Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

খেলাধুলা

যে লিটনকে পেতে এত অপেক্ষা, অস্ট্রেলিয়ায় সেই লিটনেরই শূন্য সফর

Icon

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

যে লিটনকে পেতে এত অপেক্ষা, অস্ট্রেলিয়ায় সেই লিটনেরই শূন্য সফর

বিজ্ঞাপন

নাহিদ রানা নেই। লিটন কুমার দাসও নেই- অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত আশঙ্কাগুলোর একটি ছিল এটিই। নাহিদকে শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে লিটনকে ঘিরে অপেক্ষার শেষ হয়েছিল স্বস্তিতে। চোট কাটিয়ে শেষ মুহূর্তে ফিট হয়ে দলে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম সেরা এই ব্যাটার। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তার অভিজ্ঞতা দলের ব্যাটিংয়ে বাড়তি শক্তি দেবে- এমন প্রত্যাশাই ছিল।

তারপর ডারউইন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। ৯ উইকেটের সেই জয় যেন সফরের সব শঙ্কা এক মুহূর্তে দূরে সরিয়ে দিল। অথচ সেই ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচেও লিটনের ব্যাট হাসেনি। ১২ বল খেললেন, কিন্তু স্টার্কের বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন শূন্য রানে। বাংলাদেশ জিতল, তাই লিটনের ব্যর্থতা তখন খুব বেশি আলোচনার কেন্দ্রে এল না।

ম্যাকাইয়ে এসে সেই আড়ালটুকুও থাকল না। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে গেল বাংলাদেশ। দলের এমন বিপর্যয়ের সময় লিটনের কাছ থেকে চাওয়া ছিল প্রতিরোধ। যেটা তিনি আগেও করেছেন একাধিকবার; কিন্তু ৫ বলেই তার ইনিংস শেষ করে দেন মিচেল স্টার্ক। এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরলেন আবারও শূন্য হাতে।

এরপর দ্বিতীয় ইনিংস। বাংলাদেশের সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ সুযোগ। প্রথম ইনিংসে ১৪৬ রানে পিছিয়ে থাকা দলটির প্রয়োজন ছিল বড় জুটি, প্রয়োজন ছিল দায়িত্বশীল ব্যাটিং। লিটন এলেন, খেললেন ১০ বল। প্রথম ৯ বল কোনোভাবে সামলে রাখলেও দশম বলেই তৃতীয় স্লিপে বিউ ওয়েবস্টারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন। বোলার সেই স্টার্কই।

তিন ইনিংস। ২৭ বল। শূন্য রান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে লিটনের প্রথম দ্বিপাক্ষিক সিরিজের গল্পটা এর চেয়ে নির্মম আর কী হতে পারে? তিনবারই বোলার একই- মিচেল স্টার্ক। প্রথম ইনিংসে ক্যাচ, দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে এলবিডব্লিউ, আর শেষবার তৃতীয় স্লিপে ক্যাচ। অস্ট্রেলিয়ার আগুনে বাঁ-হাতি পেসারের সুইং, গতি আর অ্যাঙ্গেলের সামনে বারবার টানা ব্যর্থ হলেন লিটন।

অথচ এই সফরে লিটনকে পাওয়া বাংলাদেশের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। পায়ের চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘোষিত প্রথম স্কোয়াডে ছিলেন না তিনি। পরে দ্রুত পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষ করে তাকে দলে যুক্ত করা হয়। কারণ, কঠিন কন্ডিশনে অভিজ্ঞ একজন ব্যাটার যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বাংলাদেশ খুব ভালো করেই জানত।

লিটনও এর আগে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলে নিজের সামর্থ্যের কিছুটা দেখিয়েছেন। ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দেশটির মাটিতে পাঁচ ম্যাচে একটি ফিফটি করেছিলেন। তবে এবার প্রথম দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে এসে টেস্টের তিন ইনিংসেই রানের খাতা খুলতে পারলেন না।

শুধু স্টার্কের শ্রেষ্ঠত্বেই কি লিটনের এই ব্যর্থতা? নারী দলের হেড কোচ সারোয়ার ইমরান মনে করেন, ‘গল্পটা আরও গভীরে। তার মতে, ভালো ব্যাটিং উইকেটে লিটন যতটা স্বচ্ছন্দ, কঠিন কন্ডিশনে টিকে থাকার জায়গায় তার সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে।’

জাগো নিউজকে সারোয়ার ইমরান বলেন, ‘না, আমি অবাক হইনি। লিটন উইকেট ভালো থাকলে খুবই ভালো ব্যাটসম্যান। কঠিন উইকেটে লিটনের সারভাইভ করার চেয়ে স্ট্রোক খেলার প্রবণতা বেশি। অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের টেস্ট উইকেটগুলো এত সহজ হবে না। কোন বলটা ছাড়তে হবে আর কোনটা খেলতে হবে, এখানে অনেক ব্যাপার আছে। ব্যাটিং উইকেটে লিটন খুবই ভালো ব্যাটসম্যান, বিশেষ করে যে উইকেটে স্ট্রোক খেলা যায়। সেখানে ওকে দেখতেও সুন্দর লাগে। কিন্তু এই উইকেটে ওভাবে খেলা সম্ভব না। প্রথম টেস্টে হয়তো লিটনের ভালো করার সুযোগ ছিল, কিন্তু সেখানে পারেনি। দ্বিতীয় টেস্টের উইকেটে আরও কঠিন ছিল।’

টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো—কোন বলটি খেলতে হবে আর কোনটি ছেড়ে দিতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। অস্ট্রেলিয়ার মতো কন্ডিশনে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। লিটনের ক্ষেত্রে সেই জায়গাটিই বারবার প্রশ্নের সামনে এসেছে।

এখানেই উঠে আসে লিটনের সামর্থ্য আর তার প্রয়োগের মধ্যকার পার্থক্যটাও। বাংলাদেশের জন্য মনে রাখার মতো একটি সিরিজে ডারউইনের ইতিহাস গড়ার ম্যাচে দলের বেশির ভাগ ব্যাটারই কোনো না কোনোভাবে অবদান রেখেছেন। এমনকি সাদমান ইসলামও একটি ইনিংসে রান করেছেন। কিন্তু যে লিটনকে পেতে চোটের পর এত অপেক্ষা, সেই লিটনই তিন ইনিংসে দলের জন্য যোগ করেছেন শূন্য রান।

১১ বছর ধরে টেস্ট খেলা একজন ব্যাটারের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু কঠিন উইকেটের অজুহাতে এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। বিশেষ করে দলের বিপদের মুহূর্তে পরিস্থিতি বুঝে ব্যাটিং করা, নিজের শটের সীমা বোঝা এবং কোন বল ছেড়ে দিতে হবে- এসবই অভিজ্ঞতার সঙ্গে আরও পরিণত হওয়ার কথা। অথচ অস্ট্রেলিয়ায় লিটনের তিনটি ইনিংসেই যেন সেই ম্যাচ অ্যাওয়ারনেসের ঘাটতিটাই চোখে পড়েছে।

প্রথম টেস্টে তখনও ব্যাট করা তুলনামূলক সহজ হচ্ছিল, দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে দল ধসে পড়েছে, আর দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু কোনো ইনিংসেই লিটন পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী ব্যাট করতে পারেননি। বিশেষ করে অফ স্টাম্পের অনেক বাইরের বল ফিশিং করে আউট হওয়ার ধরনটি প্রশ্ন তুলেছে তার শট নির্বাচন নিয়েও।

অ্যাবিলিটি দিয়ে সবসময় ম্যাচ জেতা যায় না, তার সঙ্গে প্রয়োজন অ্যাপ্লিকেশনও। লিটন টেস্টে বাংলাদেশের সেরাদের একজন- এ নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু কঠিন কন্ডিশনে পরিস্থিতি পড়া, বল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং নিজের স্বাভাবিক স্ট্রোক খেলার প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করার জায়গায় বারবার সমস্যায় পড়ছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া সফর সেই দুর্বলতাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

সারোয়ার ইমরানের ব্যাখ্যাও সেটিই, ‘আমরা তো চার দিনের খেলা খেলিই না। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ায় রান করতে চাইলে একটা প্রসেসের মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং চার দিনের ম্যাচগুলো খেলতে হবে। কোন বলটা ছাড়তে হবে সেটা বুঝতে হবে। যাওয়ার আগে সুমন (হাবিবুল বাশার সুমন) বলছিল যে বাউন্স জানা থাকলে মিডল স্ট্যাম্পের বলও লিভ করা উচিত। আমরা অফ স্টাম্পের বাইরের যে বলগুলো খেলেছি, সেগুলো স্লিপ বা গালিতে গেছে। ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যান হলে হয়তো ওই বলগুলো খেলত না, কারণ তারা ওভাবেই চার দিনের ম্যাচ খেলে অভ্যস্ত। উইকেট ভালো হলে আমাদের ব্যাটসম্যানরা ভালো খেলবে। প্রথম টেস্টে তানজিদ তামিমের সেঞ্চুরির কারণে হয়তো আমরা বিষয়টি ওভাবে অনুভব করিনি। তানজিদ তামিম আগে আউট হলে আমরা হয়তো এত রান করতে পারতাম না।’

লিটনের আরেকটি দুর্বলতার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঁ-হাতি পেসার। বিশেষ করে রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে বাঁ-হাতি পেসার যখন বল বাইরে নিয়ে যান কিংবা হঠাৎ ভেতরে ঢোকান, তখন তার জন্য বিপদ বাড়ে। আর স্টার্কের মতো বোলারের বিপক্ষে সেই বিপদ কয়েকগুণ বেশি।

সারোয়ার ইমরান বলেন, ‘স্টার্কের বিপক্ষে যেকোনো ব্যাটসম্যানই ভুগতে পারে। আমাদের শরিফুলের বিপক্ষেও তারা ভুগেছে। লেফট-আর্ম পেসাররা যখন রাউন্ড দ্য উইকেট আসে, তখন বল বাইরে গেলে যেমন বিপজ্জনক, ভেতরে ঢুকলে আরও বেশি বিপজ্জনক। তাই লেফট-আর্ম পেসারদের একটা বাড়তি সুবিধা থাকে।’

তবে লিটনের বাঁ-হাতি পেসারদের বিপক্ষে সমস্যাটা একেবারে নতুন নয়। টেস্ট ক্রিকেটে বাঁ-হাতি বোলারদের বিপক্ষে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৮২৮ বল মোকাবিলা করে ১ হাজার ১৬ রান করেছেন লিটন। ডানহাতি পেসারদের বিপক্ষে যেখানে তার স্ট্রাইক রেট ৬৯.০৪, বাঁহাতি পেসারদের বিপক্ষে সেটি নেমে এসেছে ৫৫.৫৮-এ।

বরং টেকনিকের একটি পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন সারোয়ার ইমরান। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, টেকনিক্যালি একটু সমস্যা আছে, তবে আগে এমন ছিল না। আগে ও সুন্দরভাবে খেলে দিত। মাথা অফের দিকে থাকলেও লেগ সাইডের বল সুন্দর খেলত। এখন বডি ওয়েট অফের দিকে পড়ে যায়, তাই লেফট-আর্ম পেসারের বিপক্ষে সমস্যা হয়। এই জিনিসগুলো ও ঠিক করেছিল, কিন্তু এখন আবার সমস্যা দেখা যাচ্ছে।’

অস্ট্রেলিয়ায় লিটনের এই ব্যর্থতা আরও বেশি দৃষ্টিকটু হয়েছে, কারণ সফরের আগে তার ফর্ম ছিল আশাব্যঞ্জক। পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্টে সিলেটে দুই ইনিংসে ১২৬ ও ৫৯ রান করেছিলেন তিনি। সেই লিটনই অস্ট্রেলিয়ায় এসে তিন ইনিংসে শূন্য।

একটি সফর কখনো কখনো একজন ক্রিকেটারের শক্তি যেমন সামনে আনে, তেমনি দুর্বলতার জায়গাগুলোও নির্মমভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। লিটনের অস্ট্রেলিয়া সফরটা যেন ঠিক তেমনই।

ডারউইনে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়েছে। ম্যাকাইয়ে ব্যাটিংয়ের ভয়াবহ ব্যর্থতা দেখেছে। আর এই দুই টেস্টের মাঝখানে লিটনের ব্যক্তিগত গল্প- স্টার্কের সামনে তিনবার, তিন ইনিংসে শূন্য।

বাংলাদেশের জন্য অস্ট্রেলিয়া সফর তাই স্মরণীয় হয়ে থাকবে ইতিহাস গড়ার কারণে। কিন্তু লিটনের জন্য এই সফরটা হয়তো হয়ে থাকবে অন্যরকম এক আয়না- যেখানে দেখা গেছে, ভালো উইকেটে স্ট্রোক খেলা যতটা সহজ, অস্ট্রেলিয়ার মতো কন্ডিশনে টিকে থাকার লড়াইটা তার জন্য এখনও ততটাই কঠিন।
কঠিন কন্ডিশনে তার টেকনিক, বল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত, বাঁহাতি পেসারদের বিপক্ষে দুর্বলতা এবং ব্যাটিংয়ের টেম্পারামেন্ট- সবকিছুকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার