বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
এবার বিপিএল আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। আগের আসরগুলোতে আর্থিক অস্বচ্ছতা, বিসিবির ঘাড়ে বিরাট লোকসানের বোঝা- এসব কারণকেই দেখানো হয়েছে এবার বিপিএল আয়োজন না করার পেছনে।
বোর্ডের এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়বেন দেশের ক্রিকেটাররা। বিশেষ করে যারা জাতীয় দলের বাইরে থেকে নিয়মিত ঘরোয়া ক্রিকেটের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
এর আগেও ২০২৪ সালে বিপিএল আয়োজন না করার কথা বলেছিল তখনকার বোর্ড। তবে বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিমের মতো সিনিয়র ক্রিকেটাররা ক্রিকেটারদের আর্থিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে আয়োজনের অনুরোধ করেছিলেন। বিসিবি সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে বিপিএল আয়োজনও করে। তবে ওই আসরসহ পরের আসরেও ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক ইস্যুতে বিতর্কের মুখে পড়ে বিপিএল, বোর্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপর নতুন সভাপতি গত ২০ আগস্ট ঘোষণা দেন, এ বছর বিপিএল হচ্ছে না। তারা পুরো টুর্নামেন্ট আরো গুছিয়ে ভালোভাবেই করতে চান। স্বাভাবিকভাবেই দেশের ২৫-৩০ জনের বাইরে সব ক্রিকেটারকেই বিপিএল ও ডিপিএলের উপর নির্ভর করতে হয়। এরপর চলতি বছরের ডিপিএলেও পারিশ্রমিক কমে গেছে তিন ভাগের ২ ভাগ!
এমন অবস্থায় ক্রিকেটাররা কি ভাবছেন? জাগো নিউজ ঘরোয়া ক্রিকেটের কয়েকজন ক্রিকেটারের সঙ্গে আলাপ করেছে। তাদের প্রত্যেকেই আর্থিক ক্ষতি নিয়েই বেশি শঙ্কিত। একই সঙ্গে যদি বিপিএল না হয় বিকল্প কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজনের কথাও বলেছেন তারা।
বিসিবির কোড অব কন্ডাক্টের কারণে এসব আভ্যন্তরীন ইস্যুতে ক্রিকেটাররা মিডিয়ার সাথে কথা বলতেও ভয় পান। পাছে না আবার তাদেরকে নিষেধাজ্ঞাসহ নানা ঝামেলায় পড়তে হয়। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে।
ঘরোয়া ক্রিকেটের এক বাঁ-হাতি পেসার বলছিলেন, ‘ওটার (বিপিএল না হওয়া) পরিপ্রেক্ষিতে যদি কোনো টুর্নামেন্ট করে তাহলে যেন প্লেয়ারদের দিকটাও দেখা হয়, এটা আমার চাওয়া।’
এছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটে পারিশ্রমিক নিয়ে জটিলতা কাটানোর কথাও বললেন ওই ক্রিকেটার। তিনি বলেন, ‘ডিপিএল শেষ তিন-চার বছরে সবাই কিন্তু পূর্ণ পারিশ্রমিক পাচ্ছে না। আমারা আসলে যে খেলাই খেলি না কেন, পেমেন্ট স্ট্রাকচারটা ঠিক করা উচিত।’
চুক্তির অর্থ পুরোপুরি পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে ওই ক্রিকেটার আরও বলেন, ‘যদি কমও পায় একটা প্লেয়ার, যে টাকাটা কন্ট্রাক্ট হয় ওই ফুল টাকাটা যেন পায়।’
ডিপিএল-বিপিএলে আরেক নিয়মিত ক্রিকেটারের মুখেও একই সুর। তিনি বলছিলেন, ‘এমনিতেই ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোতে পারিশ্রমিক কমে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এরপর যে টাকাই চুক্তি হয় সেটাও ঠিকঠাক পাই না। আগে এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন পারিশ্রমিকটা ঠিকঠাক পাই।’
গত দুই বিপিএলে ফিক্সিং, ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক ইস্যু নিয়ে একের পর এক বিতর্কে পড়েছে বিসিবি। বিদেশি ক্রিকেটাররাও ঠিকঠাক পারিশ্রমিক পাননি। ২০২৪ বিপিএলে তো দুর্বার রাজশাহীর বিদেশিরা পারিশ্রমিক ইস্যুতে এক ম্যাচ বয়কটও করেন। এ নিয়ে দেশি ক্রিকেটারদেরও লজ্জায় পড়তে হয়।
বিপিএলে নিয়মিত খেলা এক অলরাউন্ডার সেই কথাই বলছিলেন, ‘বিপিএলে এমন সব ঘটনা ঘটে বিদেশি ক্রিকেটারদের সামনে তো লজ্জ্বায় পড়তে হয়। সেদিক থেকে সব গোছায়ে করা ভালো।’
নিজেদের আর্থিক ক্ষতির কথাও মাথায় রেখেছেন তিনি, ‘হ্যাঁ, আমরা যারা বিপিএল-ডিপিএলের উপর নির্ভর করি, তাদের জন্য তো এটা বড় ধাক্কাই! কিন্তু যদি এর জায়গায় বিকল্প টুর্নামেন্ট আয়োজন করে বিসিবি ক্ষতিটা পুষিয়ে দেয় তাহলে ভালো হয়। আবার বিসিবি একবারে ভালোভাবে পরেরবার আয়োজন করতে পারবে, ক্রিকেটারদেরও ক্ষতি হবে না। তবে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক নিয়ে একটা সিস্টেম দাঁড় করানো দরকার। তাহলেই বোধহয় ঝামেলা কমবে।’
এদিকে বিপিএল না হলেও ক্রিকেটারদের জন্য বিকল্প কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন।
এক টেলিভিশন চ্যানেলকে তিনি বলেন, ‘বিপিএল না হয়েও যদি অন্য কিছু একটা করে কিছু করা যায়, হয়তোবা ১০০% বিপিএলের মতো হবে না। আমরা খেলতে চাই। খেলার মাধ্যমেই আমরা আমাদের প্রাপ্য পারিশ্রমিক পেতে চাই। খুবই ক্রিটিক্যাল একটা বিষয় এটা।’
তবে বিপিএল প্রতি বছর আয়োজন করলেই হবে না, টুর্নামেন্টটি সঠিক কাঠামোয় করার পক্ষপাতী কোয়াব সভাপতি। একই সঙ্গে ক্রিকেটারদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান তার।
মিঠুন বলেন, ‘আমরা ডেফিনেটলি একটা উইন-উইন সিচুয়েশনে যেতে চাই। বিপিএল যেভাবে হচ্ছে সেভাবে হওয়া ঠিক না, কারণ প্রপারভাবে একটা বিপিএল আয়োজন করা খুবই জরুরি। এমন ভঙ্গুরভাবে প্রতিবছর বিতর্ক নিয়ে টুর্নামেন্ট করা হোক এটাও আমরা চাই না। আর্থিক নিরাপত্তাটা গুরুত্বপূর্ণ।’
বিপিএল না হলে ক্রিকেটারদের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করে মিঠুন বলেন, ‘বিপিএল যদি না হয় তাহলে ডেফিনেটলি প্লেয়াররা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই জিনিসটা নিয়েই আমাদের আলোচনার বিষয় যে কিভাবে এটা কতটুকু পুষিয়ে দেওয়া যায়।’
তবে ভবিষ্যতে আরও মানসম্মত বিপিএল পেতে এক বছর বিরতি প্রয়োজন হলে ক্রিকেটাররাও তাতে ছাড় দিতে প্রস্তুত বলে জানান তিনি।
মিঠুন বলেন, ‘একটা ভালো কিছুর জন্য যদি দুই পক্ষ থেকে কিছুটা স্যাক্রিফাইস করতে হয় তাহলে করতে হবে। সবাই চায় একটা সুন্দর গোছানো বিপিএল হোক। আমরাও প্লেয়ার হিসেবে একই জিনিসই চাই। এটার জন্য যদি একটা বছর অফ রেখে আমরা আইপিএল, পিএসএল বা বিগ ব্যাশের মতন সুন্দর একটা গোছানো টুর্নামেন্ট পাই যেটা লং টাইমের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বেনিফিটেড হবে বা প্লেয়াররা লং টাইমের জন্য বেনিফিটেড হবে, আমরা ডেফিনেটলি সেটার জন্য এতটুকু স্যাক্রিফাইস করতে রাজি আছি।’
তবে ক্রিকেটারদের আয়ের বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলেও মনে করিয়ে দিয়েছেন কোয়াব সভাপতি। মিঠুন বলেন, ‘একইসাথে এটাও দেখতে হবে যে এটা যেহেতু আমাদের রুজি-রুটি, আমাদের প্রিমিয়ার লিগটাও ঠিকঠাক মতন হচ্ছে না লাস্ট দুইবছর। প্রিমিয়ার লিগ যেভাবে চলছিল বা প্লেয়াররা যেভাবে আর্থিকভাবে বেনিফিটেড হতো সেটাও এখন লাস্ট ২ বছর ধরে হচ্ছে না। প্লেয়ারদের কথা অবশ্যই ক্রিকেট বোর্ডের চিন্তা করতে হবে।’