বিজ্ঞাপন
দুই সপ্তাহ কফি না খেয়ে শরীরের ভেতরে কী কী পরিবর্তন হয়, জানাল নতুন গবেষণা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৭ পিএম
বিজ্ঞাপন
নিয়মিত কফি পান করা হঠাৎ বন্ধ রাখলে শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্কের গবেষকেরা ৬২ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন। এতে দেখা গেছে, কফি পানকারীদের অন্ত্রের জীবাণু ও সেগুলোর তৈরি রাসায়নিক উপাদানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। কফি আবার পান শুরু করার পর মেজাজ, মানসিক চাপ এবং কিছু জ্ঞানীয় কার্যক্রমেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কফির সম্ভাব্য প্রভাব শুধু ক্যাফেইনের ওপর নির্ভরশীল নাও হতে পারে।
গবেষণাটি ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল নেচার কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা কফি পান, অন্ত্রের জীবাণু, বিপাকপ্রক্রিয়া এবং মস্তিষ্কের কার্যক্রমের মধ্যকার সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করেছেন। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, ফলাফলগুলোকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। কফি পান এবং স্বাস্থ্যের বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেলেই একটি অন্যটির সরাসরি কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বয়স ছিল ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। তাঁদের মধ্যে ৩১ জন নিয়মিত কফি পান করতেন না। অন্য ৩১ জন সাধারণত প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ কাপ কফি পান করতেন। প্রথমে দুই দলের অন্ত্রের জীবাণু, বিপাকজাত রাসায়নিক উপাদান, মেজাজ, মানসিক চাপ, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি মূল্যায়ন করা হয়।
এরপর নিয়মিত কফি পানকারীদের টানা দুই সপ্তাহ কফি পান থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। এ সময় তাঁদের শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। দুই সপ্তাহ পর অংশগ্রহণকারীদের আবার কফি পান করতে দেওয়া হয়। তাঁদের এক দল ক্যাফেইনযুক্ত এবং অন্য দল ক্যাফেইনমুক্ত কফি পান করেন। এই পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা জানতেন না, তাঁদের কোন ধরনের কফি দেওয়া হচ্ছে। পুনরায় কফি পান করার এই পর্যায় চলে তিন সপ্তাহ।
কফি বন্ধ করায় অন্ত্রে কী পরিবর্তন দেখা গেল
গবেষণায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি পাওয়া যায় অন্ত্রের বিপাকজাত উপাদানে। এসব উপাদান হলো শরীরের বিপাকপ্রক্রিয়া এবং অন্ত্রের জীবাণুর কার্যক্রমের ফলে তৈরি বা পরিবর্তিত হওয়া ক্ষুদ্র রাসায়নিক পদার্থ। নিয়মিত কফি পানকারীদের ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহ কফি বন্ধ রাখার পর এসব উপাদানের কয়েকটির মাত্রা বদলে যায়।
গবেষকেরা অন্ত্রের জীবাণুর গঠনেও পার্থক্য শনাক্ত করেন। নিয়মিত কফি পানকারীদের অন্ত্রে ক্রিপটোব্যাকটেরিয়াম কার্টাম এবং এগারথেলা গোত্রের কিছু জীবাণু তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। দুই সপ্তাহ কফি পান বন্ধ রাখার সময় ক্রিপটোব্যাকটেরিয়াম কার্টাম–এর উপস্থিতি কমে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। কফি পুনরায় পান শুরু করলে অন্ত্রের জীবাণুর গঠনে আবার পরিবর্তন আসে। ক্যাফেইনযুক্ত ও ক্যাফেইনমুক্ত—উভয় ধরনের কফির ক্ষেত্রেই কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট জীবাণুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া মানেই তা শরীরের জন্য উপকারী, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। জীবাণুর প্রভাব নির্ভর করে তার ধরন, কার্যক্রম এবং অন্ত্রের সামগ্রিক পরিবেশের ওপর। গবেষকেরা জানিয়েছেন, কফির সঙ্গে সম্পর্কিত এসব পরিবর্তন কীভাবে হজম, প্রদাহ এবং মস্তিষ্কের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে, তা আরও বিশদভাবে বোঝা প্রয়োজন।
ক্যাফেইনমুক্ত কফিতেও মিলেছে কিছু পরিবর্তন
কফি পুনরায় পান করার পর দুই দলের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেই নিজেদের অনুভূত মানসিক চাপ, বিষণ্নতার উপসর্গ এবং আবেগপ্রবণ আচরণের কিছু সূচকে উন্নতি দেখা যায়। যেহেতু ক্যাফেইনযুক্ত ও ক্যাফেইনমুক্ত—দুই ধরনের কফি পানকারীদের মধ্যেই এ পরিবর্তন পাওয়া গেছে, তাই এর পেছনে ক্যাফেইন ছাড়াও কফির অন্য উপাদান ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
দুই দলের মধ্যে শেখা ও স্মৃতিশক্তির পরীক্ষায়ও পার্থক্য দেখা যায়। ক্যাফেইনমুক্ত কফি পানকারীদের ক্ষেত্রে শেখা ও স্মৃতির কিছু সূচকে উন্নতি পাওয়া যায়, যা ক্যাফেইনযুক্ত কফি পানকারীদের মধ্যে একইভাবে দেখা যায়নি। অন্যদিকে, ক্যাফেইনযুক্ত কফির সঙ্গে মনোযোগ ও সতর্কতা বাড়া এবং উদ্বেগ কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
কফিতে ক্যাফেইন ছাড়াও পলিফেনলসহ নানা উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে। এর মধ্যে ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড উল্লেখযোগ্য। এসব যৌগের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অন্ত্রের জীবাণু এগুলোকে ভেঙে আরও কিছু সক্রিয় উপাদানে রূপান্তর করতে পারে। কফির দ্রবণীয় আঁশ ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উপাদানও অন্ত্রের জীবাণুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। ফলে কফির প্রভাব শুধু ক্যাফেইনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
গবেষকেরা কেন সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন
গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্কের অধ্যাপক জন ক্রায়ান বলেছেন, অন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। তবে কফি কীভাবে অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যকার যোগাযোগব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে, তার সব প্রক্রিয়া এখনো পরিষ্কার নয়। গবেষণাটি এ বিষয়ে নতুন তথ্য দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এতে কেবল সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাই ফলাফল সব বয়সী মানুষ কিংবা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই রকম হবে, তা বলা যায় না। গবেষকেরা আরও বলেছেন, ব্যক্তিভেদে অন্ত্রের জীবাণুর গঠন এবং ক্যাফেইন প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা আলাদা হতে পারে।
গবেষণার প্রধান বার্তা হলো, কফি পান ও শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে জটিল সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু কফি অন্ত্রের অসুস্থতা, বিষণ্নতা কিংবা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার চিকিৎসা—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এই গবেষণা সমর্থন করে না। কফি খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন আনার আগে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য, ঘুম ও ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।