বিজ্ঞাপন
মনোনয়ন না পেয়ে আল্লাহ আমার ইজ্জত রক্ষা করেছেন: বিএনপিনেতা ড. রিপন
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৩ এএম
বিজ্ঞাপন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পাওয়াকে নিজের জন্য কল্যাণকর বলে মন্তব্য করেছেন দলটির সাবেক ছাত্রবিষয়ক নেতা ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. আসাদুজ্জামান রিপন। তিনি বলেন, ‘আমার এমপি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটা না হয়ে আল্লাহ আমার জন্য ভালো করেছেন, আমার ইজ্জত রক্ষা করেছেন।’
সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রক্রিয়া, নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং মনোনয়ন না পাওয়ার পেছনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন।
তিনি জানান, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মামলা, কারাবাস ও ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করেও দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় তিনি অসম্মানিত বোধ করেছিলেন। তবে পরবর্তী পরিস্থিতিতে সহকর্মী প্রার্থীর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তদবির করাকে নিজের নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করেছেন।
মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আলোচনায় ছিলেন শিল্পপতি মিজানুর রহমান সিনহা, দলটির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুস সালাম আজাদ ও ড. আসাদুজ্জামান রিপন। প্রথমে মিজানুর রহমান সিনহাকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও তার গুরুতর অসুস্থতার পর আব্দুস সালাম আজাদকে চূড়ান্ত প্রার্থী করা হয়।
মনোনয়ন না পাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে রিপন বলেন, বিষয়টি তার জন্য সম্মানজনক ছিল না। তার মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীরা যখন মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মুখে ছিলেন, তখন তিনি দলের হয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। বিপরীতে, যাকে প্রথমে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, তিনি প্রায় ছয় বছর দল থেকে দূরে ছিলেন।
রিপন বলেন, ‘আমরা তো চাপ মোকাবিলা করেছি। জেলে গিয়েছি, মামলা খেয়েছি, বাড়িঘর ছেড়ে থাকতে হয়েছে। স্ত্রী-সন্তানদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। আমাদের কোনো ব্যক্তিগত জীবন ছিল না। এসব করেই তো আমরা দল করেছি।’
মিজানুর রহমান সিনহার ব্যক্তিগত গুণাবলির প্রশংসাও করেন রিপন। তার ভাষ্য, ওই শিল্পপতি এলাকার মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করতেন এবং চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না বলে তিনি জানেন। তবে দীর্ঘ সময় দলের বাইরে থাকার পরও তাকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
রিপনের মনে করেন, দলের দুঃসময়ে যারা মাঠে থেকে নেতাকর্মীদের সংগঠিত রেখেছেন, তাদের ত্যাগ ও অবদানও মনোনয়ন বিবেচনায় গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল।
মিজানুর রহমান সিনহা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও কেন নিজের মনোনয়নের জন্য চেষ্টা করেননি, সেই ব্যাখ্যায় রিপন বলেন, সহকর্মীর সংকটাপন্ন শারীরিক অবস্থাকে নিজের রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা তার নৈতিকতায় বাধে।
তিনি বলেন, ‘উনি যখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলেন, স্ট্রোক করলেন এবং চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে গেলেন, তখন আমি কি বলতে পারতাম—উনি তো আর বাঁচবেন না, আমাকে মনোনয়নটা দেন? কোনো ভদ্রলোকের পক্ষে এমন কথা বলা উচিত নয়।’
রিপন বলেন, ওই পরিস্থিতিতে তার উচিত ছিল সহকর্মীর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করা। একজন মুসলমান হিসেবে তিনি সেটিই করেছেন বলে জানান।
রিপনের মতে, রাজনৈতিক পদ কিংবা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সাময়িক বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শ, নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত সম্মান অক্ষুণ্ন রাখা দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সাক্ষাৎকারে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগের দিনগুলোর কথাও তুলে ধরেন বিএনপির এই নেতা। তিনি জানান, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশ এবং সেখানে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে তাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়েছিল।
রিপনের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তালা খুলে নেতাকর্মীদের নিয়ে সেখানে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর সংবাদ সম্মেলন ও আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
তবে সেই সময় পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শেখ হাসিনা সরকার যদি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারত, তাহলে তাকে গুরুতর বিপদের মুখে পড়তে হতো বলে আশঙ্কা করেছিলেন রিপন। তার ধারণা ছিল, সরকার পুনরায় শক্তিশালী হলে তাকে গ্রেপ্তার, গুম কিংবা দেশ ছাড়তে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারত।
নিজের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে রিপন বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বিদেশে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সামর্থ্যও তার ছিল না। সে সময়কার ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার কথা স্মরণ করে তিনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিএনপির রাজনৈতিক সংকটের সময় দলের হয়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন রিপন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর দলের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা গ্রেপ্তার হলে তাকে প্রায় ১৬ মাস দলীয় মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা প্রতিকূলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলের জন্য ঝুঁকি নেওয়া, ব্যক্তিগত জীবন বিসর্জন দেওয়া এবং কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করাই ছিল তার রাজনৈতিক পথচলার অংশ।
রিপনের বক্তব্যে মনোনয়ন না পাওয়ার আক্ষেপ থাকলেও সহকর্মীর অসুস্থতার সময় নিজের স্বার্থে তদবির না করার সিদ্ধান্তের প্রতি দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তার মতে, রাজনীতিতে সাফল্য শুধু পদ কিংবা জনপ্রতিনিধি হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের নীতি ও নৈতিকতা ধরে রাখার মধ্যেও রাজনৈতিক কর্মীর সার্থকতা নিহিত।