Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

খেলাধুলা

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে স্পেনের কাছ থেকে ব্রাজিলকে নিতে হবে ৫টি শিক্ষা

Icon

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে স্পেনের কাছ থেকে ব্রাজিলকে নিতে হবে ৫টি শিক্ষা

বিজ্ঞাপন

২০০২ সালের পর ২৪টি বছর কেটে গেলো। বিশ্বকাপে হেক্সার স্বপ্ন আর পূরণ হচ্ছে না। রোনারদো-রোনালদিনহো এবং রিভালদোদের বিদায়ের পর কিছুদিন কাকা-রবিনহো টেনেছিলেন ব্রাজিল দলকে। এরপর সেই দায়িত্ব পড়ে নেইমারের ওপর। কিন্তু নেইমার এক ট্র্যাজিক হিরো। ইনজুরি যার ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকেছে পুরো ক্যরিয়ারজুড়ে।

বিশ্বসেরা ফুটবলার হওয়ার মত অমিত সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্ব ফুটবলে আবির্ভূত হলেও ইনজুরি থেকে মুক্ত হতে পারেননি নেইমার। যে কারণে প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপেই হোঁচট খেতে হয়েছে তাকে এবং হোঁচট খেয়েছে ব্রাজিল ও তাদের হেক্সা স্বপ্ন।

অথচ, জাতি হিসেবে অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে ফুটবলের প্রতি সবেচেয় বেশি নিবেদন ব্রাজিলিয়ানদের। প্রচুর সম্ভাবনার জন্ম হয় দেশটিতে। অথচ, এক নেইমার ছাড়া আর কোনো বিশ্বমানের তারকা ফুটবলার জন্ম দিতে পারেনি তারা।

চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে হতাশাজনক বিদায়ের পর নতুন স্বপ্ন নিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলতে নেমেছিল ব্রাজিল। দায়িত্বে ছিলেন ইতালিয়ান কালজয়ী কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ক্লাব ফুটবলে সব শিরোপা যেখানে তার পায়ে লুটোপুটি করে খেয়েছে, সেখানে বিশ্বকাপটাই কেবল জেতা বাকি এই বর্ষিয়ান কোচের।

আগামী চার বছরে কী এভাবেই ব্রাজিল ফুটবলকে টেনে তুলতে পারবেন কার্লো আনচেলত্তি?

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতেই ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। অন্যদিকে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে ফুটবলের নতুন শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে স্পেন।

স্পেনের এই সাফল্য কেবল একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুসংগঠিত ফুটবল দর্শন এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের ফসল। স্পেন যে সব জায়গাগুলোতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে বিশ্বজয়ী হতে পেরেছে, সে জায়গাগুলোতেই ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ব্রাজিলের।

চারবছর পর আবারও যদি সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে উঠতে চায় ব্রাজিলিয়ানরা, তাহলে তাদেরকে কিছু নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সুসংগঠিত ফুটবল দর্শন নিয়ে এগুতো হবে। কোথায় পাবে তারা এই শিক্ষা? সদ্য বিশ্বজয়ী স্পেনের কাছ থেকেই অন্তত এমন ৫টি শিক্ষা ব্রাজিল ফুটবল নিতে পারে, যেগুলো স্পেনকে আজ বিশ্বসেরার আসনে বসিয়ে দিয়েছে।

দেখে নিন সেই ৫টি শিক্ষা বা কৌশল
১. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই সাফল্যের ভিত্তি
স্পেনের বর্তমান দলটি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একই ফুটবল দর্শনের ভিত্তিতে বয়সভিত্তিক দল থেকে শুরু করে জাতীয় দল পর্যন্ত খেলোয়াড় তৈরি করা হয়েছে। বল দখলে রাখা, ছোট ছোট পাসে আক্রমণ গড়া এবং মাঠের জায়গা নিয়ন্ত্রণ- এই দর্শনই স্প্যানিশ ফুটবলের পরিচয় হয়ে উঠেছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে সেই দর্শনের সফল বাস্তবায়ন দেখা গেছে লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, পাউ কুবার্সি, পেদ্রিদের মতো তরুণদের পারফরম্যান্সে। তারা ছোটবেলা থেকেই একই কৌশলের মধ্যে বেড়ে উঠেছে।
 
দীর্ঘ পরিকল্পনা এবং একই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে চ্যাম্পিয়ন স্পেন দল
অন্যদিকে ব্রাজিল বিশ্বকাপে খেলতে গেছে নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে। দল তখনও নতুন কৌশলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর্যায়ে ছিল। ফলে ম্যাচভেদে কৌশল বদলেছে, কিন্তু স্থায়ী কোনো খেলার পরিচয় তৈরি হয়নি।

চার বছর পর যদি ব্রাজিলকে সাফল্য তুলে আনতে হয়, তাহলে স্পেনের মত এখন থেকেই তরুণ ফুটবলার তুলে আনার প্রকল্প হাতে নিতে হবে। তারা একই কৌশল আর একই পরিকল্পনার মধ্যে বেড়ে উঠবে।

২. মিডফিল্ডই ম্যাচের নিয়ন্ত্রক
স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম বড় শক্তি ছিল তাদের মিডফিল্ড। রদ্রি পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তার সঙ্গে পেদ্রি, দানি ওলমো ও ফ্যাবিয়ান রুইজ মিলে প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছেন এবং আক্রমণ-রক্ষণে ভারসাম্য বজায় রেখেছেন।

ব্রাজিল এখনও বিশ্বমানের ফরোয়ার্ড ও ডিফেন্ডার তৈরি করছে। কিন্তু এমন মিডফিল্ডার খুব কমই উঠে আসছে, যারা পুরো ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঝমাঠে পিছিয়ে পড়েছে সেলেসাওরা।

২০৩০ বিশ্বকাপে সাফল্য তুলে আনতে হলে ব্রাজিলের অবশ্যই এখন থেকে মিডফিল্ডে নজর দিতে হবে। একজন রদ্রি তেরি করতে না পারলে চার বছর পর কেন, আগামী কত বছর পর যে আবার তারা বিশ্বকাপের ছোঁয়া পাবে তা বলা মুস্কিল।

৩. সেরা রক্ষণ মানেই শুধু ভালো ডিফেন্ডার নয়
বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম গোল হজম করেছে স্পেন। মাত্র একটি। তবে তাদের শক্তি শুধু রক্ষণভাগে ছিল না। মূল অস্ত্র ছিল বলের দখল। বেশির ভাগ সময় নিজেরাই বল নিজেদের কাছে রেখে প্রতিপক্ষকে আক্রমণের সুযোগই দেয়নি স্প্যানিশরা। এতে ডিফেন্ডারদের ওপর চাপও কম পড়েছে।

ব্রাজিলের দলে মারকুইনগোস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েসের মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার থাকলেও নরওয়ের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পুরো রক্ষণব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। স্পেন দেখিয়েছে, শক্তিশালী রক্ষণ শুরু হয় আসলে পুরো দলের সমন্বিত খেলায়। ব্রাজিলেরও তেমন একটি রক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে না তুললে আরও বেশি বেশি ভুগতে হবে ভবিষ্যতে।

৪. ধারাবাহিক কোচিং কাঠামোর গুরুত্ব
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে দীর্ঘদিন বয়সভিত্তিক দলগুলোর কোচ ছিলেন। বর্তমান দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ের সঙ্গে তার কাজের সম্পর্ক অনেক দিনের। ফলে তিনি জানতেন, কোন খেলোয়াড়ের শক্তি কোথায় এবং কিভাবে দলকে গড়ে তুলতে হবে।
ব্রাজিল ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে অসাধারণ সফল হলেও জাতীয় দলের সঙ্গে আগে কোনো সম্পর্ক ছিল না আনচেলত্তির। ফলে নতুন পরিবেশে তাকে শুরু থেকেই দল গঠন করতে হয়েছে।

ব্রাজিল দলে নেইমার নির্ভরতা ছিল অনেক বেশি
যদিও বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পরও ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) তাকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘমেয়াদে সেই ধারাবাহিকতা কতটা কাজে আসে।

৫. ব্যক্তিনির্ভর নয়, দলই সবচেয়ে বড় শক্তি
স্পেনের দলে লামিনে ইয়ামালের মতো দুর্দান্ত প্রতিভা ছিল। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে দলটি কখনোই একজন ফুটবলারের ওপর নির্ভরশীল ছিল না।
প্রতিটি ম্যাচে আলাদা আলাদা খেলোয়াড় দায়িত্ব নিয়েছেন। কেউ গোল করেছেন, কেউ আক্রমণ সাজিয়েছেন, কেউ আবার মাঝমাঠ কিংবা রক্ষণ সামলেছেন। এই সমন্বিত পারফরম্যান্সই স্পেনকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছে।

ব্রাজিলে এখনও বড় তারকাদের ওপর নির্ভরতার প্রবণতা বেশি। কোনো একজন খেলোয়াড় ব্যর্থ হলে পুরো দলের ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়। স্পেনের সাফল্য প্রমাণ করেছে, আধুনিক ফুটবলে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে সুসংগঠিত দলগত ফুটবলই সবচেয়ে বড় শক্তি। ব্রাজিলের প্রয়োজন ব্যক্তি নির্ভরতা কমিয়ে দলীয় সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দিতে।
 
স্পেনের পথেই কি ফিরবে ব্রাজিল?
বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে স্পেন দেখিয়ে দিয়েছে, বড় সাফল্য রাতারাতি আসে না। পরিকল্পনা, ধারাবাহিকতা, বয়সভিত্তিক উন্নয়ন এবং সুস্পষ্ট ফুটবল দর্শন মিলেই তৈরি হয় একটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল।

ব্রাজিল দলকে এমনই সব সময় জয়ী হিসেবে দেখতে চায় ভক্তরা
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন খেলোয়াড় খুঁজে বের করা নয়; বরং পুরো ফুটবল কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসা। স্পেনের বিশ্বজয় সেই পথটাই আবারও স্পষ্ট করে দিল। ব্রাজিল কী পারবে চারবছর পর এই পয়েন্টগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে?

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার