বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশি কলেজ শিক্ষার্থী দুই ভাইয়ের এআই স্টার্টআপ পেল ৩০ হাজার ডলারের বেশি ফান্ডিং
আইটি ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম
বিজ্ঞাপন
স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্টার্টআপ গড়ে সাফল্যের নজির তৈরি করেছেন বাংলাদেশের দুই ভাই। সাবিক বিন সুলতান ও শাফি বিন সুলতানের সহপ্রতিষ্ঠিত এআইভিত্তিক নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম AgenticHire বিভিন্ন অ্যাক্সিলারেটর কর্মসূচি, প্রতিযোগিতা, অনুদান ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার মাধ্যমে ৩০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ পেয়েছে।
ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলার একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবিক বিন সুলতান প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তাঁর বড় ভাই শাফি বিন সুলতান ঢাকার সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং AgenticHire-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা।
স্টার্টআপটির কার্যক্রম অনলাইনভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক বাজারকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশি দুই ভাইয়ের সঙ্গে এর আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা হলেন সিঙ্গাপুরের রিভার ভ্যালি হাই স্কুলের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হাওইয়াং উ। তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কোম্পানিটির বৃহত্তর প্রতিষ্ঠাতা দলে কাজাখস্তান, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও মালয়েশিয়ার সদস্যও রয়েছেন।
AgenticHire-এর যাত্রা শুরু হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। সিঙ্গাপুরে একটি তরুণ উদ্যোক্তাকেন্দ্রিক অ্যাক্সিলারেটর কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় সাবিক ও হাওইয়াংয়ের মধ্যে পরিচয় হয়। সেখান থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ শুরু করেন তাঁরা। সাবিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ছয় দিনের ওই কর্মসূচির মধ্যেই ধারণা, দল ও ব্যবসার দিকনির্দেশনা তৈরি হতে শুরু করে।
তাদের নজরে আসে, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেরই আলাদা মানবসম্পদ বা নিয়োগ দল থাকে না। ফলে প্রতিষ্ঠাতা কিংবা জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদেরই চাকরিপ্রার্থীদের প্রাথমিক বাছাইয়ের সাক্ষাৎকার নিতে হয়। যোগ্য প্রার্থী একজনকে কারিগরি সাক্ষাৎকারে নেওয়ার আগেই ২০ থেকে ৩০টি পর্যন্ত প্রাথমিক সাক্ষাৎকার নিতে হতে পারে বলে সাবিক জানিয়েছেন। এই সময় ও শ্রমের চাপ কমানোর লক্ষ্যেই AgenticHire তৈরি করা হয়।
প্ল্যাটফর্মটির মূল কাজ হলো নিয়োগের প্রাথমিক ধাপটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পরিচালনা করা। কোনো প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট পদের জন্য মূল্যায়নের কাঠামো তৈরি করে চাকরিপ্রার্থীদের কাছে সাক্ষাৎকারের সংযোগ পাঠাতে পারে। প্রার্থী নিজের সুবিধামতো সময়ে প্রাথমিক সাক্ষাৎকার সম্পন্ন করেন। এরপর AgenticHire প্রার্থীর দক্ষতা, দুর্বলতা ও কাজের উপযোগিতা নিয়ে একটি কাঠামোবদ্ধ প্রতিবেদন তৈরি করে। চূড়ান্তভাবে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত অবশ্য নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানই নেয়।
স্টার্টআপটি গড়ে তোলার আগে প্রতিষ্ঠাতারা বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে সমস্যাটি যাচাই করেন। অ্যাক্সিলারেটর কর্মসূচি ও উদ্যোক্তা সম্মেলনের মাধ্যমে পাওয়া অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নিজেদের পরিচিত নেটওয়ার্কের প্রাথমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠাতাদের কাছ থেকেও নিয়োগ প্রক্রিয়ার সমস্যাগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর একটি প্রাথমিক সংস্করণ তৈরি করে পরামর্শদাতাদের সহায়তায় সেটি উন্নত করা হয়।
AgenticHire যে ৩০ হাজার ডলারের বেশি সহায়তা পেয়েছে, তার পুরোটা প্রচলিত বিনিয়োগ হিসেবে পাওয়া অর্থ নয়। প্রতিষ্ঠাতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থ এসেছে অ্যাক্সিলারেটর কর্মসূচির সহায়তা, প্রতিযোগিতার পুরস্কার, অনুদান এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা থেকে। এর মধ্যে ইস্ট ভেঞ্চার্সের ‘মাই ফার্স্ট ১০০০’সহ বিভিন্ন কর্মসূচি এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সহায়তার বিনিময়ে এখন পর্যন্ত কোম্পানির কোনো মালিকানা বা শেয়ার ছাড়তে হয়নি বলে সাবিক জানিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠাতারা জানিয়েছেন, পাওয়া অর্থ মূলত পণ্য উন্নয়ন, দলের কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক অ্যাক্সিলারেটর কর্মসূচি ও প্রযুক্তি সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে পণ্য চালুর প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য প্রাথমিক পর্যায়ের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গ্রাহক বাড়ানো এবং ব্যবহারকারীদের মতামতের ভিত্তিতে প্ল্যাটফর্মটি আরও উন্নত করা। ভবিষ্যতে নতুন বাজারে প্রবেশ ও দল সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের দুই দেশের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগটি শুরু হলেও এর পরিধি শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক। দলটির সদস্যদের মধ্যে কাজাখস্তানের দানিয়া টোকসানোভা বিপণন বিভাগের দায়িত্বে, থাইল্যান্ডের আপিউইট পাসুওয়াত যোগাযোগ কার্যক্রমে, কম্বোডিয়ার মোখা সোখা পরিচালন সহযোগী হিসেবে এবং মালয়েশিয়ার জেসি চু পণ্য বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে স্কুলপড়ুয়া কয়েকজন তরুণের উদ্যোগটি ধীরে ধীরে একটি বহুজাতিক তরুণ উদ্যোক্তা দলের রূপ নিয়েছে।
AgenticHire-এর প্রতিষ্ঠাতাদের গল্পের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাদের বয়স। প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা সাবিক ও শাফি এখনো উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। একইভাবে প্রযুক্তি বিভাগের নেতৃত্বে থাকা হাওইয়াং উও স্কুলের শিক্ষার্থী। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার আগেই তাঁরা প্রযুক্তি ব্যবসার একটি বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে পণ্য তৈরি, গ্রাহক যাচাই এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন।
সাবিকের সাম্প্রতিক এক পেশাগত পোস্টে তিনি জানান, গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুতে তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা এমনকি পূর্ণাঙ্গ দলও ছিল না। কয়েক মাসের মধ্যে বিভিন্ন দেশ ও সময় অঞ্চলে কাজ করে তাঁরা একটি পণ্য তৈরি করেন এবং জুনের শেষ দিকে সিঙ্গাপুরে আয়োজিত প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে সেটি উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, ওই অভিজ্ঞতা শুধু অর্থ সংগ্রহের সুযোগই নয়, বরং বিনিয়োগকারীরা কীভাবে একটি স্টার্টআপকে মূল্যায়ন করেন, সেটি বোঝারও সুযোগ তৈরি করেছে।
বর্তমানে AgenticHire নিজেদের একটি এআই-চালিত নিয়োগ বাছাই প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের লক্ষ্য হলো নিয়োগের প্রাথমিক ধাপে প্রতিষ্ঠানগুলোর সময় ও কাজের চাপ কমানো, যাতে প্রতিষ্ঠাতা বা নিয়োগদাতারা বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর প্রাথমিক সাক্ষাৎকারে সময় না দিয়ে তুলনামূলকভাবে উপযুক্ত প্রার্থীদের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। প্ল্যাটফর্মটি এখন প্রাথমিক পর্যায়ের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে গ্রাহক বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে।
বাংলাদেশি দুই ভাইয়ের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে দেশের বাইরে থেকে অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাওয়ার পাশাপাশি একটি আন্তর্জাতিক দল গড়ে তুলেছে। এখন তাদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রাথমিক পর্যায়ের সাফল্যকে টেকসই ব্যবসায় রূপ দেওয়া এবং বিভিন্ন দেশের নিয়োগ বাজারে এআইভিত্তিক এই সেবা কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, তা প্রমাণ করা।