Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

লাইফস্টাইল

পাকা চুলের সঙ্গে ক্যানসারের অপ্রত্যাশিত যোগসূত্র খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা

Icon

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম

পাকা চুলের সঙ্গে ক্যানসারের অপ্রত্যাশিত যোগসূত্র খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা

বিজ্ঞাপন

চুলে পাক ধরা সাধারণত বয়স বাড়ার স্বাভাবিক একটি লক্ষণ হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, চুলের রং হারানোর পেছনে শরীরের এমন একটি প্রতিরক্ষামূলক প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।

গবেষণাটি ইঁদুরের ওপর চালানো হয়েছে। এতে বিজ্ঞানীরা চুলের ফলিকলের ভেতরে থাকা বিশেষ ধরনের স্টেম সেল বা মূল কোষের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই কোষগুলোকে বলা হয় মেলানোসাইট স্টেম সেল। এগুলো থেকেই চুল ও ত্বকের রং তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রঞ্জক কোষ তৈরি হয়।

স্বাভাবিক অবস্থায় মেলানোসাইট স্টেম সেল বারবার পুনরুৎপাদিত হয়ে নতুন রঞ্জক কোষ তৈরি করে। এর ফলে চুলে দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক রং বজায় থাকে। কিন্তু শরীরের কোষগুলো প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হয়। অতিবেগুনি রশ্মি, কিছু রাসায়নিক পদার্থ এবং কোষের স্বাভাবিক বিপাকীয় প্রক্রিয়াও ডিএনএর ক্ষতি করতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মেলানোসাইট স্টেম সেলের ডিএনএতে বিশেষ ধরনের গুরুতর ক্ষতি হলে কোষগুলো একটি প্রতিরক্ষামূলক পথে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় স্টেম সেলগুলো দ্রুত পরিণত রঞ্জক কোষে রূপান্তরিত হয় এবং পরে স্টেম সেলের ভাণ্ডার থেকে হারিয়ে যায়। ফলে নতুন রঞ্জক কোষ তৈরির ক্ষমতা কমে যায় এবং ধীরে ধীরে চুলে পাকা রং দেখা দিতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রক্রিয়ার একটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো—ডিএনএতে ক্ষতি হওয়া কোষগুলোকে স্টেম সেল হিসেবে টিকে থেকে বারবার বিভাজিত হওয়ার সুযোগ না দেওয়া। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত কোষ দীর্ঘদিন বেঁচে থেকে বিভাজিত হতে থাকলে সেখানে জিনগত পরিবর্তন জমা হতে পারে, যা ভবিষ্যতে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

অর্থাৎ, চুলের রং হারানোর এই প্রক্রিয়াকে শরীরের এক ধরনের ‘ত্যাগ’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। একটি ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে স্টেম সেলের ভাণ্ডার থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে শরীর সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ কোষের বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করে।

তবে গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। সব ধরনের ডিএনএ ক্ষতির ক্ষেত্রে মেলানোসাইট স্টেম সেল একইভাবে আচরণ করে না।

গবেষকরা ইঁদুরের কোষকে ক্যানসার সৃষ্টিকারী কিছু রাসায়নিক এবং অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে আনেন। তখন দেখা যায়, কিছু পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত স্টেম সেল স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক প্রক্রিয়ায় না গিয়ে নিজেদের পুনরুৎপাদন করতে থাকে। অর্থাৎ, ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত থাকা সত্ত্বেও তারা টিকে থাকে এবং বিভাজিত হতে থাকে।

এ ধরনের পরিস্থিতি মেলানোমা বা ত্বকের এক ধরনের ক্যানসার তৈরির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আশপাশের কোষ ও টিস্যু থেকে পাওয়া রাসায়নিক সংকেতও এই আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।

গবেষকদের ভাষায়, একই স্টেম সেল পরিস্থিতি অনুযায়ী দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে যেতে পারে। একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কোষ দ্রুত পরিণত হয়ে স্টেম সেলের ভাণ্ডার থেকে সরে গেলে চুল পেকে যেতে পারে। অন্যদিকে, কিছু পরিবেশে সেই ক্ষতিগ্রস্ত কোষ টিকে গিয়ে বিভাজিত হতে থাকলে ক্যানসার তৈরির সম্ভাব্য পথ তৈরি হতে পারে।

এখানেই পাকা চুল ও ক্যানসারের মধ্যে গবেষণায় পাওয়া অপ্রত্যাশিত সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পাকা চুল নিজেই ক্যানসার প্রতিরোধ করে। বরং একই কোষীয় প্রতিক্রিয়ার দুটি ভিন্ন ফলাফল হিসেবে চুল পাকা এবং ক্যানসারের ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক থাকতে পারে বলে গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গবেষণাটি বয়স বাড়ার সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকি কেন বাড়ে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের কোষে ডিএনএ ক্ষতি ও অন্যান্য পরিবর্তন জমতে থাকে। একই সময়ে কোষের পুনর্গঠন ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষ নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক ব্যবস্থাও বদলে যেতে পারে।

তবে এই গবেষণার ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না। গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো ইঁদুরের ওপর পরিচালিত হয়েছে। মানুষের শরীর, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং জীবনযাপনের সঙ্গে ইঁদুরের পার্থক্য রয়েছে। তাই মানুষের চুল পাকা এবং ক্যানসারের ঝুঁকির মধ্যে একই ধরনের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, মেলানোসাইট স্টেম সেল কীভাবে ক্ষতির প্রতিক্রিয়া জানায় এবং কোন সংকেত তাদের নিরাপদ পথে বা ঝুঁকিপূর্ণ পথে পরিচালিত করে, তা আরও ভালোভাবে বোঝা গেলে ভবিষ্যতে ক্যানসার ও বয়সজনিত কোষীয় পরিবর্তন নিয়ে নতুন গবেষণার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ, মাথার পাকা চুলকে শুধু বয়সের দৃশ্যমান চিহ্ন হিসেবে দেখার বাইরে গিয়ে এখন বিজ্ঞানীরা এর পেছনে থাকা কোষীয় প্রক্রিয়াকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তবে এই গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে এবং মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও প্রমাণ প্রয়োজন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার