বিজ্ঞাপন
‘স্যরি’ বললেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়?
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
বিজ্ঞাপন
কেউ কষ্ট দিলে বা প্রতিশ্রুতি ভাঙলে আমরা অনেক সময় তার কাছে ক্ষমা চাইতে বলি। কিন্তু সেই ব্যক্তি যখন বলে ‘স্যরি’ কিংবা ‘আমি দুঃখিত’, তখন কি সত্যিই মনের কষ্ট দূর হয়ে যায়? কারণ, ঘটে যাওয়া ঘটনা তো আর বদলানো সম্ভব হয় না। যা ক্ষতি হওয়ার তা তো হয়েই গেছে! তাহলে স্যরি বলার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? উদ্দেশ্য কী?
মনোবিজ্ঞানীরা অবশ্য বলছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘স্যরি’ বললেই বা ক্ষমা চাইলেই সমাধান হয়ে যায় না। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ এর চাইতেও বেশি কিছু প্রত্যাশা করেন। তাই, ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু অনুশোচনা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। বরং যিনি কষ্ট পেয়েছেন, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের ভুলের দায় স্বীকার করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। কারণ, ব্যক্তিগত ক্ষমা প্রার্থনা শুধু একটি বাক্য নয় বরং অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করার একটি বহিঃপ্রকাশও হতে পারে।
একই ঘটনা, দুই রকম উপলব্ধি
একটি ঘটনা দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। ধরুন, কোনো বন্ধু আপনার সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করে দিলেন। কেন তা বাতিল হলো, তার কারণ জানালেন না।তখন আপনার মনে হতে পারে, বন্ধু হয়তো আপনার সময়কে গুরুত্ব দেন না। আবার নিজের অজান্তে প্রশ্ন জাগতে পারে - আমি কি কোনো ভুল করেছি?
এবার বন্ধু যদি শুধু ‘স্যরি’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান, তাহলে আপনার মনে হতে পারে, তিনি আপনার কষ্টটা সঠিকভাবে বুঝতে পারছেন না। অর্থাৎ ক্ষমা চাওয়ার পরও অভিমান থেকে যেতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী রয় বাউমাইস্টার ১৯৯৭ সালে এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘ম্যাগনিটিউড গ্যাপ’ বা ঘটনার গুরুত্ব সম্পর্কে উপলব্ধির ব্যবধান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার ধারণা অনুযায়ী, যিনি কষ্ট পান, তার কাছে ঘটনাটি যতটা গুরুতর মনে হয়, যিনি কষ্ট দেন, তার কাছে ঘটনাটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে।
এই পার্থক্যের কারণেই অনেক সময় স্যরি বলার পরও সম্পর্কের ফাটল জোড়া লাগে না। একজন চান তার কষ্টের স্বীকৃতি, অন্যজন হয়তো নিজের ভুলের গুরুত্ব কমিয়ে দেখতে চান। সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে হলে এই দুই উপলব্ধির মধ্যে ব্যবধান কমানোই হচ্ছে সমাধান।
স্যরি বলার সময় আমরা কী প্রত্যাশা করি?
২০০৬ সালে মনোবিজ্ঞানী জুডি ইটন ও তার সহকর্মীরা একটি গবেষণায় পরীক্ষা করেন, অন্যায় আচরণের শিকার ব্যক্তির অনুভূতিকে স্বীকৃতি দিলে ক্ষমা করার আগ্রহ বাড়ে কি না।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের একটি অনলাইন খেলায় যুক্ত করা হয়। সেখানে প্রতিপক্ষ অন্যায্য আচরণের মাধ্যমে তাদের হারিয়ে দেন। এরপর প্রতিপক্ষকে চার ধরনের বার্তার যেকোনো একটি দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। বার্তাগুলো ছিল-
১) শুধু স্যরি বলা বা ক্ষমা চাওয়া,
২) অন্যায় স্বীকার করা,
৩) ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি অন্যায় স্বীকার করা এবং
৪) কোনো বক্তব্য না দেওয়া।
গবেষকরা দেখতে পান, প্রতিপক্ষ কোনো বক্তব্য না দিলে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অনুভূতির স্বীকৃতি কম পেয়েছেন বলে মনে করেন। এতে ক্ষমা করার আগ্রহও কমে যায়। শুধু ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রেও তেমন ইতিবাচক ফল দেখা যায় না।
অন্যদিকে, প্রতিপক্ষ যখন নিজের অন্যায় আচরণ স্বীকার করেন, তখন অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অনুভূতির স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে বেশি মনে করেন। তাদের ক্ষমা করার আগ্রহও বেড়ে যায়।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শুধু অন্যায় স্বীকার করাও ক্ষমা চাওয়া ও অন্যায় স্বীকার করার সম্মিলিত বক্তব্যের মতো কার্যকর ছিল।
এর অর্থ, ক্ষমা পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ‘স্যরি’ বলার চেয়ে নিজের আচরণের দায় নেওয়া অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
‘তোমার কষ্টের জন্য আমি স্যরি’ বললেই কি যথেষ্ট?
কেউ কষ্ট পেলে তাকে শুধু ‘তুমি কষ্ট পেয়েছ বলে দুঃখিত বা স্যরি’ বলা কিংবা ‘যদি তোমাকে কষ্ট দিয়ে থাকি, তাহলে দুঃখিত’ বলার মধ্যে একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ ধরনের কথায় নিজের আচরণের দায় সরাসরি স্বীকার করা হয় না।
বরং কী কারণে অন্য ব্যক্তি কষ্ট পেয়েছেন, সেটি বোঝার চেষ্টা করা এবং নিজের ভুলের কথা স্পষ্টভাবে স্বীকার করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
যেমন, ‘তোমার সঙ্গে যেভাবে কথা বলেছি, তা ঠিক হয়নি। আমার কথায় তুমি কষ্ট পেয়েছ, সেটা আমি বুঝতে পারছি। এর জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’
এ ধরনের বক্তব্যে শুধু অনুশোচনা নয়, ভুল স্বীকার ও অন্যের অনুভূতির প্রতি সম্মানও প্রকাশ পায়।
আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনার গুরুত্বপূর্ণ দিক
সম্পর্কের ভুল বোঝাবুঝি কাটাতে ক্ষমা চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব ধরনের ক্ষতির ক্ষেত্রে শুধু ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়। গুরুতর কোনো ঘটনার পর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হলে অনুশোচনার পাশাপাশি ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং ভবিষ্যতে আচরণ পরিবর্তনের প্রমাণও প্রয়োজন হতে পারে।
তাই ক্ষমা চাইতে হলে শুধু নিজের ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেই চলবে না। অন্য ব্যক্তি কেন কষ্ট পেয়েছেন, সেটিও বোঝার চেষ্টা করতে হবে। একইভাবে, কেউ ক্ষমা চাইলে শুধু তাঁর মুখের কথার দিকে না তাকিয়ে নিজের কষ্টের স্বীকৃতি পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
কারণ, একটি আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা শুধু ভুলের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করে না, বরং সম্পর্কের ক্ষতি বুঝতে পারা এবং তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টাও তুলে ধরে।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে