বিজ্ঞাপন
আর্জেন্টিনার কৌশলেই মেসির স্বপ্নভঙ্গ, ১৯ বছরেই ‘ফুটবলের ষোলোকলা পূর্ণ’ ইয়ামালের
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০২:০১ পিএম
বিজ্ঞাপন
বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে স্পেনের দুর্দান্ত তরুণ লামিন ইয়ামাল যখন অশ্রুসিক্ত লিওনেল মেসিকে জড়িয়ে ধরেন, দৃশ্যটি ছিল দারুণ প্রতীকী। যেন এক প্রজন্মের কাছ থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে মশাল হস্তান্তর।
৩৯ বছর বয়সি মেসি নিউইয়র্ক-নিউজার্সি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ঠাসা আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন, যারা তখনো তার নামে গান গাইছিল। হয়তো ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এটাই তার শেষ উপস্থিতি। আর গোটা বিশ্বের সামনে, হতাশ আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে আসেন সেই লামিন ইয়ামাল, এরপর দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। বার্সেলোনার বর্তমান ১০ নম্বর জার্সিধারী জড়িয়ে ধরেছেন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কিংবদন্তি ১০ নম্বরকে।
দৃশ্যটি ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরের সেই বিখ্যাত ছবির চেয়ে একেবারেই ভিন্ন, যেখানে ২০ বছর বয়সি মেসি ৬ মাসের এক শিশুকে (ইয়ামাল) গোসল করাচ্ছিলেন। এই ম্যাচের আগে দাতব্য ক্যালেন্ডারের সেই ছবি আবারও ভাইরাল হয়েছিল। সেই ছোট্ট শিশুটি আজ পূর্ণাঙ্গ পুরুষ, আর মেসি হয়তো তার বিশ্বকাপ যাত্রার একেবারেই শেষ প্রান্তে।
মেসির চেয়ে দুই দশকের ছোট এবং ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুতে থাকা লামিন ইয়ামাল বিশ্বকাপ জিতে আক্ষরিক অর্থেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের ষোলোকলা পূর্ণ করেছেন। স্পেনের হয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ইউরো জেতার ঠিক দুই বছর পর এই কীর্তি গড়লেন তিনি। মেসির মতোই বার্সেলোনার একাডেমি থেকে উঠে আসা এই তরুণ হ্যামস্ট্রিং চোট নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও, শেষ করেছেন সবচেয়ে কম বয়সি খেলোয়াড় (১৯ বছর ৬ দিন) হিসেবে বিশ্বকাপ ও ইউরো—উভয় শিরোপা জয়ের রেকর্ড গড়ে।
এই হতাশাজনক বিশ্বকাপ ফাইনালের অন্যতম প্রধান দিক ছিল স্প্যানিশ সতীর্থদের নান্দনিক ফুটবল কৌশলের কারণে ইয়ামালের প্রভাব কীভাবে বেড়েছে, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার উসকানিমূলক কৌশলের কারণে মেসি কীভাবে নিজের দলের কাছেই ‘প্রতারিত’ হয়েছেন। এই কৌশলে আর্জেন্টিনার কোনো লাভ হয়নি, আর সেটাই তাদের প্রাপ্য ছিল।
পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে স্পেন এবং লামিন ইয়ামাল নিজেদের এমনভাবে পরিণত করেছেন যে, এখন পুরো ফুটবল বিশ্ব তার পদতলে এবং ফুটবলের সবচেয়ে বড় দুটি শিরোপা তার পকেটে। ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভার পাশাপাশি তিনি স্পেনের জন্য এক ‘লাকি চার্ম’ বা সৌভাগ্যের প্রতীকও বটে। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের নির্ণায়ক গোলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের আধিপত্যের পূর্ণতা দেয় স্পেন।
দেশের হয়ে খেলা ২৮টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ইয়ামাল এখনো হারের মুখ দেখেননি। বড় টুর্নামেন্টগুলোতে তিনি ১৩টি ম্যাচে মূল একাদশে থেকেছেন এবং সবকটিতেই জিতেছেন। মূল একাদশে থেকে ইউরোপিয়ান খেলোয়াড়দের মধ্যে এটি ১০০ শতাংশ জয়ের দীর্ঘতম রেকর্ড। ১৯ বছর বয়সি স্প্যানিশ সতীর্থ পাউ কুবারসির পাশাপাশি তিনি চতুর্থ ও পঞ্চম টিনএজার হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের মূল একাদশে থেকে শিরোপা জেতার কীর্তি গড়েন। এর আগে ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের পেলে, ১৯৮২ সালে ইতালির জিউসেপ্পে বার্গোমি এবং ২০১৮ সালে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এই কীর্তি গড়েছিলেন।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ম্যাচ শেষে ইয়ামালের প্রতি ‘আন্তরিক কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সে যে দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছে, তা তাকে আরও পরিণত হতে এবং এখনকার চেয়েও বড় মাপের ফুটবলার হতে সাহায্য করবে। সে দলের স্বার্থে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে। আমার দলে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার মতে, সে অসাধারণ একটি বিশ্বকাপ কাটিয়েছে।
এটি কেবল একটি বিশেষ প্রতিভা নয়, বরং বিশেষ মেজাজের এক বিশেষ প্রতিভা। বিশেষ করে নিকোলাস তাগলিয়াফিকো যখন বারবার তাকে কড়া ট্যাকল করছিলেন, তখন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ভয় দেখানোর সুস্পষ্ট চেষ্টাগুলো হাসিমুখেই উড়িয়ে দিয়েছেন ইয়ামাল।
ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক ও বিবিসি স্পোর্টসের বিশ্লেষক জো হার্ট বিষয়টি দারুণভাবে তুলে ধরেছেন। লামিন ইয়ামাল শুধু যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি, তা নয়, তিনি বলেন, সে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছে। সে ঘাবড়ে যায়নি বা পিছিয়েও আসেনি। পুরো দল তাকে আঘাত করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সে খুব শান্ত ছিল। এটি তার তরফ থেকে সত্যিই এক অসাধারণ পারফরম্যান্স। লামিন ইয়ামালের বয়স মাত্র ১৯। তার জন্য কী চমৎকার একটি দিন! ১৯ বছর বয়সেই সে ফুটবলকে পূর্ণতা দিয়েছে।
পুরো ক্যারিয়ার সামনে পড়ে আছে, আর অধিনায়ক রদ্রি (যিনি টুর্নামেন্টসেরাও হয়েছেন)-র মতো সতীর্থদের অভিজ্ঞতা ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইয়ামাল তার ক্যারিয়ার শেষ করার আগে এমন আরও অনেক সাফল্য যুক্ত করবেন, সেই সম্ভাবনাই প্রবল।
আর্জেন্টিনার কৌশলে মেসির বিশ্বকাপ-আশার সমাধি
লামিন ইয়ামালের আনন্দ উদ্যাপনের ঠিক বিপরীত চিত্র ছিল মেসির চোখেমুখে। আর্জেন্টিনার বিশাল সমর্থকগোষ্ঠীর দিকে তাকিয়ে তাকে হৃদয়ভাঙা দেখাচ্ছিল। হয়তো তিনি বুঝতে পারছিলেন, বিশ্বকাপে এমন ভালোবাসা পাওয়ার সুযোগ এটাই শেষ।
টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতার চেষ্টায় থাকা আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে যখন প্রশ্ন করা হয়, কিংবদন্তি এই ফরোয়ার্ডের এটাই শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ কিনা—তখন তিনি বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। একই সঙ্গে ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে দেখা যায় তাকে। স্কালোনি জানান, তিনি মেসির সঙ্গে কথা বলেননি। এরপর তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে চলে যান।
প্রায় প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক ও দ্বান্দ্বিক কৌশল মেসির জন্য কোনো কাজেই আসেনি; বরং দলের অনুপ্রেরণা ও নেতাকে পুরো ম্যাচে একপ্রকার দর্শক বানিয়ে রেখেছিল। স্পেনের এই জয় ছিল মূলত ফুটবলের জয়। কারণ, প্রথম থেকেই আর্জেন্টিনা ফুটবল ছাড়া অন্য সব কিছুতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিল।
৪০ মিনিট পার হওয়ার পর মিকেল ওয়ারজাবালকে ফাউল করার কারণে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন, যা বিশাল এই স্টেডিয়ামের দর্শকদের কাছে ছিল নিছকই এক প্রহসন। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা নিজেদের যে প্রতিভার প্রমাণ দিয়েছিল, ফাইনালে এসে এমন ধ্বংসাত্মক কৌশলের কারণে তা চরম হতাশাজনক এক দৃশ্যে পরিণত হয়। এই কৌশল কখনোই মেসির জাদুকরী প্রতিভা এবং খেলার ওপর তার প্রভাব বিস্তারের জন্য সহায়ক ছিল না।
মেসি নিজেও একপর্যায়ে রেফারিকে ইঙ্গিত করেন যেন স্পেনের মার্ক কুকুরেয়াকে লাল কার্ড দেখানো হয়, কারণ তিনি মুখে হাত দিয়ে কথা বলছিলেন (এই বিশ্বকাপে উসকানিমূলকভাবে এমন কাজ করলে লাল কার্ড দেখানোর নিয়ম রয়েছে)। তবে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্সের সবচেয়ে বাজে মুহূর্তটি আসে অতিরিক্ত সময়ে খেলা গড়ানোর ঠিক আগে। চেলসির মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ কোনো কারণ ছাড়াই কুবারসির ওপর বুনো চার্জ করে বসেন। প্রতিপক্ষকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার সময় বলের দিকে তার কোনো খেয়ালই ছিল না। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়াটা তার পুরোপুরি প্রাপ্যই ছিল।
বিশ্বকাপের ফাইনালে ৯০ মিনিটে একটি শটও নিতে না পারা টুর্নামেন্টের ইতিহাসের প্রথম দল আর্জেন্টিনা। ১১৭ মিনিটে মরিয়া হয়ে মেসি একটি শট নিলেও তা লক্ষ্যের বাইরে দিয়ে যায়। যেখানে স্পেন গোলমুখে ১২টি শট নিয়েছিল, সেখানে আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। প্রথমার্ধের চিত্রটি ছিল আরও ভয়াবহ। প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকের কাছাকাছি (ফাইনাল থার্ড) অংশে আর্জেন্টিনা পাসের চেয়ে ফাউল করেছে বেশি। ৮টি পাসের বিপরীতে ফাউল ছিল ৯টি! এটিই তাদের খেলার ধরন স্পষ্ট করে দেয়।
চূড়ান্ত বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনার অন্য খেলোয়াড়েরাও মেসির সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে সেই কান্নার সমাপ্তিও ঘটে দুই দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের মধ্যে এক দৃষ্টিকটু হাতাহাতির মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামা লিয়ান্দ্রো পারেদেস বরাবরের মতোই ছিলেন আক্রমণাত্মক; তিনি এরিক গার্সিয়াকে গলা চেপে ধরেন। স্পেনের গাভিকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাতেও তিনি জড়িত ছিলেন। এই অসাধারণ বিশ্বকাপটি এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সমাপ্তির জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকা উচিত নয়।
স্পেন হয়তো ফাইনালে নিজেদের সেরা ছন্দে ছিল না, কিন্তু পুরো বিশ্বকাপজুড়ে তারা দারুণভাবে বিকশিত হয়েছে। প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র করার ধাক্কা সামলে শেষ পর্যন্ত তারা পরম গৌরব অর্জন করেছে।
বিশ্বকাপ তার যোগ্য চ্যাম্পিয়নকেই পেয়েছে। আর লামিন ইয়ামালের মধ্যে পেয়েছে ভবিষ্যৎ টুর্নামেন্টগুলোর এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। মেসির অবিস্মরণীয় বিশ্বকাপ যুগের হয়তো অবসান ঘটল, কিন্তু লামিন ইয়ামালের যুগ হয়তো আরও অনেক দিন ধরে চলবে।
সূত্র: বিবিসি