Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

রাজনীতি

জামায়াত জোট নিয়ে কওমি অঙ্গনে বিতর্ক, ৩ মুরুব্বির কাছে চিঠি

Icon

জাগো বাংলা ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম

জামায়াত জোট নিয়ে কওমি অঙ্গনে বিতর্ক, ৩ মুরুব্বির কাছে চিঠি

বিজ্ঞাপন

‘মওদুদী মতবাদ ও জামায়াতে ইসলামী’ বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের অবস্থান জানতে চেয়ে তার তিন মুরুব্বির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন প্রখ্যাত আলেম মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী।

ছয় পৃষ্ঠার ওই চিঠিতে তিনি আকিদা, দেওবন্দি আদর্শ ও কওমি ঐতিহ্যের সুরক্ষাসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী হবিগঞ্জের মাদ্রাসা নূরে মদিনার পরিচালক। তিনি জনপ্রিয় আলোচক ও ধর্মীয় বিতার্কিক (মুনাজির) হিসেবে পরিচিত।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট নিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমিরের অসন্তোষ এবং কওমি অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে তার এই চিঠি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

চিঠিটি পাঠানো হয়েছে মামুনুল হকের তিন মুরুব্বি—মিরপুরের মাদ্রাসা দারুর রাশাদের শিক্ষাসচিব মাওলানা লিয়াকত আলী, গাজীপুরের অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী (দেওনার পীর) এবং মামুনুল হকের বড় ভাই মাওলানা মাহফুজুল হকের কাছে।

এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর জামায়াত সংশ্লিষ্টতা নিয়ে মামুনুল হকের তিন মুরুব্বির কাছে প্রথম চিঠি লিখেছিলেন বগুড়া জামিল মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস ও প্রবীণ আলেম মাওলানা আব্দুল হক আজাদ। যদিও এখন পর্যন্ত এর কোনো উত্তর পাননি বলে বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে জানিয়েছেন তিনি।  

চিঠিতে নুরুল ইসলাম ওলীপুরী আকিদা ও কওমি-দেওবন্দি আদর্শ রক্ষার প্রশ্নে মামুনুল হকের কয়েকটি বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

আকিদাগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন

চিঠিতে মামুনুল হকের একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন ওলীপুরী। ওই বক্তব্যে চার মাজহাব—হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—এর আকিদার সঙ্গে সালাফি ও মওদুদীবাদের আকিদার তেমন কোনো পার্থক্য নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

ওলীপুরীর মতে, চার মাজহাবের আকিদার সঙ্গে সালাফি ও মওদুদীবাদের আকিদার মৌলিক ও ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। কওমি অঙ্গনের একজন শীর্ষ আলেমের এমন বক্তব্য সাধারণ আলেম ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এবং তাদের মওদুদীবাদ ও সালাফিবাদের দিকে ধাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।ি

ইনসাফের প্রতীক নিয়ে বক্তব্য

চিঠিতে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে ইনসাফ ও ওলামায়ে কেরামের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ওলীপুরী।

তার প্রশ্ন, যেসব দল আকাবির, সাহাবা ও সালাফদের সঙ্গে বে-ইনসাফি করেছে বলে তিনি মনে করেন, তাদের নির্বাচনি প্রতীক কীভাবে আলেমদের প্রতীক হতে পারে?

দেওবন্দি-হানাফি আকিদা সংশোধনের আহ্বান নিয়ে আপত্তি

মামুনুল হকের পক্ষ থেকে দেওবন্দি ও হানাফিদের আকিদা সংশোধনের আহ্বান জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করে এর সমালোচনা করেছেন ওলীপুরী।

তার মতে, এ ধরনের আহ্বান অনভিপ্রেত এবং শত বছরের দেওবন্দি-হানাফি ঐতিহ্যের ওপর আঘাতের শামিল। এ বিষয়ে মামুনুল হকের অবস্থান ও বক্তব্যের ব্যাখ্যা চেয়েছেন তিনি।

জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্যের ঐতিহাসিক নজির নিয়ে প্রশ্ন

জামায়াতের সঙ্গে মামুনুল হকের রাজনৈতিক ঐক্যের পক্ষে শাইখুল হিন্দ (রহ.)-এর কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্যের নজির উপস্থাপনের বিষয়টিও চিঠিতে তুলে ধরেছেন  নুরুল ইসলাম ওলীপুরী।

তার দাবি, ওই ঐতিহাসিক নজিরের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক ঐক্যের তুলনা যথাযথ নয়। এতে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মামুনুল হকের বাবা শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.) তার বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে মওদুদীর বিভিন্ন বক্তব্যের দলিলভিত্তিক খণ্ডন করেছেন। চিঠিতে ওলীপুরী মওদুদীবাদ বলতে জামায়াতে ইসলামীকে বুঝিয়েছেন।

‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা নিয়েও ব্যাখ্যা দাবি

জিহাদকে মূল আকিদা হিসেবে উপস্থাপন এবং ‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা ব্যবহারের শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন খ্যাতিমান এ আলেম। 

একই সঙ্গে দেওবন্দি আকিদার সঠিক ব্যাখ্যা এবং এ বিষয়ে মামুনুল হকের বক্তব্যের স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছেন তিনি।

এর আগে চিঠি দিয়েছিলেন আব্দুল হক আজাদ

মামুনুল হকের তিন মুরুব্বির কাছে এর আগেও চিঠি পাঠিয়েছিলেন বগুড়া জামিল মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস ও প্রবীণ আলেম মাওলানা আব্দুল হক আজাদ।

গত ৬ সেপ্টেম্বর জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তিনি ওই চিঠি পাঠান। তবে বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে তিনি জানিয়েছেন, দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত চিঠির কোনো জবাব পাননি।

চিঠিতে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ সেপ্টেম্বর মাওলানা আব্দুল হক আজাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে মামুনুল হক বলেছিলেন, তার কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তা যেন তার তিন মুরুব্বির কাছে পেশ করা হয়। মুরুব্বিরা যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তিনি তা মেনে চলবেন।

মামুনুল হকের ওই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই আব্দুল হক আজাদ তার তিন মুরুব্বির কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত, সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ১১টি দলকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল ১১ দলীয় নির্বাচনি জোট। তবে নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে জোট থেকে বেরিয়ে আসে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত দলটি আটটি আসনে এককভাবে নির্বাচন করে। নির্বাচনের পর খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসও ওই জোট থেকে বেরিয়ে যায়। 

এখন শুধু বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে রয়েছে।

সম্প্রতি কওমি ধারার ইসলামি দলগুলোকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনতে উদ্যোগ নেয় হেফাজতে ইসলাম। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আকিদাগত দূরত্ব ও আদর্শিক মতভিন্নতার কারণে কওমি ধারার ইসলামি দলগুলোকে এক রাখতে চান সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।  

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২২ অক্টোবর রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মাখযানুল উলুম মাদ্রাসায় সাতটি কওমি ধারার ইসলামি দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

নতুন এই জোটে রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট (রাজী), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।

তবে সাত দলের রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপি জোটে এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে রয়েছে।

দলগুলো নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখেই সম্মিলিতভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে। এ ছাড়া আগামী ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী বৈঠক আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার