বিজ্ঞাপন
ফ্যাটি লিভার থেকে ক্যানসার, নীরবে বিপদ বাড়ায় শরীরের যে লক্ষণগুলো
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫২ এএম
বিজ্ঞাপন
লিভার বা যকৃত শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। খাবার হজমে সহায়তা করা, পুষ্টি উপাদান সঞ্চয়, বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ অপসারণসহ নানা কাজ করে এটি। তবে লিভারে সমস্যা দেখা দিলে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় স্পষ্ট কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।
ফ্যাটি লিভার, হেপাটাইটিস ও লিভার সিরোসিসের মতো রোগের সঙ্গে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে লিভারের সমস্যা থাকলে শরীরের কিছু পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। অকারণে ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি কিংবা পেটের ডান দিকে ব্যথার মতো উপসর্গকে অবহেলা করা ঠিক নয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিভার ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ শারীরিক সমস্যার মতো মনে হয়। ফলে অনেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন না। অথচ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্যাটি লিভার থেকে কি ক্যানসার হতে পারে?
লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। বর্তমানে অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও বিপাকজনিত সমস্যার কারণে এ রোগের প্রবণতা বাড়ছে।
ফ্যাটি লিভারের সব রোগীর ক্যানসার হয় না। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লিভারে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, ক্ষত সৃষ্টি এবং পরবর্তী সময়ে সিরোসিস হতে পারে। এসব জটিলতা লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে বিপাকজনিত ফ্যাটি লিভারের গুরুতর রূপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণ এবং লিভার সিরোসিস লিভার ক্যানসারের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। তাই লিভারের সমস্যা শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
শরীরের যেসব লক্ষণ অবহেলা করবেন না
১. খাদ্যাভ্যাস বা শরীরচর্চায় পরিবর্তন না এনেও ওজন কমতে থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। অনেকেই কাজের চাপ, মানসিক উদ্বেগ কিংবা হজমের সমস্যাকে এর কারণ মনে করেন। কিন্তু কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. আগের তুলনায় খাওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়া কিংবা অল্প খাবার খেয়েই পেট ভরে গেছে বলে মনে হওয়া লিভারের গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এর সঙ্গে ওজন কমে যাওয়া বা দুর্বলতা দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়।
৩. পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও ক্লান্তি না কাটলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। লিভারের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে দুর্বলতা ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে ক্লান্তি অনেক সাধারণ রোগের কারণেও হতে পারে। তাই শুধু এ লক্ষণ দেখে ক্যানসার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৪. লিভার ক্যানসার হলে পেটের ওপরের ডান দিকে, পাঁজরের নিচে ব্যথা বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। কখনো পেটের ওই অংশে ভারী ভাব কিংবা ফোলাভাবও অনুভূত হয়।
রোগের অগ্রগতির সঙ্গে পেটে তরল জমে পেট ফুলে যেতে পারে। এ ছাড়া লিভার বড় হয়ে যাওয়ার কারণে পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গের অন্য কারণও রয়েছে। তাই সমস্যা স্থায়ী হলে পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
৫. চোখের সাদা অংশ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া জন্ডিসের লক্ষণ। এর সঙ্গে প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া, মল ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া কিংবা ত্বকে চুলকানির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
লিভার ক্যানসার ছাড়াও হেপাটাইটিস, পিত্তনালির সমস্যা ও অন্যান্য রোগের কারণে জন্ডিস হতে পারে। তাই এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৬. লিভারের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেলে শরীরে তরল জমে পা বা গোড়ালি ফুলে যেতে পারে। পাশাপাশি রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে সহজে কালশিটে পড়া বা রক্তপাতের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ লিভারের বিভিন্ন জটিল রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৭. লিভারের গুরুতর রোগে বিভ্রান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা কিংবা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে আগে থেকেই লিভারের রোগ রয়েছে, এমন ব্যক্তির মধ্যে হঠাৎ মানসিক অবস্থার পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
লিভার ক্যানসার শনাক্ত করবেন যেভাবে
লিভার ক্যানসার শনাক্ত করতে চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, পূর্ববর্তী রোগের ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক ধরনের পরীক্ষা করা হতে পারে। যেমন—
রক্ত পরীক্ষা: লিভারের কার্যক্ষমতা যাচাই এবং আলফা-ফিটোপ্রোটিনের (এএফপি) মাত্রা পরীক্ষা।
আলট্রাসনোগ্রাম: লিভারের গঠন ও অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করা।
সিটি স্ক্যান বা এমআরআই: লিভারে কোনো অস্বাভাবিক গঠন থাকলে তা আরও বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা।
তবে কোনো একটি রক্ত পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই লিভার ক্যানসার নিশ্চিত করা যায় না। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন। দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি কিংবা লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসক নির্দিষ্ট সময় পরপর আলট্রাসনোগ্রাম ও অন্যান্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
ফ্যাটি লিভার ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে করণীয়
ফ্যাটি লিভার থাকলেই ক্যানসার হবে, এমন নয়। তবে লিভারের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা।
নিয়মিত হাঁটা ও শরীরচর্চা করা।
সুষম খাবার খাওয়া এবং অতিরিক্ত চিনি ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার সীমিত রাখা।
ডায়াবেটিস ও রক্তে চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা।
অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা।
হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে টিকা নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হেপাটাইটিস পরীক্ষা করানো। আগে থেকে লিভারের রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা করানো।