বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
স্টেডিয়ামের আলো তখন জ্বলছে। স্টার্টিং ব্লকে দাঁড়িয়ে আটজন অ্যাথলেট। কয়েক মুহূর্ত পরই শুরু হবে দৌড়। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছেন না। চোখ শুধু ফিনিশিং লাইনে। এখানে বন্ধুত্বের জায়গা নেই; এখানে লড়াই নিজের সেরা সময়ের সঙ্গে, প্রতিপক্ষের সঙ্গে। কেউ এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড়তে চান না। ফিনিশিং লাইনে ব্যবধান কখনো এক সেকেন্ড, কখনো এক সেন্টিমিটার।
সেই প্রতিযোগিতার বাইরের দৃশ্যটি সম্পূর্ণ আলাদা। অ্যাথলেটস হোটেলের ছোট্ট কফি কর্নারে বসে আছেন পাঁচ দেশের পাঁচজন অ্যাথলেট। একজন অস্ট্রেলিয়ার, একজন ভারতের, একজন বাংলাদেশের, একজন কানাডার, আর একজন স্কটল্যান্ডের। কারও গায়ে দেশের ট্র্যাকস্যুট, কারও হাতে নিজের দেশের পতাকার ব্যাজ। সামনে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ, টেবিলে রাখা মোবাইল ফোন। চারপাশ ভরে আছে হাসি আর গল্পে।
কয়েক ঘণ্টা পর এই মানুষগুলোর কেউ জিতবেন, কেউ হারবেন। একই লেনে দাঁড়িয়ে তারা একে অন্যকে হারানোর চেষ্টা করবেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তারা শুধু পাঁচজন তরুণ-তরুণী, যাদের পরিচয় হয়েছে খেলাধুলার মাধ্যমে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, শত্রুতা নেই। জয়-পরাজয়ের হিসাব শেষ হয়ে যায়, বন্ধুত্বের গল্প শুরু হয়। অ্যাথলেটস হোটেল যেন একটি ছোট পৃথিবী। এখানে একই ছাদের নিচে বাস করেন বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ। ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, খাবারের স্বাদ আলাদা, জীবনযাত্রার গল্প আলাদা। তবে স্বপ্নের জায়গায় সবাই এক।
কেউ নিজের দেশের হয়ে প্রথমবার এসেছেন। কেউ অলিম্পিকের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন। কেউ আবার ছোট একটি দ্বীপদেশ থেকে এসে বিশ্বের সামনে নিজের পরিচয় তৈরি করতে চান। প্রত্যেকের চোখে একই আগুন।
বাংলাদেশের স্প্রিন্টার শিরিন আক্তারের কাছেও এই অভিজ্ঞতা অন্যরকম অনুভূতি।
শিরিন বলেন, এখানে এসে সবচেয়ে ভালো লাগে বিভিন্ন দেশের অ্যাথলেটদের সঙ্গে মেশার সুযোগ। আমরা মাঠে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, মাঠের বাইরে সবাই বন্ধু। সবার জীবনযাত্রা, প্রস্তুতি ও সংগ্রামের গল্প শুনে অনেক কিছু শেখা যায়।
তার ভাষায়, একজন অ্যাথলেটের জীবন শুধু ট্র্যাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্য দেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, সবাই কোনো না কোনো সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এসেছে। কারও সুযোগ বেশি, কারও কম; কিন্তু স্বপ্ন সবার একই।
বাংলাদেশ সুইমিং দলের ম্যানেজার ও সাবেক সাঁতারু নিবেদিতা দাসও মনে করেন, কমনওয়েলথ গেমসের আসল সৌন্দর্য এখানেই। তার মতে, একজন ক্রীড়াবিদের জন্য এই অভিজ্ঞতা শুধু খেলার নয়, জীবনেরও শিক্ষা। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, তাদের সংস্কৃতি জানা যায়। এই বন্ধুত্বই গেমসের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
দেশের ব্যাজ বিনিময়ও বেশ জনপ্রিয়। ছোট্ট একটি ব্যাজ কখনো হয়ে ওঠে বড় স্মৃতি। কেউ নিজের দেশের পতাকার ব্যাজ উপহার দেন নতুন বন্ধুকে, কেউ সংগ্রহ করেন অন্য দেশের স্মারক। গেমস শেষে স্যুটকেসে হয়তো পদক থাকে না, থেকে যায় অনেক দেশের মানুষের ভালোবাসার চিহ্ন।
খাবারের টেবিলেও গড়ে ওঠে অন্যরকম বন্ধুত্ব। কেউ প্রথমবার ভারতীয় কারির স্বাদ নিচ্ছেন। কেউ আফ্রিকার কোনো দেশের বিশেষ খাবার নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ আবার স্কটিশ হ্যাগিস বা স্থানীয় খাবারের গল্প করছেন। খাবার হয়ে ওঠে সংস্কৃতি বিনিময়ের এক অনন্য মাধ্যম।
অনেক সম্পর্কের শুরু হয় এই ভিলেজ থেকেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত হওয়া, ভবিষ্যতে আবার দেখা করার প্রতিশ্রুতি, কখনো একে অপরের দেশে যাওয়ার আমন্ত্রণ—সবকিছুর সূচনা হয় এক কাপ কফির টেবিল থেকে।
গ্লাসগোতে ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের অ্যাথলেটরা লড়ছেন ২১৫টি স্বর্ণপদকের জন্য। দর্শকরা দেখবেন রেকর্ড, নাটকীয় জয়-পরাজয় আর পদক উৎসব। কিন্তু ক্যামেরার বাইরেও তৈরি হচ্ছে আরেকটি ইতিহাস। একটি কফির কাপের পাশে বসে আছে পাঁচ দেশের পাঁচটি স্বপ্ন। কেউ আগামীকাল একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন, কেউ হয়তো একই ফ্রেমে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবেন। কমনওয়েলথ গেমস তাই শুধু প্রতিযোগিতার নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের পরিচয় ও বন্ধুত্বেরও এক অনন্য উৎসব।