বিজ্ঞাপন
ওয়ারিশি জমি নিজের নামে নিতে কী করবেন? জেনে নিন নিয়ম
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ পিএম
বিজ্ঞাপন
পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলে তার রেখে যাওয়া জমির মালিকানা উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হয়। তবে উত্তরাধিকারী হলেই সরকারি ভূমি রেকর্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের নাম যুক্ত হয় না। এ জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে নামজারির আবেদন করতে হয়।
বাংলাদেশে ওয়ারিশি জমির নামজারির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, জমি ভাগ না করেও সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করা যায়। এ জন্য বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন নেই। তবে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল করতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির পরিপত্রে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সব ওয়ারিশের যৌথ নামজারির আবেদন শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে বাতিল করা যাবে না।
তাহলে ওয়ারিশি জমি নিজের নামে নিতে কী করতে হবে, কোন কাগজপত্র লাগবে এবং কীভাবে আবেদন করবেন— জেনে নিন বিস্তারিত।
প্রথম ধাপ: সব বৈধ ওয়ারিশের তালিকা তৈরি
ওয়ারিশি জমির নামজারির আগে মৃত ব্যক্তির সব বৈধ উত্তরাধিকারীর তালিকা তৈরি করতে হবে। শুধু জমির দেখাশোনা করেন বা বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন— এমন ব্যক্তিদের নাম দিলেই হবে না। প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী যারা সম্পত্তির অংশীদার, তাদের সবাইকে তালিকায় রাখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান, বাবা-মা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অন্য উত্তরাধিকারীদের তথ্য যাচাই করতে হবে। কোনো ওয়ারিশ আগে মারা গিয়ে থাকলে তার উত্তরাধিকারীদের বিষয়টিও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিবেচনায় নিতে হবে।
সব ওয়ারিশের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, ঠিকানা এবং মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য সংগ্রহ করে রাখুন। পরবর্তী সময়ে ওয়ারিশ সনদ ও নামজারির আবেদন করতে এসব তথ্য প্রয়োজন হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ
মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে ওয়ারিশ সনদ নিতে হবে।
ওয়ারিশ সনদে সব বৈধ ওয়ারিশের নাম ও পরিচয় সঠিকভাবে উল্লেখ আছে কি না, তা ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে বা তথ্যে ভুল থাকলে নামজারির আবেদন নিষ্পত্তিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, ওয়ারিশ সনদ উত্তরাধিকারীদের পরিচয় ও সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি জমির চূড়ান্ত বণ্টননামা নয়। কে কতটুকু জমি পাবেন, তা নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী।
তৃতীয় ধাপ: জমির দলিল ও খতিয়ান যাচাই
ওয়ারিশদের তালিকা তৈরির পর মৃত ব্যক্তির নামে থাকা জমির মালিকানা ও পরিমাণ যাচাই করতে হবে। অনেক সময় পরিবারের ধারণার সঙ্গে সরকারি রেকর্ডে থাকা জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর বা খতিয়ানের তথ্যের অমিল পাওয়া যায়।
এ জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করুন—
মৃত ব্যক্তির নামে থাকা সর্বশেষ খতিয়ান বা পর্চা।
জমির মূল দলিল অথবা সার্টিফায়েড কপি।
আগের মালিকানার দলিল বা বায়া দলিল, প্রয়োজনে।
জমির দাগ নম্বর, মৌজা ও জমির পরিমাণের তথ্য।
ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।
মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশ সনদ।
সব ওয়ারিশের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
আদালতের কোনো রায় বা ডিক্রি থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র।
দলিল, খতিয়ান ও দাগ নম্বরের মধ্যে কোনো অসংগতি আছে কি না, তা আবেদন করার আগেই পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। এতে নামজারির সময় অতিরিক্ত যাচাই বা আপত্তির মুখে পড়ার আশঙ্কা কমে।
চতুর্থ ধাপ: প্রত্যেক ওয়ারিশের হিস্যা নির্ধারণ
সব বৈধ ওয়ারিশের পরিচয় নিশ্চিত করার পর কে কতটুকু জমি পাবেন, তা নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের প্রচলিত ধারণা বা মৌখিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
বাংলাদেশে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তির ভাগ নির্ধারিত হয় মৃত ব্যক্তির ধর্ম ও প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী। ফলে সব পরিবারের জন্য একই বণ্টননীতি প্রযোজ্য নয়। মৃত ব্যক্তির জীবিত উত্তরাধিকারী কারা, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট আইন বিবেচনা করে প্রত্যেকের অংশ হিসাব করতে হবে।
হিস্যা নিয়ে মতবিরোধ থাকলে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। ভুল হিস্যা ধরে জমি ভাগ বা নামজারির আবেদন করলে ভবিষ্যতে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
পঞ্চম ধাপ: যৌথ নামজারি, নাকি পৃথক খতিয়ান?
ওয়ারিশি জমির নামজারির ক্ষেত্রে মূলত দুটি পদ্ধতি রয়েছে। ওয়ারিশরা জমি এখনই ভাগ করতে চান কি না, তার ওপর নির্ভর করবে কোন পদ্ধতিতে আবেদন করবেন।
১. জমি ভাগ না করে যৌথ নামজারি
ওয়ারিশরা যদি আপাতত জমি ভাগ করতে না চান, তাহলে সবাই মিলে যৌথ নামজারির আবেদন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির জমির বিপরীতে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং প্রত্যেকের আইনগত হিস্যা উল্লেখ থাকবে।
এ ধরনের যৌথ নামজারির জন্য বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন নেই। তবে সব বৈধ ওয়ারিশের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আবেদনের সঙ্গে জমা দিতে হবে।
২. জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান
ওয়ারিশরা যদি জমি ভাগ করে প্রত্যেকে নির্দিষ্ট দাগ বা অংশের মালিক হতে চান, তাহলে প্রথমে তাঁদের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে বণ্টন করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট সবার স্বাক্ষরে বণ্টননামা দলিল তৈরি করে নিবন্ধন করতে হবে।
নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে প্রত্যেকে নিজের বরাদ্দ করা অংশের জন্য পৃথক নামজারি ও খতিয়ানের আবেদন করতে পারবেন।
অর্থাৎ, জমি ভাগ না করলে যৌথ নামজারি করা যাবে; আর জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন।
ষষ্ঠ ধাপ: অনলাইনে নামজারির আবেদন
প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র সংগ্রহের পর ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করা যায়।
এ জন্য mutation.land.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে নামজারির আবেদন করতে হবে। আবেদন করার সময়—
১. নামজারির আবেদনসংক্রান্ত অপশন নির্বাচন করুন।
২. আবেদনকারী ও জমির প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করুন।
৩. মৃত ব্যক্তির নামে থাকা খতিয়ান, দাগ নম্বর, মৌজা ও জমির পরিমাণ উল্লেখ করুন।
৪. উত্তরাধিকার সূত্রে নামজারির ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের তথ্য ও ওয়ারিশ সনদ যুক্ত করুন।
৫. প্রয়োজনীয় দলিল, খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং অন্যান্য প্রমাণক আপলোড করুন।
৬. নির্ধারিত আবেদন ও নোটিশ জারির ফি পরিশোধ করুন।
৭. আবেদন জমা দেওয়ার পর পাওয়া নম্বর ও রসিদ সংরক্ষণ করুন।
আবেদন জমা হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কাগজপত্র যাচাই করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী তদন্ত বা শুনানির ব্যবস্থা করা হতে পারে। সবকিছু যাচাই শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
নামজারি অনুমোদনের পর করণীয়
নামজারির আবেদন অনুমোদিত হলে নতুন খতিয়ান প্রস্তুত ও নির্ধারিত ফি পরিশোধের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এরপর নামজারি খতিয়ান ও সংশ্লিষ্ট রসিদ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করুন।
পাশাপাশি নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন করের হিসাব হালনাগাদ হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। খতিয়ানে নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ বা হিস্যার তথ্যে ভুল থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
তবে মনে রাখতে হবে, নামজারি মূলত সরকারি ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের প্রক্রিয়া। শুধু নামজারি হলেই জমির মালিকানা নিয়ে সব ধরনের বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। মালিকানা বা উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ থাকলে তা প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।
ওয়ারিশি জমির নামজারিতে যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
জমি নিয়ে ভবিষ্যতের জটিলতা এড়াতে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি—
কোনো বৈধ ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে পুরো জমি নিজের নামে নামজারির চেষ্টা করবেন না।
ওয়ারিশ সনদে সব উত্তরাধিকারীর নাম আছে কি না, যাচাই না করে আবেদন করবেন না।
আইন অনুযায়ী হিস্যা নির্ধারণ না করে জমি ভাগ করবেন না।
নিবন্ধিত বণ্টননামা ছাড়া পৃথক খতিয়ান পাওয়ার প্রত্যাশা করবেন না।
জমির দলিল, দাগ নম্বর ও খতিয়ানের তথ্য যাচাই না করে কোনো দলিলে স্বাক্ষর করবেন না।
জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে জোর করে দখল বা একতরফা বণ্টনের পথে না গিয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।