্ভ দিয়ে ডান ভেন্ট্রিকলে প্রবেশ করে। ডান ভেন্ট্রিকল রক্তকে পালমোনারি ভাল্ভের মাধ্যমে ফুসফুসে পাঠায়। সেখানে রক্ত অক্সিজেন গ্রহণ করে।
ফুসফুস থেকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত হার্টের বাম পাশের অ্যাট্রিয়ামে ফিরে আসে। এরপর মাইট্রাল ভাল্ভ দিয়ে বাম ভেন্ট্রিকলে প্রবেশ করে। সবশেষে বাম ভেন্ট্রিকল অ্যাওর্টিক ভাল্ভের মাধ্যমে রক্তকে অ্যাওর্টা বা শরীরের প্রধান ধমনীতে পাঠায়। এই ধমনী সারা শরীরে রক্ত সরবরাহ করে।
প্রতিবার হার্টবিটের সঙ্গে ভাল্ভগুলো খুলে ও বন্ধ হয়। এর ফলে রক্ত একদিকে প্রবাহিত হয় এবং পেছনের দিকে ফিরে যেতে পারে না।
হার্টের ভাল্ভের রোগ প্রধানত কত ধরনের?
হার্টের ভাল্ভের সমস্যা সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। এগুলো হলো রিগারজিটেশন ও স্টেনোসিস।
রিগারজিটেশন: ভাল্ভ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া
কোনো ভাল্ভ ঠিকমতো বন্ধ না হলে কিছু রক্ত সামনের দিকে যাওয়ার পরিবর্তে উল্টো দিকে ফিরে যায়। এই অবস্থাকে রিগারজিটেশন বলা হয়।
ভাল্ভের পাতাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে এমন সমস্যা হতে পারে। আবার হার্টের প্রকোষ্ঠের আকার বা গঠনে পরিবর্তন এলেও ভাল্ভ ঠিকমতো বন্ধ হতে পারে না।
সমস্যাটি সরাসরি ভাল্ভের গঠনে হলে তাকে প্রাইমারি ভাল্ভ ডিজিজ বলা হয়।
অন্যদিকে, হার্টের প্রকোষ্ঠ বা আশপাশের অন্য কোনো সমস্যার কারণে ভাল্ভ ঠিকমতো কাজ না করলে তাকে সেকেন্ডারি ভাল্ভ ডিজিজ বলা হয়।
স্টেনোসিস: ভাল্ভের মুখ সরু হয়ে যাওয়া
কোনো ভাল্ভের মুখ সরু হয়ে গেলে রক্ত স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না। এই অবস্থাকে স্টেনোসিস বলা হয়।
সাধারণত ভাল্ভের পাতাগুলো মোটা, শক্ত বা একে অপরের সঙ্গে জোড়া লেগে গেলে এমন সমস্যা দেখা দেয়।
কখনো কখনো ভাল্ভে ক্যালসিয়াম জমে যায়। এতে ভাল্ভের নমনীয়তা কমে যায় এবং এটি পুরোপুরি খুলতে পারে না।
ফলে সরু পথ দিয়ে রক্ত পাঠাতে হার্টকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে হার্টের পেশি মোটা হয়ে যেতে পারে। গুরুতর অবস্থায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহও কমে যেতে পারে।
হার্টের ভাল্ভের সমস্যার লক্ষণ কী?
কোন ভাল্ভে সমস্যা হয়েছে এবং সমস্যাটি কতটা গুরুতর, তার ওপর লক্ষণ নির্ভর করে। আবার এসব লক্ষণ অন্যান্য হৃদরোগের ক্ষেত্রেও দেখা যেতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে ভাল্ভের রোগ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
সাধারণত যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে—
• শ্বাসকষ্ট, বিশেষ করে হাঁটাচলা বা শারীরিক পরিশ্রমের সময়।
• মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
• হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হওয়া বা বুক ধড়ফড় করা।
• বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি।
• শরীরের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে পা, গোড়ালি ও পায়ের পাতায় অস্বাভাবিক ফোলাভাব।
হার্টের ভাল্ভের সমস্যার চিকিৎসা কী?
কোন ভাল্ভ আক্রান্ত হয়েছে, কী ধরনের সমস্যা হয়েছে এবং রোগের তীব্রতা কতটা—এসব বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।
যাদের সমস্যা মৃদু এবং তেমন কোনো লক্ষণ নেই, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অবস্থা পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারেন।
তবে সমস্যা গুরুতর হলে ভাল্ভ মেরামত বা পরিবর্তনের জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
ভাল্ভ মেরামত: ভাল্ভের গঠন ঠিক রেখে সেটিকে আবার স্বাভাবিকভাবে কাজ করার উপযোগী করে তোলাকে ভাল্ভ মেরামত বলা হয়। বিশেষ করে মাইট্রাল ও ট্রাইকাসপিড ভাল্ভের কিছু সমস্যায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়।
ভাল্ভ প্রতিস্থাপন: ভাল্ভ মেরামত করা সম্ভব না হলে বা মেরামতে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত ভাল্ভের পরিবর্তে কৃত্রিম ভাল্ভ বসানো হতে পারে।
রোগের ধরন ও আক্রান্ত ভাল্ভ অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে কম কাটাছেঁড়ার মাধ্যমে বা মিনিমালি ইনভেসিভ পদ্ধতিতেও চিকিৎসা করা সম্ভব।
এ ছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের অন্যান্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও হার্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়।
হার্টের ভাল্ভ সুস্থ রাখতে কী করবেন?
হার্টের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখলে হৃদরোগের পাশাপাশি ভাল্ভের সমস্যার ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য পাওয়া যায়।
এ জন্য কিছু অভ্যাস মেনে চলা জরুরি:
• ধূমপান ছেড়ে দিন এবং তামাকজাতীয় পণ্য এড়িয়ে চলুন।
• নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন।
• সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান।
• ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
• চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান।
অকারণে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তবে হঠাৎ তীব্র বুকে ব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা শ্বাস নিতে মারাত্মক কষ্ট হলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
সূত্র: সামা টিভি