বিজ্ঞাপন
অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের অভিযান, আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৭ পিএম
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় রেললাইনসংলগ্ন একটি বস্তিতে মাদক নিমূল অভিযানে অংশ নিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। মাদক কারবারে জড়িত সন্দেহে ছয়জনকে আটক করে পুলিশেও দিয়েছেন তিনি।
শনিবার নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে তার হাতে দেখা যায় পিস্তল। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। তবে প্রতিমন্ত্রী বলছেন, সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে তিনি অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন বলেন, মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার সংসদীয় আসনের গেন্ডারিয়ার রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর এলাকায় গিয়েছেন। এই জায়গাটি মাদকসেবীদের আখড়া।
শুধু তাই নয়; এখান থেকে আশপাশের ৪৬, ৪৭, ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডে এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের চালান যাচ্ছে। পুলিশকে জানানোর পরেও কাজের কাজ হয়নি।
পুলিশও ভয়ে সেখানে যেতে চায় না। কারণ গত ছয়-সাত মাসে সেখানে কমপক্ষে ছয়বার গুলির ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে বাধ্য হয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েই আমরা সেখানে গিয়েছি।
তিনি বলেন, পিস্তলটি আমার বৈধভাবে লাইসেন্স করা। সেটি আমার কোমরেই থাকে। যেহেতু এলাকাটি বিপজ্জনক, সে কারণে নিজের নিরাপত্তার জন্য ১০ সেকেন্ডের জন্য সেটি আমি উঁচিয়ে ধরেছি। কোনো ফায়ার করা হয়নি।’
ইশরাক বলেন, ওই এলাকায় আমার নেতৃত্বে সামাজিক অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশকে তা জানানো হয়েছে। সেখান থেকে অনেক মাদকদ্রব্য এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।’
গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রী ফোন করার পর পুলিশ সদস্যরা গিয়ে আটক ব্যক্তিদের থানায় নিয়ে আসেন। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে সাদা পাউডার জাতীয় পদার্থ পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে সেটি মাদক কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা বলছেন তারা।
এদিকে ইশরাকের হাতে পিস্তল দেখার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক নির্মূলে জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। মাদক কারবারের কারণে কোনো এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের পাশে দাঁড়ানো, অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা জনপ্রতিনিধির দায়িত্বশীল ভূমিকার অংশ। কিন্তু ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই আইন প্রয়োগের নির্ধারিত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা যায় না।তথ্য খুঁজুন
তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশের অস্ত্র আইন, ১৮৭৮-এর ১৩ ও ১৯ ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া বা লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন করে সশস্ত্র হয়ে চলাফেরা করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ঘটনায় অস্ত্রের লাইসেন্স ও ব্যবহারের পরিস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনাস্থলে ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল শিকদার। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, বেলা ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে তারা সেখানে যান। স্থানীয় লোকজনের বারবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশকেও জানানো হয়েছিল। তবে পুলিশ পৌঁছাতে দেরি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অপরাধ প্রতিরোধের অধিকার থাকলেও তা আইনসম্মত পদ্ধতিতে প্রয়োগ করতে হবে। একজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সহযোগিতা দেওয়া। আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, কাউকে লক্ষ্য করে অস্ত্র তাক করা কিংবা বলপ্রয়োগের বৈধতা নির্ভর করবে ঘটনার পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইনের ওপর। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনগত বৈধতা নির্ধারণ করা জরুরি।
তবে নাম প্রকাশ না করা শর্তে প্রসিকিউশনের এক আইনজীবী জানিয়েছেন, যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণও প্রতিরোধ করতে পারবে। তবে সেটি কতটুকু করা যাবে, তা সিআরপির ৫৯ ধারায় উল্লেখ রয়েছে।
সরকার ও মন্ত্রীদের কাজ হলো নির্দেশ দেওয়া, তারা সরাসরি অংশগ্রহণ বা রাগান্বিতভাবে ব্যবস্থা নিতে পারেন না। অস্ত্র বৈধ বা অবৈধ হোক, কারও দিকে তাক করাই অপরাধ। তল্লাশি করাও কোনো আইনের মধ্যে পড়ে না।
একই কথা বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। তার প্রশ্ন- মন্ত্রীকেই যদি অস্ত্র হাতে অভিযানে নামতে হয়, তাহলে পুলিশের কাজ কী? শরীফ ভূঁইয়া বললেন, একজন প্রতিমন্ত্রী যেভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন, তা বেআইনি।
একজন প্রতিমন্ত্রী বন্দুক হাতে রাস্তায় লোকজনকে ধাওয়া করছেন। মাই গড। তিনি আবার মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের। বন্দুক হাতে লোকজন ধাওয়া করা তার দায়িত্বের মধ্যে কীভাবে পড়ে?— নাবিলা ইদ্রিস, মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য
অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রীর এই অভিযানে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘একজন প্রতিমন্ত্রী বন্দুক হাতে রাস্তায় লোকজনকে ধাওয়া করছেন। মাই গড। তিনি আবার মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের। বন্দুক হাতে লোকজন ধাওয়া করা তার দায়িত্বের মধ্যে কীভাবে পড়ে?’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেছেন, কোনো এমপি বা মন্ত্রী এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে পারেন না। তাদের সেই ক্ষমতা নেই। অভিযান পরিচালনা করবে পুলিশ, এমপি-মন্ত্রীরা অভিযানের বিষয়ে নির্দেশনা বা পরিকল্পনা দিতে পারেন।
প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এই আইনজীবী বলেন, অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত থাকে। এ ধরনের অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শনের জন্য কাউকে লাইসেন্স দেওয়া হয় না।