বিজ্ঞাপন
ঘুমানোর সেরা পোশাক হতে পারে ‘কোনো পোশাকই নয়’, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
বিজ্ঞাপন
ভারী কম্বলের নিচে অতিরিক্ত গরমে রাতভর এপাশ-ওপাশ করার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। শরীরের তাপমাত্রা বেশি থাকলে যে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, তা অনেকেই নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের মান ভালো রাখতে শরীর ঠান্ডা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে নগ্ন হয়ে ঘুমানো কিংবা হালকা পোশাক পরার অভ্যাস উপকারী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের গবেষণা ও বৈজ্ঞানিকবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফ ডিজারজেউস্কি বলেন, ঘুমের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়িত বিষয়গুলোর একটি। আলো, মোবাইলের পর্দা কিংবা মানসিক চাপ নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও তাপমাত্রা ও বাতাস চলাচলের সামান্য পরিবর্তনও ঘুম আসতে কতটা সময় লাগবে এবং কতটা গভীর ঘুম হবে, তা প্রভাবিত করতে পারে।
তার মতে, ঘুমানোর জন্য শরীরের স্বাভাবিক কেন্দ্রীয় তাপমাত্রা প্রায় ১ থেকে ২ ডিগ্রি ফারেনহাইট (০.৬ থেকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস) কমে যায়। এই তাপমাত্রা কমার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও ঘুম বারবার ভেঙে যেতে পারে এবং ঘুমের পর শরীর যথেষ্ট সতেজ নাও হতে পারে।
ডিজারজেউস্কির মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুমের সময় শরীরের চারপাশে আরামদায়ক তাপমাত্রা বজায় রাখা। অর্থাৎ ত্বক, ঘুমের পোশাক ও বিছানার চাদরের মধ্যে যেন অতিরিক্ত তাপ আটকে না থাকে।
তিনি বলেন, কারও জন্য নগ্ন হয়ে বা খুব কম পোশাক পরে ঘুমানো উপকারী হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে হালকা ও ঘাম শোষণ করতে পারে এমন কাপড়ের পোশাক ভালো কাজ করে। মূল লক্ষ্য হলো স্বস্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি বজায় রেখে শরীরকে স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে সাহায্য করা।
যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ডের বাসিন্দা ব্রায়ান ডিভা কক্সের কাছে এই স্বস্তি পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো নগ্ন হয়ে ঘুমানো। কৈশোর থেকেই এটি তার রাতের অভ্যাস। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর অভ্যাসটি কিছুটা কমলেও আরাম ও শরীরের পুনরুদ্ধারকে গুরুত্ব দিতে চাইলে, বিশেষ করে সময় কম থাকলে, তিনি এখনো নগ্ন হয়ে ঘুমান।
কক্স বলেন, এভাবে ঘুমালে সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে সতেজ মনে হয়। তার দাবি, পরদিন শরীরে পর্যাপ্ত শক্তি অনুভব করেন এবং স্মার্টওয়াচের ঘুমের পরিসংখ্যানেও ঘুমের মান ভালো দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগ্ন হয়ে ঘুমানো হোক কিংবা হালকা পোশাক পরা—শরীরের চারপাশে তাপ ধরে রাখার পরিমাণ কমালে শরীর থেকে তাপ বেরিয়ে যেতে সুবিধা হয়।
তবে মজার বিষয় হলো, ঘুমানোর আগে হাত-পা গরম রাখলেও শরীরের তাপ বের হতে সাহায্য করতে পারে। ডিজারজেউস্কি জানান, ঘুমানোর আগে হাত-পা উষ্ণ করলে শরীর আরও দক্ষতার সঙ্গে তাপ ছেড়ে দিতে পারে এবং দ্রুত ঘুম আসতে পারে। যাঁদের হাত-পা স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা থাকে, তারা ঘুমের সময় এগুলো আরামদায়ক উষ্ণতায় রাখলে ঘুমের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারেন। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও ঘুমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজারজেউস্কি বলেন, বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘামের মাধ্যমে শরীরের তাপ বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। তাই গদি, বিছানার চাদর ও ঘুমের পোশাকে বাতাস চলাচল করতে পারে এবং ঘাম শোষণ করে এমন উপাদান ব্যবহার করা উপকারী।
তিনি আরও বলেন, ঘরের তাপমাত্রা সাধারণত ৬০ থেকে ৬৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় ১৫ থেকে ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রাখলে এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে ঘুমের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি হয়। তবে ব্যক্তিভেদে আরামদায়ক তাপমাত্রা ভিন্ন হতে পারে। যাঁদের শরীর বেশি গরম হয় কিংবা হরমোনজনিত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তারা সাধারণত এই সীমার তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় বেশি স্বস্তি পান।
শুধু ঘরের তাপমাত্রা কম রাখলেই হবে না, সারা রাত তা যতটা সম্ভব স্থিতিশীল রাখাও জরুরি। তাপমাত্রার বড় ধরনের ওঠানামায় মাঝরাতে শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
তাপমাত্রা শুধু ঘুমের মানকেই প্রভাবিত করে না, প্রজননস্বাস্থ্যের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। সিএনএনের চিকিৎসাবিষয়ক লেখত, ইউরোলজিস্ট ও রোবোটিক সার্জন ডা. জামিন ব্রাহ্মভাট বলেন, অণ্ডকোষ শরীরের বাইরে থাকার একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য শরীরের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রার চেয়ে কয়েক ডিগ্রি কম তাপমাত্রা প্রয়োজন।
তাই ঘুমানোর সময় কী ধরনের পোশাক পরা হচ্ছে, কিংবা একেবারেই পোশাক ছাড়া ঘুমানো হচ্ছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা কলেজ অব মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ব্রাহ্মভাট হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় গবেষণার কথাও উল্লেখ করেন। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পুরুষ বক্সার শর্টস পরেন, তাদের শুক্রাণুর ঘনত্ব আঁটসাঁট অন্তর্বাস পরা পুরুষদের তুলনায় বেশি। তবে তার মতে, এখানে মূল বিষয় অন্তর্বাস কতটা আঁটসাঁট, তা নয়; বরং শরীরের চারপাশে কতটা তাপ আটকে থাকছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আঁটসাঁট অন্তর্বাস শরীরের কাছাকাছি তাপ আটকে রাখে। হট টাব বা কোলে ল্যাপটপ রাখার বিষয়ে যে সতর্কতা দেওয়া হয়, সেখানেও একই বিষয় কাজ করে—অতিরিক্ত তাপ। অর্থাৎ বিষয়টি মূলত চাপ বা সংকোচনের নয়, বরং তাপ আটকে রাখার পরিমাণের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগ্ন হয়ে ঘুমানো কিংবা বাতাস চলাচল করতে পারে এমন পোশাক পরার মাধ্যমে রাতে শরীরে অতিরিক্ত তাপ জমা হওয়া কমানো সম্ভব। পাশাপাশি ভালো ঘুম হরমোনের স্বাস্থ্যের জন্যও সহায়ক হতে পারে।
ব্রাহ্মভাট বলেন, পুরুষদের ঘুম ভালো হলে টেস্টোস্টেরন হরমোনের উৎপাদনও উন্নত হয়। কারণ, এই হরমোনের বেশির ভাগ উৎপাদন ঘুমের সময় হয়ে থাকে। গভীর ও পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের শক্তি, মেজাজ এবং যৌন সক্ষমতা ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে। ভালো ঘুম হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে, যা যৌন আকাঙ্ক্ষার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে এসব সুবিধা পেতে নগ্ন হয়ে ঘুমানো বাধ্যতামূলক নয়। ব্রাহ্মভাটের ভাষায়, মূল বিষয় হলো ঘুমের সময় শরীর ঠান্ডা রাখা। আর কেউ নগ্ন হয়ে ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিলে তাকে বিছানার চাদর আরও ঘন ঘন ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সঙ্গীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতেও সহায়ক
নগ্ন হয়ে কিংবা অল্প পোশাক পরে ঘুমানোর সম্ভাব্য সুবিধা শুধু শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়। দাম্পত্য ও সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বাড়াতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
লাইসেন্সপ্রাপ্ত ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি থেরাপিস্ট ইয়ান কার্নার বলেন, সঙ্গীর সঙ্গে নগ্ন অবস্থায় ঘুমানো বা গা ঘেঁষে শোয়া পারস্পরিক সংযোগ ও ঘনিষ্ঠতা অনুভবের একটি উপায় হতে পারে। এর সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক থাকতেই হবে, এমন নয়। তবে এটি সম্পর্কের আবেগীয় বন্ধন ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। কখনো কখনো ক্লান্ত অবস্থায় বিছানায় যাওয়ার পরও যৌন ঘনিষ্ঠতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তার মতে, যৌন সম্পর্ক না হলেও ত্বকের সঙ্গে ত্বকের স্পর্শ গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের স্পর্শের সঙ্গে অক্সিটোসিন হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে। এই হরমোন পারস্পরিক বন্ধন ও আবেগীয় ঘনিষ্ঠতার সঙ্গে যুক্ত।
কার্নার বলেন, যৌন আকাঙ্ক্ষা না থাকলেও সঙ্গীর সঙ্গে এভাবে বিছানায় সময় কাটানো যায়। এর মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ তৈরি হয় এবং কখনো কখনো সেখান থেকেই যৌন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিতে পারে। যেসব দম্পতি নগ্ন হয়ে ঘুমান, তাদের অনেকেই বিষয়টিকে পছন্দ করেন এবং একসময় এটি তাদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়। তবে সঙ্গীর সঙ্গে এমন অভ্যাস শুরু করার আগে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।
কার্নার এ বিষয়ে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন। বিষয়টি হালকা ও মজার ছলে উপস্থাপন করা যেতে পারে। যেমন, সঙ্গীকে বলা যেতে পারে, ‘আজ রাতে আমি নগ্ন হয়ে ঘুমাব। তুমি কি আমার সঙ্গে যোগ দেবে?’ তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিষয়টিকে যৌনতার প্রস্তাব হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।
আরেকটি উপায় হলো সঙ্গীকে বলা, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বা একান্ত সময় কাটানো আগের চেয়ে কমে গেছে বলে মনে হচ্ছে। তাই দুজন মিলে নগ্ন অবস্থায় বিছানায় কিছুটা সময় কাটিয়ে আবারও সেই ঘনিষ্ঠতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যেতে পারে।
সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে চেষ্টা করছেন এমন দম্পতিদের জন্য কার্নার ‘উইলিংনেস উইন্ডো’ বা আগ্রহ ও সম্মতির সুযোগ তৈরির একটি ধারণার কথা বলেন। এর অর্থ, সঙ্গীদের শুরুতেই যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিছানায় যেতে হবে না; বরং একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ও আগ্রহী থাকাই যথেষ্ট।
তিনি বলেন, পাশাপাশি নগ্ন হয়ে শুয়ে থাকাও ঘনিষ্ঠতা তৈরির প্রথম ধাপ হতে পারে। প্রতিদিন এমনটি করতে হবে না। সপ্তাহে একবারও চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে, এতে দুজনের কেমন লাগে।
কার্নারের মতে, নগ্ন হয়ে ঘুমানো কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয়। তবে এটি সঙ্গীর সঙ্গে বিছানায় কিছুটা সময় কাটানোর একটি উপলক্ষ হতে পারে। এ সময় মোবাইল ফোন দূরে রেখে দুজন মানুষ হিসেবে একে অপরের সঙ্গে সময় কাটানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, কেউ সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে ঘুমান কিংবা হালকা ও আরামদায়ক পোশাক বেছে নেন—উদ্দেশ্য একই। শরীরকে ঠান্ডা রাখা, গভীর ও ভালো ঘুম নিশ্চিত করা এবং সম্ভব হলে সঙ্গীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো। তবে নগ্ন হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করলে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পরার জন্য হাতের কাছে কিছু পোশাক রাখা উচিত।