বিজ্ঞাপন
বার্ধক্যের গতি কমাতে পারে ভিটামিন ডি, হার্ভার্ডের গবেষণায় উঠে এল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৩ এএম
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিন ভিটামিন ডি গ্রহণে শরীরের কোষে বার্ধক্যজনিত একটি পরিবর্তনের গতি কমতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত চার বছরব্যাপী এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ডি₃ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণকারীদের শ্বেত রক্তকণিকার টেলোমিয়ার প্লাসিবো বা নিষ্ক্রিয় বড়ি গ্রহণকারীদের তুলনায় কম ছোট হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই ফলাফল জৈবিক বার্ধক্যের একটি প্রক্রিয়া ধীর করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভিটামিন ডি গ্রহণ করলে মানুষের সামগ্রিক বার্ধক্য থেমে যাবে কিংবা আয়ু নিশ্চিতভাবে বেড়ে যাবে।
২০২৫ সালে দ্য আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন-এ প্রকাশিত গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের ভিটামিন ডি ও ওমেগা-৩ নিয়ে পরিচালিত বৃহৎ ‘ভাইটাল’ (VITAL) গবেষণার একটি অংশ। এতে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী এক হাজারের বেশি নারী-পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল, দীর্ঘ সময় ধরে ভিটামিন ডি বা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড গ্রহণ করলে কোষের জিনগত উপাদানের প্রান্তে থাকা টেলোমিয়ারের ক্ষয় কমে কি না, তা পরীক্ষা করা।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একাংশ প্রতিদিন ২ হাজার আন্তর্জাতিক একক (আইইউ) ভিটামিন ডি₃ গ্রহণ করেন। অন্যদের দেওয়া হয় প্লাসিবো—দেখতে ওষুধের মতো হলেও যার মধ্যে পরীক্ষাধীন কার্যকর উপাদান থাকে না। গবেষণার অংশ হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের রক্তের শ্বেত রক্তকণিকার টেলোমিয়ারের দৈর্ঘ্য শুরুতে, দুই বছর পর এবং চার বছর পর পরিমাপ করা হয়। প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫৪ জনকে নিয়ে এই উপগবেষণা শুরু হলেও বিশ্লেষণে ১ হাজার ৩১ জনের পরিমাপযোগ্য তথ্য ব্যবহার করা হয়।
চার বছর পর দেখা যায়, প্লাসিবো গ্রহণকারীদের তুলনায় ভিটামিন ডি₃ গ্রহণকারীদের টেলোমিয়ার ক্ষয় গড়ে ১৪০ বেস পেয়ার কম হয়েছে। বেস পেয়ার হলো ডিএনএর গঠন তৈরির মৌলিক একক। সংখ্যাটি পরিমিত হলেও গবেষণায় পাওয়া পার্থক্যটি পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, টেলোমিয়ারের এই পার্থক্য আগের গবেষণার ভিত্তিতে জৈবিক বার্ধক্যের প্রায় তিন বছরের সমতুল্য হতে পারে। তবে এটিকে সরাসরি তিন বছর বেশি বেঁচে থাকা বা শরীরের বয়স তিন বছর কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
টেলোমিয়ার কী এবং বার্ধক্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ—সেটিও এই গবেষণার মূল বিষয়। মানুষের প্রতিটি ক্রোমোজোমের দুই প্রান্তে টেলোমিয়ার থাকে। জুতার ফিতার মাথায় থাকা ছোট প্লাস্টিকের আবরণের সঙ্গে এর তুলনা করা যায়। ওই আবরণ যেমন ফিতার প্রান্তকে ছিঁড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে, তেমনি টেলোমিয়ার ক্রোমোজোমের জিনগত উপাদানকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
কোষ বিভাজনের সময় সাধারণত টেলোমিয়ার ধীরে ধীরে ছোট হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে এই পরিবর্তন জমতে থাকে। টেলোমিয়ারের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়া কোষের বার্ধক্য এবং বিভিন্ন বয়সজনিত রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে আগের গবেষণায় দেখা গেছে। তবে বার্ধক্য একটি জটিল প্রক্রিয়া; এর পেছনে শুধু টেলোমিয়ারের পরিবর্তন নয়, আরও অনেক জৈবিক ও জীবনযাপনসংক্রান্ত বিষয় কাজ করে। তাই টেলোমিয়ারের ক্ষয় কমানোকে বার্ধক্যের সব লক্ষণ ঠেকানোর সমান বলা যায় না।
গবেষণাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের প্রভাবও পরীক্ষা করা হয়েছিল। কিন্তু চার বছর পর ওমেগা-৩ গ্রহণকারীদের টেলোমিয়ারের দৈর্ঘ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ এই নির্দিষ্ট গবেষণায় কোষের টেলোমিয়ার ক্ষয় কমানোর ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি₃-এর প্রভাব দেখা গেলেও ওমেগা-৩-এর ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যায়নি।
গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক জোঅ্যান ম্যানসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শরীরের প্রদাহ টেলোমিয়ার ছোট হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। ভিটামিন ডি প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ আবার হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন বয়সজনিত অসুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এই গবেষণা ভিটামিন ডি গ্রহণের মাধ্যমে এসব রোগ প্রতিরোধ করা যায়—এমন সিদ্ধান্ত দেয়নি। গবেষণার ফল মূলত টেলোমিয়ারের দৈর্ঘ্যে পরিবর্তন নিয়ে, রোগ প্রতিরোধ বা মানুষের আয়ু বাড়ানোর সরাসরি পরীক্ষা নয়।
ভিটামিন ডি কতটা প্রয়োজন, তা নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি অব মেডিসিনের সুপারিশ অনুযায়ী, ৭০ বছর পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক ৬০০ আইইউ এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের ৮০০ আইইউ ভিটামিন ডি প্রয়োজন। গবেষণায় ব্যবহৃত ২ হাজার আইইউ মাত্রা এই সাধারণ সুপারিশের চেয়ে বেশি। ফলে গবেষণায় ব্যবহৃত মাত্রাকেই সবার জন্য দৈনিক গ্রহণের আদর্শ মাত্রা ধরে নেওয়া উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন পেশাগত চিকিৎসা সংগঠন সাধারণভাবে সবার রক্তে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা পরীক্ষা করা কিংবা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়মিত সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার পরামর্শ দেয় না। কারও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি আছে কি না, তা তার খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যগত অবস্থা, বয়স এবং অন্যান্য ঝুঁকির ওপর নির্ভর করতে পারে। যাঁদের শরীরে পুষ্টি শোষণে সমস্যা রয়েছে, যাঁরা হাড়ের সমস্যার চিকিৎসা নিচ্ছেন অথবা যাঁদের খাদ্যতালিকায় উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
খাবার থেকেও ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। স্যামন, সার্ডিন ও টুনার মতো চর্বিযুক্ত মাছ এবং কিছু বুনো মাশরুম এর উৎস। কিছু দেশে দুধজাত খাবার, সিরিয়াল ও কমলার রসেও ভিটামিন ডি যোগ করা হয়। তাই প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিগুণের তথ্য দেখে নেওয়া সহায়ক হতে পারে। সূর্যের আলোতেও ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরি হয়, যদিও এর পরিমাণ নির্ভর করে সময়, ঋতু, ত্বকের ধরন ও অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর।
অতিরিক্ত ভিটামিন ডি গ্রহণ করলেই যে বেশি উপকার হবে, এমন নয়। খুব বেশি মাত্রায় ভিটামিন ডি নিলে রক্ত বা প্রস্রাবে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং বাইরে সক্রিয় থাকা সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, চার বছরের গবেষণাটি ভিটামিন ডি₃ এবং কোষের বার্ধক্যসংক্রান্ত একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিয়েছে। তবে ফলাফলকে নিশ্চিতভাবে বার্ধক্য ঠেকানোর উপায় হিসেবে দেখার আগে আরও গবেষণা প্রয়োজন। আপাতত ভিটামিন ডি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত চাহিদা, প্রয়োজনীয় মাত্রা এবং চিকিৎসকের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়াই যুক্তিযুক্ত।