বিজ্ঞাপন
পানির অপচয় ঠেকাতে ১৩ বছর বয়সেই অ্যাপ তৈরি, নেহার উদ্যোগে সাশ্রয় ২ কোটি গ্যালন পানি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৭ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ১৩ বছর বয়সী নেহা ব্লান্ট প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পানি অপচয় কমানোর উদ্যোগ নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তার তৈরি ‘ওয়াটার সেভার’ নামের ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনটি পরিবারগুলোকে নিজেদের পানি ব্যবহারের হিসাব রাখতে এবং দৈনন্দিন জীবনে পানি সাশ্রয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।
নেহার নেতৃত্বে পরিচালিত ‘ওয়াটার সেভার্স’ প্রচারণা এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ১০ লাখের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। পাশাপাশি ১ লাখের বেশি মানুষকে দৈনন্দিন ব্যবহারে পরিবর্তন আনতে উৎসাহিত করেছে এই উদ্যোগ। এর মাধ্যমে আনুমানিক ২ কোটি গ্যালন পানি সাশ্রয় হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবেশবিষয়ক সংগঠন অ্যাকশন ফর নেচার।
এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ইয়াং ইকো-হিরো অ্যাওয়ার্ডে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এবং কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বিভাগে তৃতীয় স্থান পেয়েছে নেহা। ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতিযোগীদের বিভাগে তাকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
নেহার এই উদ্যোগের শুরু একটি সাধারণ তথ্য থেকে। ইভেশাম টাউনশিপ মিউনিসিপ্যাল ইউটিলিটিজ অথরিটির একটি ক্যালেন্ডারে তিনি দেখেন, একটি মাত্র পানির কল থেকে লিকেজের কারণে প্রতি মাসে ২ হাজার গ্যালনের বেশি বিশুদ্ধ পানি নষ্ট হতে পারে। বিষয়টি তাকে দৈনন্দিন জীবনে পানির অপচয় নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
নিউ জার্সি তুলনামূলকভাবে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা হলেও জনসংখ্যা ও পানির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর জলসম্পদের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। ২০২৩ সালের বসন্তে নেহা পানি সংরক্ষণে ‘ওয়াটার সেভার্স’ প্রচারণা শুরু করেন। নিজের শেখা প্রোগ্রামিং দক্ষতার সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম যুক্ত করেন তিনি।
এরপর প্রায় সাত মাস সময় নিয়ে তৈরি করেন ‘ওয়াটার সেভার’ ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন। এর উদ্দেশ্য ছিল শুধু মানুষকে পানি কম ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া নয়, বরং পানি ব্যবহারের পরিমাণ সম্পর্কে তাদের সচেতন করা এবং ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করা।
অ্যাপটি তৈরির সময় নেহাকে বেশ কিছু নতুন প্রযুক্তিগত বিষয়ও শিখতে হয়েছে। ব্যবহারকারীর তথ্য ও লগইন ব্যবস্থাপনার জন্য তিনি নিজে মাইএসকিউএল শিখেছেন এবং অ্যাপটির পেছনের কাঠামোও তৈরি করেছেন। সফটওয়্যার ডাউনলোডের প্রয়োজন না রেখে ওয়েবভিত্তিক ব্যবস্থা বেছে নেওয়ার ফলে বিভিন্ন যন্ত্র থেকে এটি ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।
‘ওয়াটার সেভার’-এ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পাত্র ও বৃষ্টির বাগান তৈরির মতো বিষয়ে ব্যবহারিক নির্দেশনাও রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পানির সংকট নিয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পানি সংরক্ষণকে শুধু স্থানীয় সমস্যা হিসেবে নয়, বৈশ্বিক বিষয় হিসেবেও তুলে ধরেছে উদ্যোগটি।
নেহার কাজ দ্রুত স্থানীয় পর্যায়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। ২০২৩ সালের কংগ্রেশনাল অ্যাপ চ্যালেঞ্জে ‘ওয়াটার সেভার’ তৃতীয় স্থান অর্জন করে। অ্যাকশন ফর নেচারের তথ্য অনুযায়ী, ওই প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়া সবচেয়ে কম বয়সী প্রতিযোগী ছিলেন নেহা। পরে তাকে ইভেশাম এনভায়রনমেন্টাল কমিশনের পানি সংরক্ষণবিষয়ক দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। স্থানীয় অর্থনৈতিক পরামর্শক পরিষদেও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। নিউ জার্সি জেনারেল অ্যাসেম্বলিও তার উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তবে পানি সংরক্ষণই নেহার একমাত্র উদ্যোগ নয়। মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই তিনি প্রোগ্রামিং করছেন। ১৩ বছর বয়সেই ২২টি কলেজ ক্রেডিট অর্জন করেছেন বলে অ্যাকশন ফর নেচারের তথ্য থেকে জানা যায়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকাকালে নিজের কাউন্টির সবচেয়ে কম বয়সী শিক্ষার্থী হিসেবে এপি ক্যালকুলাস বিসি কোর্সেও অংশ নেন তিনি।
বোনের সঙ্গে মিলে নেহা ঘরের ভেতরের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণের একটি ব্যবস্থাও তৈরি করেছেন। পাশাপাশি ‘প্রজেক্ট রিফিট’-এ শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করে সাবেক সেনাসদস্যদের পারস্পরিক সহায়তার জন্য একটি অ্যাপ তৈরিতে যুক্ত আছেন। পরিবারের এক সদস্য প্রতারণার শিকার হওয়ার পর স্টকটন ইউনিভার্সিটির সঙ্গে মিলে বয়স্কদের প্রতারণা সম্পর্কে সচেতন করার একটি কর্মসূচিতেও কাজ করেছেন।
প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে স্থানীয় গ্রন্থাগারে সুবিধাবঞ্চিত কিশোরীদের বিনামূল্যে কোডিং শেখাতেও ২০০ ঘণ্টার বেশি সময় দিয়েছেন নেহা। যুব পরামর্শক কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। সেখানে ‘পাই ডে’ উপলক্ষে একটি তহবিল সংগ্রহ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিয়ে তিনজন স্নাতক শিক্ষার্থীর জন্য ৫০০ ডলার করে তিনটি বৃত্তির অর্থ সংগ্রহ করেন।
এখন নেহা ইভেশাম মিউনিসিপ্যাল ইউটিলিটিজ অথরিটির সঙ্গে ‘ওয়াটার সেভার ২.০’ নিয়ে কাজ করছেন। নতুন সংস্করণে নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা তৈরি করে পরিবারের পানি ব্যবহারের তাৎক্ষণিক তথ্যকে ইন্টার্যাকটিভ চার্টে দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ব্যবহারকারীরা কোন সময়ে কত পানি ব্যবহার করছেন, তা আরও সহজে বুঝতে পারবেন।
পাশাপাশি নেহা একটি ‘চ্যারিটি: ওয়াটার’ কূপ প্রকল্পের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে চান, যার লক্ষ্য একটি পুরো শহরের মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা।
ভবিষ্যতে কম্পিউটার বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে সাইবার নিরাপত্তায় বিশেষায়িত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে নেহার। দীর্ঘমেয়াদে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থায় কাজ করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান।
নেহার কাজের মূল বার্তা শুধু পানি বাঁচানো নয়। তার মতে, কোনো সম্পদ সহজলভ্য মনে হলে মানুষ অনেক সময় অজান্তেই অপচয়ের অভ্যাসে চলে যায়। তাই পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি সবার জন্য নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
মাত্র একটি পানির কল থেকে পানি অপচয়ের তথ্য দেখে শুরু করা নেহার উদ্যোগ এখন লাখো মানুষের কাছে পৌঁছেছে। প্রযুক্তি, পরিবেশ সচেতনতা ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে ১৩ বছর বয়সেই তিনি দেখিয়েছেন, বড় কোনো পরিবর্তনের সূচনা কখনও কখনও খুব ছোট একটি সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য থেকেই হতে পারে।
সূত্র: অ্যাকশন ফর নেচার ও সাউথ জার্সি মিডিয়া