বিজ্ঞাপন
জনপ্রিয় ওজন কমানোর ওষুধে হঠাৎ দৃষ্টি হারানোর শঙ্কা, যা বলছে গবেষণা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম
বিজ্ঞাপন
ওজন কমানো ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত জনপ্রিয় জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ ওজেম্পিক, ওয়েগোভি ও মাউঞ্জারো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব ওষুধ ব্যবহারের সঙ্গে খুবই বিরল একটি চোখের রোগের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে গবেষণা চলছে। রোগটির নাম নন-আর্টেরিটিক অ্যান্টেরিয়র ইস্কেমিক অপটিক নিউরোপ্যাথি, সংক্ষেপে এনএআইওএন। এতে হঠাৎ করে, সাধারণত কোনো ব্যথা ছাড়াই, দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যে কয়েক ডজন ব্যক্তি এসব ওষুধের প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণের মামলা করেছেন। তাদের অভিযোগ, ওষুধ ব্যবহারের সম্ভাব্য এই ঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্ট সতর্ক করা হয়নি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণাই প্রমাণ করেনি যে জিএলপি-১ ওষুধ সরাসরি এনএআইওএনের কারণ। ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও এসব অভিযোগের বিরোধিতা করে জানিয়েছে, রোগীদের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে তারা সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে।
এনএআইওএন কী?
চোখের অপটিক নার্ভে পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহ না পৌঁছালে এনএআইওএন হতে পারে। মায়ো ক্লিনিকের চক্ষু ও নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ ড. জন চেনের মতে, ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এটি হঠাৎ অপটিক নার্ভের সমস্যার অন্যতম সাধারণ কারণ। সাধারণত কোনো ব্যথা ছাড়াই হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যায় এবং এই ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী হতে পারে। বর্তমানে এনএআইওএনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহার না করলেও ডায়াবেটিস থাকা ব্যক্তিদের এই রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ছাড়া রাতে রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে যাওয়া এবং অপটিক নার্ভের গঠনের কিছু বৈশিষ্ট্যও এই রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।
জিএলপি-১ ওষুধের সঙ্গে যোগসূত্রের প্রমাণ কতটা?
এই সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা শুরু হয় ২০২৪ সালে। বোস্টনের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের গবেষণায় দেখা যায়, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং সেমাগ্লুটাইড ব্যবহারকারী কিছু রোগীর মধ্যে এনএআইওএন হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। সেমাগ্লুটাইড হলো ওজেম্পিক ও ওয়েগোভির প্রধান সক্রিয় উপাদান।
এরপর আরও বড় পরিসরে বেশ কয়েকটি গবেষণা হয়েছে। তবে এসব গবেষণার ফল এক নয়। কোনো কোনো গবেষণায় সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও অন্য কিছু গবেষণায় তেমন সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। ফলে এখন পর্যন্ত জিএলপি-১ ওষুধের কারণে এনএআইওএন হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি বা ইএমএ পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে সেমাগ্লুটাইড-ভিত্তিক কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে এনএআইওএনকে খুব বিরল সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সতর্কতা যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত জিএলপি-১ ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই সমস্যা প্রতি ১০ হাজারে প্রায় একজনের হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।
তবে নর্থ আমেরিকান নিউরো-অপথালমোলজি সোসাইটি এবং আমেরিকান একাডেমি অব অপথালমোলজি জানিয়েছে, কিছু গবেষণায় সামান্য বাড়তি ঝুঁকির ইঙ্গিত থাকলেও অন্য গবেষণায় কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তাদের মতে, এনএআইওএনের সামগ্রিক ঝুঁকি কম।
যুক্তরাষ্ট্রে এখনো নির্দিষ্ট সতর্কতা নেই
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন বা এফডিএ বর্তমানে জিএলপি-১ ওষুধের লেবেলে এনএআইওএনকে নির্দিষ্ট ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা দেয়নি। তবে এফডিএর সেনটিনেল ইনিশিয়েটিভ এই সম্ভাব্য নিরাপত্তা সংকেত নিয়ে বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এফডিএ জানিয়েছে, বাজারে আসার পরও ওষুধগুলোর নিরাপত্তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া সম্ভাব্য ঝুঁকির তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ওজেম্পিক ও ওয়েগোভির প্রস্তুতকারক নোভো নরডিস্ক জানিয়েছে, তারা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সব রিপোর্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং রোগীদের নিরাপত্তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রে দায়ের হওয়া ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণের মামলাগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। মাউঞ্জারো ও জেপবাউন্ডের প্রস্তুতকারক এলি লিলিও জানিয়েছে, তারা ওষুধগুলোর নিরাপত্তা তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করছে।
ব্যবহারকারীদের কী করা উচিত?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এই সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া জিএলপি-১ ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। ডায়াবেটিস ও গুরুতর স্থূলতার চিকিৎসা না করলেও চোখসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের জন্য প্রমাণিত স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে।
যারা সেমাগ্লুটাইড বা অন্য কোনো জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহার করছেন এবং কোনো উপসর্গ নেই, তারা চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের উদ্বেগ চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। তবে কারও যদি হঠাৎ করে কোনো ব্যথা ছাড়াই দৃষ্টিশক্তি কমে যায়, তাহলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিএলপি-১ ওষুধের সঙ্গে এনএআইওএনের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিটি বিরল বলেই মনে হচ্ছে এবং এসব ওষুধ সরাসরি এই রোগ সৃষ্টি করে—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।