Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

খেলাধুলা

ম্যারাডোনাসহ আর্জেন্টিনা তারকাদের বিদায়ের গল্প

Icon

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৮ পিএম

ম্যারাডোনাসহ আর্জেন্টিনা তারকাদের বিদায়ের গল্প

বিজ্ঞাপন

আগামীকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আইরেসে জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ারে শেষবারের মতো খেলবেন লিওনেল মেসি।

প্রায় ২০ বছর ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন আর্জেন্টাইন তারকা। একটি প্রজন্ম বড় হয়েছে মেসিকে দেখে। তাদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে মেসির খেলা দেখে।

২৫ বছর আগে এমনই এক বিদায়ের সাক্ষী হয়েছিল আর্জেন্টিনা। বিদায় নিয়েছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। ম্যারাডোনার বিদায় অবশ্য শুধু আর্জেন্টিনা দলের বিদায় ছিল না। সেটি ছিল ফুটবলেরই এক মহাকাব্যিক চরিত্রকে বিদায় জানানোর মুহূর্ত। ২০০১ সালের সেই রাত আজও আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে। মেসির বিদায়ও হতে যাচ্ছে তেমনই এক রাত। 

আর্জেন্টিনার কিংবদন্তিদের কয়েকটি ঐতিহাসিক বিদায়

মেসির বিদায়টা হবে গোছানো। তাঁর ক্যারিয়ারের মতোই। তারিখ ঠিক। প্রতিপক্ষ ঠিক। ভেন্যু ঠিক। সবকিছু যেন আগে থেকেই সাজানো। ম্যারাডোনার গল্পটা ছিল একেবারেই আলাদা। ৪১ বছর বয়সে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি। মঙ্গলবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামার সময় মেসির বয়সও থাকবে কাছাকাছি।

ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টা ছিল বেশ অগোছালো। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপিংয়ের ঘটনায় নিষেধাজ্ঞার পর ১৯৯৫ সালে বোকা জুনিয়র্সে ফেরেন তিনি। কিন্তু আগের সেই ম্যারাডোনাকে আর দেখা যায়নি। পারফরম্যান্স ছিল মাঝারি। তার ওপর ক্লাব সভাপতি মাউরিসিও মাকরির সঙ্গে চলছিল টানাপোড়েন।

রপর এল সেই সুপারক্লাসিকো। রিভার প্লেটের বিপক্ষে ম্যাচ। ম্যারাডোনার বয়স তখন ৩৭-এর কাছাকাছি। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই মাঠ ছাড়লেন তিনি। এরপর আর ফেরেননি। বুটজোড়া তুলে রাখলেন।

এরও আগে জীবন তাকে প্রায় কেড়ে নিয়েছিল। ২০০০ সালে অতিরিক্ত মাদক গ্রহণের কারণে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার। মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে কিউবায় যান পুনর্বাসনের জন্য।

দুই বছর পর, ২০০১ সালের ২০ নভেম্বর ঘোষণা করা হলো তার বিদায়ী ম্যাচের আয়োজন। কিন্তু ম্যারাডোনার দল সেটিকে ‘বিদায়ী ম্যাচ’ বলতে রাজি ছিল না।নাম দেওয়া হলো—‘শ্রদ্ধাঞ্জলি ম্যাচ’।

বোকা জুনিয়র্সের লা বোম্বোনেরা সেদিন যেন আরেক পৃথিবী। গ্যালারি ভরা। চারপাশে নীল-হলুদ রং। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সেই মানুষ, যার পায়ে একসময় পুরো ফুটবল বিশ্ব থমকে যেত।

আলোনসোর বিদায়, ৮০ হাজার দর্শক

আর্জেন্টিনার ফুটবলে বিদায়ের গল্প শুধু ম্যারাডোনাকে ঘিরে নয়। এরও আগে রিভার প্লেটের কিংবদন্তি নরবের্তো আলোনসোর বিদায় দেখেছিল মনুমেন্তালে। ১৯৮৭ সালের ১৩ জুন। সেদিন শেষবারের মতো রিভার প্লেটের মাঠে নামলেন আলোনসো। এক বছর আগেই তাঁর পায়ে রিভার জিতেছিল কোপা লিবার্তাদোরেস ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ।

কিংবদন্তিকে বিদায় জানাতে সেদিন মনুমেন্তালে হাজির হয়েছিলেন প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। আলোনসো পরে বলেছিলেন, ‘এটাই ছিল প্রথম ও একমাত্র ম্যাচ, যেখানে আমার পা কাঁপছিল।’ টানেল থেকে বেরিয়ে সামনে তাকিয়েছিলেন তিনি। পুরো স্টেডিয়াম মানুষে ভরা। সেই দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন আলোনসো।

পালর্মোর জন্য উপহার গোলপোস্ট

বোকা জুনিয়র্সের লা বোম্বোনেরায় এমন আরেকটি রাত এসেছিল ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। সেদিন বিদায় জানানো হয়েছিল মার্তিন পালর্মোকে। বোকা জুনিয়র্সের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। ৪০৪ ম্যাচে করেছিলেন ২৩৬ গোল। জিতেছিলেন ১৩টি শিরোপা। এর মধ্যে ছিল দুটি কোপা লিবার্তাদোরেস ও একটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ।

কিন্তু পালর্মোর সবচেয়ে আবেগঘন বিদায় এসেছিল তারও আট মাস আগে। ২০১১ সালের ১২ জুন বোকা জার্সিতে শেষ অফিসিয়াল ম্যাচ খেললেন তিনি। গ্যালারি থেকে তখন একটানা স্লোগান—‘ধন্যবাদ পালর্মো, ধন্যবাদ পালর্মো।’

পালর্মো আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। চোখের পানি গড়িয়ে পড়েছিল। সেদিন ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাঁকে এমন একটি উপহার দিয়েছিল, যার চেয়ে প্রতীকী উপহার হয়তো আর কিছু হতে পারে না।

স্টেডিয়ামের একটি গোলপোস্ট। সেই গোলপোস্ট এখনো পালর্মোর নিজের শহর লা প্লাতায় তাঁর মালিকানাধীন একটি ক্লাবে রাখা আছে। একজন স্ট্রাইকারের জন্য গোলপোস্টের চেয়ে স্মৃতিময় উপহার আর কী-ই বা হতে পারে!

রিকেলমের বিদায়েও ছিলেন মেসি

এরপর এল রিকেলমের পালা। আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তিদের সর্বশেষ বড় বিদায়গুলোর একটি। ২০২৩ সালের ২৫ জুন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর লা বোম্বোনেরায় আয়োজন করা হলো হুয়ান রোমান রিকেলমের বিদায়ী অনুষ্ঠান।

ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন প্রায় ১০ বছর আগে। তবু সেদিন তাকে বিদায় জানাতে স্টেডিয়ামের একটি আসনও যেন খালি ছিল না। মাঠে ছিলেন মেসি। ছিলেন বোকা জুনিয়র্সের আরও অনেক কিংবদন্তি।

তারপর ঘটল এমন একটি দৃশ্য, যা যেন আর্জেন্টিনার ফুটবলের পুরোনো গল্পকে আবার সামনে নিয়ে এল। ২০০১ সালে ম্যারাডোনা নিজের জার্সি খুলে রিকেলমের নাম লেখা ১০ নম্বর জার্সি দেখিয়েছিলেন।

২২ বছর পর রিকেলমে নিজেই খুললেন তাঁর জার্সি। তারপর গায়ে তুললেন ম্যারাডোনার নাম লেখা ১০ নম্বর জার্সি। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যেন হাতবদল হলো সেই ১০ নম্বর।

ম্যারাডোনা থেকে রিকেলমে। রিকেলমে থেকে মেসি। আর এখন সেই গল্পের পরের পাতায় লেখা হতে যাচ্ছে মেসির নাম। মেসির বিদায়টা তাই শুধু একজন ফুটবলারের শেষ ম্যাচ নয়। এটি যেন আর্জেন্টিনার ফুটবলের একটি দীর্ঘ গল্পের আরেকটি অধ্যায়।

যে গল্পে বিদায় মানেই শেষ নয়। একজন চলে যান। তাঁর জার্সি থেকে যায়। তাঁর গোল থেকে যায়। তাঁর স্মৃতি থেকে যায়। আর কোনো একদিন, অন্য কোনো কিংবদন্তি সেই গল্পের পরের লাইনটি লিখে দেন।

এবার সেই লাইনের অপেক্ষায় আর্জেন্টিনা। শেষবার আকাশি-সাদা জার্সিতে মেসি মাঠে নামবেন। গ্যালারি হয়তো তখন একসঙ্গে বলে উঠবে— ‘মেসি! মেসি! মেসি!’ আর একটি যুগ ধীরে ধীরে পরিণত হবে স্মৃতিতে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার