Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

লাইফস্টাইল

ঘুমানোর আগে খাবার খাওয়ার অভ্যাস যেভাবে বাড়াতে পারে যকৃতে চর্বি জমার ঝুঁকি

Icon

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৭ এএম

ঘুমানোর আগে খাবার খাওয়ার অভ্যাস যেভাবে বাড়াতে পারে যকৃতে চর্বি জমার ঝুঁকি

বিজ্ঞাপন

রাতে দেরি করে খাবার খাওয়া বা ঘুমাতে যাওয়ার পর নাশতা করার অভ্যাস যকৃতের রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রায় দুই লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা এমন সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা রাতের খাবারের পর কিংবা ঘুমানোর সময়ের কাছাকাছি আবার খাবার খান, তাঁদের যকৃতে চর্বি জমার রোগ এবং লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ক্লিনিক্যাল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড হেপাটোলজি-তে। এতে তিনটি বড় গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাতে দেরি করে খাবার খাওয়ার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের যকৃতের রোগের ঝুঁকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে রাতে খাবার খেলেই কারও যকৃতের রোগ হবে। গবেষণাটি মূলত খাদ্য গ্রহণের সময় ও রোগের ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক চিহ্নিত করেছে।

গবেষণার প্রধান লেখক রবার্ট উইলেচানস্কি যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন হেলথ অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটির যকৃতের রোগ বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, মানুষের শরীরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে যকৃতের কার্যক্রমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই খাবারের ধরন বা উপাদান পরিবর্তন না করেও কখন খাবার খাওয়া হচ্ছে, তা পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা সম্ভব কি না, সেটি নিয়ে গবেষকেরা আগ্রহী।

গবেষণায় বিশেষভাবে দুটি রোগের ঝুঁকির বিষয় উঠে এসেছে। এর একটি হলো মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ বা এমএএসএলডি। এ রোগে যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমে। অন্যটি হলো লিভার সিরোসিস, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণে যকৃতের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়। সিরোসিস গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছালে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।

গবেষকেরা তিনটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার তথ্য ব্যবহার করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নার্সেস হেলথ স্টাডি, নার্সেস হেলথ স্টাডি-টু এবং হেলথ প্রফেশনালস ফলো-আপ স্টাডি। এসব গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৯৯ হাজার ১৫৫ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁদের খাদ্য গ্রহণের অভ্যাসের সঙ্গে যকৃতের রোগের সম্পর্ক খতিয়ে দেখেন গবেষকেরা।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, রাতে দেরি করে খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে এমএএসএলডি ও সিরোসিসের ঝুঁকি বেশি। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নিয়েও এই সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণায় বয়স, শরীরের ওজন, দৈনিক ক্যালরি গ্রহণ, ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বির মাত্রা, ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রম, অ্যালকোহল গ্রহণ এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গড়ে ১৬ বছর পর্যবেক্ষণকালে ৪ হাজার ৪৭৭ জনের এমএএসএলডি এবং ৩১২ জনের সিরোসিস শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এসব ফলাফল থেকে গবেষকেরা মনে করছেন, খাবারের সময় যকৃতের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যকৃতে চর্বি জমার রোগে আক্রান্ত হলেই যে সবার সিরোসিস হবে, এমন নয়। প্রধান গবেষক উইলেচানস্কি জানিয়েছেন, ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে তুলনামূলক অল্পসংখ্যক মানুষের রোগ গুরুতর পর্যায়ে গিয়ে সিরোসিসে রূপ নেয়। তাই গবেষণার ফলাফলকে আতঙ্কের কারণ হিসেবে না দেখে খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হওয়ার একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা উচিত।

গবেষকেরা মনে করছেন, ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগেই দিনের ক্যালরি গ্রহণ শেষ করার অভ্যাস উপকারী হতে পারে। অর্থাৎ রাতের খাবারের পর অপ্রয়োজনে বারবার নাশতা করা বা ঘুমাতে যাওয়ার পর খাবার খাওয়ার অভ্যাস কমানো নিয়ে ভাবা যেতে পারে।

ওরেগন হেলথ অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটির ঘুম ও জৈবিক ছন্দবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু ম্যাকহিলও খাবার গ্রহণের সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ঘুম, খাবার এবং ব্যায়াম—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি যখন ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয়, তখন খাবার গ্রহণ করলে শরীরের খাদ্য বিপাকের দক্ষতা কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর সঙ্গে স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং যকৃতের সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে।

মানুষের শরীরের জৈবিক ঘড়ি দিনের আলো ও রাতের অন্ধকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুম ও জেগে থাকার সময়ের পাশাপাশি বিপাকপ্রক্রিয়াতেও এই ছন্দের প্রভাব রয়েছে। রাতের শিফটে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কাজ, ঘুম ও খাবারের সময়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। গবেষকদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে খাবারের সময় নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

তবে বর্তমান গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে কে কখন কী পরিমাণ খাবার খেয়েছেন, সে বিষয়ে তথ্যের নির্ভুলতা পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি, এ ধরনের পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা থেকে দেরিতে খাবার খাওয়াই সরাসরি যকৃতের রোগের কারণ—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।

গবেষকেরা এখন খাবারের সময় পরিবর্তন করলে যকৃতের স্বাস্থ্যে বাস্তবে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তা পরীক্ষা করতে আরও গবেষণার পরিকল্পনা করছেন। এ গবেষণায় সরাসরি খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করে আগে খাবার খাওয়ার ফলে যকৃতের চর্বি জমার সঙ্গে সম্পর্কিত স্বাস্থ্যসূচকে উন্নতি হয় কি না, তা যাচাই করা হবে।

সব মিলিয়ে গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সুস্থ থাকতে শুধু কী খাওয়া হচ্ছে, সেটিই নয়, কখন খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নিয়মিত রাতে দেরি করে নাশতা করার অভ্যাস থাকলে খাবারের সময় নিয়ে সচেতন হওয়া যেতে পারে। তবে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার