বিজ্ঞাপন
মৃত চাচার সম্পত্তিতে কে হকদার—ভাতিজা নাকি সৎ ভাই-বোন?
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম
বিজ্ঞাপন
একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া সহায়-সম্পত্তি নিয়ে পরিবারে যে জটিলতা তৈরি হয়, তার একটি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তার ভাইয়ের ছেলে অর্থাৎ ভাতিজা হকদার হবেন, নাকি তার সৎ ভাই-বোন?
বাস্তবে দেখা যায়, প্রশ্নটির উত্তর অনেকাংশে নির্ভর করে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু জরুরি বিষয়ের ওপর—‘সৎ ভাই-বোন’ বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হচ্ছে।
ইসলামী উত্তরাধিকার আইন বা ফারায়েজ শাস্ত্রে এই দুই ধরনের আত্মীয়ের মর্যাদা একেবারেই ভিন্ন। এই পার্থক্য না বোঝার কারণেই বাংলাদেশে অসংখ্য পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধের সূত্রপাত হয়।
ইসলামী স্কলারদের মতে, কোরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ফারায়েজ শাস্ত্রে উত্তরাধিকারীদের মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম ভাগে আছেন তারা, যাঁদের অংশ কোরআনে সরাসরি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। যেমন—স্ত্রী, স্বামী, মা-বাবা কিংবা কন্যা।
দ্বিতীয় ভাগে আছেন ‘আসাবা’ শ্রেণির আত্মীয়রা, যাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অংশ বেঁধে দেওয়া নেই; বরং নির্দিষ্ট অংশ বণ্টনের পর অবশিষ্ট সম্পত্তি তারাই পান। মূলত পুরুষ রক্তীয় আত্মীয়রাই এই শ্রেণিতে পড়েন। যেমন—পুত্র, ভাই, ভাইয়ের ছেলে বা চাচা।
তৃতীয় ভাগে থাকেন দূরবর্তী আত্মীয়রা, যারা কেবল ওপরের দুই শ্রেণির কেউ জীবিত না থাকলে সম্পত্তির ভাগ পান।
ভাতিজা এই কাঠামোয় ‘আসাবা’ শ্রেণির একজন স্বীকৃত হকদার। তবে তার অধিকার কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করে তার চেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কোনো আত্মীয় জীবিত আছেন কি না, তার ওপর।
এখানেই আসল প্রশ্নটি দাঁড়ায়—‘সৎ ভাই-বোন’ বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে? বাংলা ভাষায় শব্দটি দুই ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর এখানেই বিভ্রান্তির মূল জায়গা তৈরি হয়।
যদি সৎ ভাই-বোন বলতে বোঝানো হয় বৈমাত্রেয় ভাই-বোন—অর্থাৎ একই বাবার কিন্তু ভিন্ন মায়ের সন্তান—তাহলে তারা মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি রক্তসম্পর্কযুক্ত এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রকৃত ওয়ারিশ হিসেবে গণ্য হবেন।
ফিকহবিদদের ঐকমত্য অনুযায়ী, বৈমাত্রেয় ভাই ‘আসাবা’ শ্রেণিতে সহোদর বা আপন ভাইয়ের ঠিক পরেই স্থান পান। অর্থাৎ আপন ভাই না থাকলে সম্পত্তির অধিকারে তিনিই অগ্রাধিকার পাবেন।
কিন্তু যদি সৎ ভাই-বোন বলতে বোঝানো হয় রক্তসম্পর্কহীন সৎ সন্তান—অর্থাৎ বাবা বা মায়ের অন্য কোনো বিবাহের সন্তান, যার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির কোনো রক্তসম্পর্ক নেই—তাহলে ইসলামী আইনে তারা মোটেও ওয়ারিশ নন।
আলেমরা এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেন, উত্তরাধিকার কেবল রক্তসম্পর্ক, বৈধ বিবাহসূত্র বা প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। নিছক একই ছাদের নিচে বেড়ে ওঠার কারণে কেউ শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়ারিশ বলে গণ্য হন না।
চার মাযহাব—হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি ফিকহের আলেমদের মধ্যে ‘আসাবা’ শ্রেণির অগ্রাধিকার নির্ধারণে মূলনীতিগত ঐকমত্য লক্ষ্য করা যায়।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অনুসৃত হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, প্রথমে অগ্রাধিকার পান পুত্র ও পৌত্রের মতো নিম্নগামী বংশধররা। এরপর পিতা ও দাদার মতো ঊর্ধ্বগামী আত্মীয়রা। তারপর সহোদর ভাই, এরপর বৈমাত্রেয় ভাই এবং তারপরই আসেন ভাইয়ের ছেলে অর্থাৎ ভাতিজা। সবশেষে চাচা ও তার বংশধরদের অবস্থান।
আলেমরা ব্যাখ্যা করেন, এই ক্রম অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির যদি জীবিত সহোদর ভাই বা রক্তসম্পর্কযুক্ত বৈমাত্রেয় ভাই থেকে থাকেন, তাহলে অবশিষ্ট সম্পত্তিতে তিনিই ভাতিজার আগে অধিকার পাবেন। সে ক্ষেত্রে ভাতিজা বঞ্চিত থাকবেন। কিন্তু যদি এমন কোনো ভাই জীবিত না থাকেন, তাহলে ভাতিজাই ‘আসাবা’ হিসেবে অবশিষ্ট সম্পত্তির প্রকৃত হকদার হয়ে উঠবেন।
আলেমরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্মরণ করিয়ে দেন, তা হলো বৈপিত্রেয় ভাই-বোনের অবস্থান। অর্থাৎ যাদের মা এক কিন্তু বাবা ভিন্ন। তারা ‘আসাবা’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নন; বরং কোরআনে নির্দিষ্ট অংশপ্রাপ্ত ওয়ারিশদের তালিকায় পড়েন।
নির্দিষ্ট শর্তে, অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির পিতা, দাদা বা সন্তান জীবিত না থাকলে, তারা ছয় ভাগের এক ভাগ কিংবা যৌথভাবে তিন ভাগের এক ভাগ অংশ পান। তবে অবশিষ্ট সম্পত্তিতে তাদের কোনো দাবি থাকে না। ফলে সৎ ভাই-বোন প্রশ্নে আলোচনা করার সময় তারা মায়ের দিক থেকে সম্পর্কিত নাকি বাবার দিক থেকে—তা স্পষ্ট করে নেওয়া অত্যাবশ্যক। কারণ দুই ক্ষেত্রে বিধান সম্পূর্ণ আলাদা।
ইসলামী স্কলাররা বারবার সতর্ক করে বলেন, ফারায়েজের প্রকৃত হিসাব কখনোই বিচ্ছিন্নভাবে কেবল দুই ব্যক্তির সম্পর্ক দেখে করা যায় না।
মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী, পিতা-মাতা, সন্তান কিংবা নাতি-নাতনি জীবিত আছেন কি না, তার ওপর নির্ভর করে পুরো হিসাব বদলে যেতে পারে।
এ কারণে আলেমরা পরামর্শ দেন, পরিবারের প্রকৃত ও সম্পূর্ণ ওয়ারিশের তালিকা তৈরি করে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফতোয়া বিভাগ কিংবা স্বীকৃত ফারায়েজ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সঠিক অংশ নির্ধারণ করিয়ে নেওয়া উচিত।
এতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা কমে এবং সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধও এড়ানো সম্ভব হয়।
বাংলাদেশে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে যে অসংখ্য মামলা-মোকদ্দমা ও দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক বিরোধ দেখা যায়, তার একটি বড় কারণ শরিয়তের এই সূক্ষ্ম বিধিবিধান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অস্পষ্ট ধারণা।
আলেম ও আইনজ্ঞদের অভিমত, রক্তসম্পর্ক এবং নিছক পারিবারিক সাহচর্যের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে বুঝে, প্রয়োজনে যথাযথ ধর্মীয় ও আইনি পরামর্শ নিয়ে সম্পত্তি বণ্টন করা হলে অনেক অপ্রয়োজনীয় পারিবারিক বিরোধ এড়ানো সম্ভব।
লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।