Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

লাইফস্টাইল

ক্যানসারে মৃত্যু ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

ক্যানসারে মৃত্যু ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের

বিজ্ঞাপন

প্রতিদিন হাজার হাজার ফুট ওপরে কাজ করা পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের জন্য সামনে এসেছে উদ্বেগজনক এক গবেষণা। যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ শতাধিক পেশার মানুষের মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, রেডিয়েশনের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে পরিচিত কয়েক ধরনের ক্যানসারে মৃত্যুর অনুপাত সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের মধ্যে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন পাইলটরা। এমনকি নিয়মিত তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করা কিছু পেশার কর্মীদের তুলনায়ও তাদের হার বেশি পাওয়া গেছে।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকদের নেতৃত্বে করা গবেষণাটি ১৭ আগস্ট জেএএমএ ইন্টারনাল মেডিসিনে প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস সিস্টেমের ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের এক কোটি ২০ লাখের বেশি ডেথ সার্টিফিকেট বিশ্লেষণ করা হয়েছে এতে।

গবেষণায় পাঁচ শতাধিক পেশার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে মৃত্যুর সম্পর্ক তুলনা করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার পাইলট এবং সাত হাজারের বেশি ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের মৃত্যুর তথ্য ছিল।

ফলাফলে দেখা যায়, ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের মোট মৃত্যুর প্রায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং পাইলটদের মৃত্যুর প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল এমন ক্যানসারে, যেগুলোকে গবেষণায় রেডিয়েশনের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্যানসারের শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। সাধারণ কর্মজীবী জনগোষ্ঠীতে এই হার ছিল প্রায় ৫ শতাংশ।

গবেষকেরা স্তন ক্যানসার, সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের ক্যানসার, মাল্টিপল মায়েলোমা, নির্দিষ্ট ধরনের লিউকেমিয়া ও লিম্ফোমা, থাইরয়েড ক্যানসার, প্রোস্টেট ক্যানসার, মেলানোমা এবং নন-মেলানোমা স্কিন ক্যানসারকে বিশ্লেষণের আওতায় রেখেছিলেন।

পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট উভয়ের মধ্যেই স্তন, সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম ও প্রোস্টেট ক্যানসার এবং মেলানোমায় মৃত্যুর হার পরিসংখ্যানগতভাবে বেশি পাওয়া গেছে। পাইলটদের ক্ষেত্রে লিউকেমিয়ায় মৃত্যুর হারও বেশি ছিল।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষণায় পারমাণবিক বা তেজস্ক্রিয় উপাদান নিয়ে কাজ করা পেশাজীবীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারপরও রেডিয়েশনের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্যানসারে মৃত্যুর অনুপাতে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ও পাইলটরা তাদের ওপরে অবস্থান করেছেন। নিউক্লিয়ার টেকনোলজিস্টরা এই তালিকায় ১২তম অবস্থানে ছিলেন বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।

কিন্তু বিমানকর্মীদের ক্ষেত্রে রেডিয়েশন আসে কোথা থেকে?

মূল কারণ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে কসমিক আয়োনাইজিং রেডিয়েশন। মহাকাশ ও সূর্য থেকে আসা উচ্চশক্তির কণা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। ভূপৃষ্ঠে বায়ুমণ্ডলের পুরু স্তর মানুষের জন্য অনেকটা প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বাণিজ্যিক বিমান যখন প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ে, তখন সেই সুরক্ষা অনেকটাই কমে যায়।

ফলে দীর্ঘ সময় আকাশে থাকা পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টরা ভূপৃষ্ঠে থাকা মানুষের তুলনায় বেশি কসমিক রেডিয়েশনের সংস্পর্শে আসেন। এটি একবারের কোনো বড় রেডিয়েশন ডোজ নয়। বরং বছরের পর বছর নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার কারণে অল্প অল্প করে জমতে থাকা এক্সপোজার নিয়েই গবেষকদের উদ্বেগ।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও দীর্ঘদিন ধরে স্বীকার করে আসছে যে ফ্লাইট ক্রুরা পেশাগতভাবে আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের সংস্পর্শে আসেন। আগের গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লাইট ক্রুদের বছরে গড়ে প্রায় ৩ মিলিসিভার্ট কার্যকর রেডিয়েশন ডোজ পাওয়ার হিসাবও উঠে এসেছে।

তবে নতুন গবেষণার ফলাফলকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না যে রেডিয়েশনই প্রত্যেক পাইলট বা ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের ক্যানসারের সরাসরি কারণ। গবেষকেরা ব্যক্তিভিত্তিক রেডিয়েশন এক্সপোজারের মাত্রা পরিমাপ করেননি। ডেথ সার্টিফিকেটের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন পেশার মধ্যে মৃত্যুর ধরন তুলনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া ফ্লাইট ক্রুদের কর্মজীবনে আরও কিছু বিষয় রয়েছে, যা ক্যানসারের ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে। রাতের শিফট, বারবার টাইম জোন পরিবর্তন, শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের চক্র বা সার্কাডিয়ান রিদমে ব্যাঘাত এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত চাপও সম্ভাব্য কারণ হিসেবে গবেষণায় আলোচিত হয়েছে।

আগের গবেষণাগুলোতেও পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের হার বেশি পাওয়া গেছে। তবে কসমিক রেডিয়েশন এবং ক্যানসারের মধ্যে সরাসরি কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক এখনো নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নতুন গবেষণাটি মূলত ক্যানসারে মৃত্যুর ক্ষেত্রে পেশাভিত্তিক পার্থক্যকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লাইট ক্রুদের কসমিক রেডিয়েশন এক্সপোজারের জন্য বর্তমানে অন্যান্য কিছু রেডিয়েশন কর্মীর মতো বাধ্যতামূলক ফেডারেল ডোজ সীমা বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়মিত রেডিয়েশন মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই।

গবেষকেরা মনে করছেন, নতুন ফলাফল বিমানকর্মীদের পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি রেডিয়েশন এক্সপোজার পর্যবেক্ষণ, কর্মীদের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

একই সঙ্গে সাধারণ বিমানযাত্রীদের জন্য গবেষণাটিকে আতঙ্কের কারণ হিসেবে দেখছেন না গবেষকেরা। পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টরা বছরের পর বছর কর্মজীবনের বড় একটি অংশ আকাশে কাটান। সাধারণ যাত্রীর কয়েক ঘণ্টার বিমান ভ্রমণের সঙ্গে সেই দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত এক্সপোজার সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়।

নতুন গবেষণাটি তাই বিমান ভ্রমণের নিরাপত্তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেছে তাদের নিয়ে, যাদের কর্মক্ষেত্রই আকাশ। প্রতিদিন যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি কীভাবে পর্যবেক্ষণ ও কমানো যায়, এখন সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার