বিজ্ঞাপন
একটি অ্যাসিস্ট একটি দৌড় একটি গোল: মেসির জীবনে অতুলনীয় ২৫৯ সেকেন্ড
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম
বিজ্ঞাপন
যখন আপনার নাম লিওনেল মেসি, তখন অসম্ভবকে সম্ভব করতে খুব বেশি সময় লাগে না। মাত্র ৪ মিনিট ১৯ সেকেন্ড বা ২৫৯ সেকেন্ডই যথেষ্ট। আপনি লিওনেল মেসি। ইতিহাসের অক্ষয় কালিতে নিজের নাম লিখতে এলএম টেনের প্রয়োজন কেবল কিছু সময়।
পেনাল্টি মিসের অমার্জনীয় ভুলের পর চোখের পানি আটকে থাকে বাধ্যগত সঙ্গীর মতো। কিন্তু অসাধ্য সাধনের পর হৃদয়ের আর্তনাদ, প্রাপ্তির আনন্দের সঙ্গে ওই চোখের পানিও গড়িয়ে পড়ে। মেসি নিজের জাদুকরী সৌন্দর্যের বুদ করে আরও একবার বিশ্বকে জানিয়ে দেয় চল্লিশেও মেসি অসাধারণ, অকল্পনীয়, অবর্ণনীয়।
প্রায় নিশ্চিত হেরে যাওয়া ম্যাচে দুই গোলের ব্যবধান মুছে ফেলে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্য লিখা শুধু তো মেসির পক্ষেই সম্ভব। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর আগে কখনো ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচ জিততে পারেননি। আগের ১৩ বারের প্রত্যেকটি হেরেছে। সেখানে এবার ২-০ সমীকরণ, ৩-২ বানিয়ে লিও হয়ে উঠেন অবিনশ্বর!
মাত্র ২৫৯ সেকেন্ডে তিন অঙ্কের এক ফুটবল মহাকাব্য রচনা করলেন তিনি। একটি নিখুঁত ক্রস, একটি দুর্দান্ত একক দৌড় এবং অবশেষে এক অসাধারণ গোল। সেই জাদুতেই ম্যাচে সমতায় ফিরে আসে আর্জেন্টিনা। তাতে প্রমাণ হয়ে যায় মখমলের চাদর বিছানো সবুজাভ ময়দানে তিনি এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
ঘটনাক্রম:
প্রথম অধ্যায়: নিখুঁত ক্রস (৭৯ মিনিট)
মিশরের বিপক্ষে ম্যাচে এর আগ পর্যন্ত ম্যাচে মেসির দিনটা মোটেও ভালো যাচ্ছিল না। একটি পেনাল্টি মিস করার পাশাপাশি তার একের পর এক পাস প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা আটকে দিচ্ছিলেন। বক্সের সামনে গিয়ে ড্রিবল থেমে যাচ্ছিল, বয়সের ছাপও স্পষ্ট হচ্ছিল তার খেলায়। মিশর তখন ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে, আর আর্জেন্টিনার গোল করার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছিল। একটি কর্নার নেন মেসি, যা সহজেই ক্লিয়ার করে মিশরের রক্ষণভাগ। ফিরতি বলে তার প্রথম ক্রসও প্রতিহত হয়। মনে হচ্ছিল, আজ যেন সেই পরিচিত মেসিকে দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু মাত্র ১৫ সেকেন্ড পর আবার বল আসে তার পায়ে। বিপদের মুহূর্তে যেমনটা হয়, সতীর্থরা আবারও খুঁজে নেয় মেসিকেই। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের মুখোমুখি হয়ে শরীরের সামান্য ভঙ্গি বদলে একটুখানি জায়গা বের করে নেন। সেটুকুই যথেষ্ট ছিল।
একটি হালকা টাচ, একবার তাকানো, তারপর নিখুঁত এক ক্রস। বল গিয়ে পড়ে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর মাথায়। ছয় গজ বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রোমেরোর কাজ ছিল শুধু বল জালে পাঠানো। মেসির বিশ্বকাপে প্রথম অ্যাসিস্ট। তাতে স্কোর লাইন আর্জেন্টিনা ১-২ মিশর। হঠাৎ করেই যেন প্রত্যাবর্তনের সূচনা করলেন প্রজন্মের অন্যতম সেরা এই প্লে-মেকার।
দ্বিতীয় অধ্যায়: সময়কে পেছনে ফেলে মেসির সেই দৌড় (৮২ মিনিট)
ম্যাচে কিছু মুহূর্ত থাকে, যখন বোঝা যায়, এবার একজন মহাতারকা নিজের হাতে খেলার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছেন। টাচলাইনে বল পেয়ে মেসি যেন সময়কে পেছনে ফিরিয়ে নিলেন। মনে হচ্ছিল, আবার ২০১১ সালের সেই তরুণ মেসি! প্রথম স্পর্শেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে ছিটকে ফেললেন। এরপর হঠাৎই ফিরে এল সেই বিস্ফোরক গতি, যা অনেকেই ভেবেছিলেন হারিয়ে গেছে।
বল যেন তার পায়ের সঙ্গে আঠার মতো লেগে আছে। একের পর এক ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলে ছুটে চললেন। জার্সি টেনে ধরেও তাকে থামানো গেল না। বক্সের কাছে পৌঁছে কাঁধের মোচড়ে বাইলাইনের দিকে এগিয়ে যান। এরপর আরেক ডিফেন্ডারকে পাশ কাটিয়ে প্রায় অসম্ভব এক কোণ থেকে বাঁ পায়ে ভাসিয়ে দেন নিখুঁত ক্রস। লাউতারো মার্তিনেজের মাথায় বলটি পৌঁছে যায় অবিশ্বাস্য নির্ভুলতায়। যদিও মার্তিনেজ সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেননি। তবু সেটি ছিল ম্যাচের মোড় ঘুরে যাওয়ার মুহূর্ত।
গোল না হলেও মিশরের খেলোয়াড়দের চোখেমুখে তখন স্পষ্ট আতঙ্ক। সবাই বুঝে গিয়েছিল, মেসি এখন পুরোপুরি জেগে উঠেছেন।
আর্জেন্টিনা সজাগ তাদের সময় আসছে। মিশর বুঝতে পেরেছিল ভয়ংকর কিছুই সামনে আসছে। আলবিসেলেস্তরা মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়…
তৃতীয় অধ্যায়: মেসির সেই দুর্দান্ত গোল (৮৩ মিনিট)
লিও স্কোর। লিও স্কোর। আর্জেন্টিনা কামব্যাক টু গেম। ধারাভাষ্যকার নিজের কথা শেষ করতে পারেননি। রোমাঞ্চ, উত্তেজনা সব ভর করছিল কণ্ঠে।
মাঠের বাইরে মেসির শান্ত স্বভাব, লাজুক হাসি কিংবা বিনয়ী আচরণ হয়তো মেসির খ্যাপাটে উদযাপনকে আড়াল করে রাখে। কিন্তু সময় গোলের পর মেসি সব খোলস ছিড়ে বেরিয়ে আসেন। এই গোল সেই ফুলটাকেই ফুটিয়েছিল।
ম্যাচের ৮৩ মিনিট। মিশরের বক্সে আর্জেন্টিনার আক্রমণ ব্লক হওয়ার পরও একটুও বিচলিত হননি মেসি। বরং সঙ্গে সঙ্গে আবার আক্রমণে যোগ দেন। বল প্রতিপক্ষের ডিফ্লেকশনে ভেসে দূরের পোস্টে গেলে আগেভাগেই বুঝে ফেলেন, সেখান থেকে বলটি আবার গোলমুখে ফিরিয়ে আনা হবে। তাই দ্রুত বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েন।
গনসালো মন্টিয়েলের স্পর্শে বলটি হালকাভাবে ভেসে আসে তার সামনে। এক পলকে তিনজন ডিফেন্ডার, গোলরক্ষকের অবস্থান এবং বলের গতি। সবকিছু হিসাব করে নেন মেসি। যেন সাজানো ক্যানভাস।
এরপর ডান পায়ে ভর দিয়ে শরীর ঘুরিয়ে বাঁ পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে এমন এক ভলি নিলেন, যা বজ্রগতিতে ক্রসবারে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। শটটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে মনে হচ্ছিল, বলটি মিশরের গোলরক্ষক মোস্তাফা শুবিরকে পাশ কাটিয়ে নয়, যেন ভেদ করেই জালে প্রবেশ করেছে!
স্কোর লাইন আর্জেন্টিনা ২-২ মিশর।
মাত্র ২৫৯ সেকেন্ডে মেসির শক্তির প্রদর্শণী। জাদুকরের স্টেজ পারফরম্যান্স। তাতেই আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্স থেকে আটালান্টা মিশে যায় একাকার হয়ে। এক অ্যাসিস্ট, এক দৌড় ও এক দুর্দান্ত গোল করে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখ থেকে দলকে ফিরিয়ে আনলেন লিওনেল মেসি।
তাতে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়দের আলোচনায় তার নাম কেন সবার আগে উচ্চারিত হয়।