বিজ্ঞাপন
ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা ফিরলে কি আবার মাঠে নামবে হাজারো নেতা-কর্মী
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৯ পিএম
বিজ্ঞাপন
ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সামনে আসতে পারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে কি হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী আবার প্রকাশ্যে মাঠে নামবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতার ইঙ্গিত এবং দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে ডিসেম্বরকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো দেশে ফেরার একটি নির্দিষ্ট সময়ের কথা জানান। তিনি বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলের অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। তিনি তাদেরও একসময় দেশে ফিরে একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন।
এরপর আগস্টেও শেখ হাসিনা ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। নয়াদিল্লিতে দেওয়া এক অডিও বক্তব্যে তিনি বলেন, গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা অন্য কোনো পরিণতির আশঙ্কা থাকলেও তিনি দেশে ফিরতে চান। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং দলটির রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিও জানান।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ গত দুই বছরে দলটির প্রকাশ্য সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সীমিত হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ এবং দলটির অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। ২০২৬ সালেও সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে সক্রিয় হওয়ার মনোভাব তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা বা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকা অনেক নেতা-কর্মী মনে করতে পারেন, দলের প্রধান দেশে ফিরেছেন, ফলে তাদেরও রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার সময় এসেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে শেখ হাসিনা ফিরলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসবেন। বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল।
আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। অনেকে গ্রেপ্তার বা আইনি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পর দলের সাধারণ নেতা-কর্মীদের একটি অংশ প্রকাশ্যে আসার পরিবর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। কেউ কেউ নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশ্য কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের একটি অংশ যদি মনে করে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা দলকে আবার সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় করার সুযোগ তৈরি করেছে, তাহলে তারা স্বাগত মিছিল, সমাবেশ, অবস্থান কর্মসূচি কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় আওয়ামী লীগের পুরনো সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী ছিল, সেখানে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মী-সমর্থকদের সমাগমের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
শেখ হাসিনা নিজেও জানিয়েছেন, তিনি আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসন নিয়ে অনলাইন বৈঠক করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিদেশে অবস্থান করেও তিনি দলীয় যোগাযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
তবে সবচেয়ে বড় বাধা হবে আইনি পরিস্থিতি। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফেরার পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। একটি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। শেখ হাসিনা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছেন।
এই আইনি পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জন্যও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে যদি বড় সংখ্যক নেতা-কর্মী দেশে ফেরেন, তাহলে তাদের অনেকের বিরুদ্ধেও থাকা মামলার কারণে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেখ হাসিনা একা ফিরবেন, নাকি তাঁর সঙ্গে আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতা দেশে ফিরবেন। রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, দলের কয়েকজন নেতা তাঁর সঙ্গে ফেরার পরিকল্পনা করছেন এবং আত্মসমর্পণের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। তবে ঠিক কতজন নেতা ফিরবেন, কারা ফিরবেন এবং তারা কখন ফিরবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
ফলে ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে তিন ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
প্রথমত, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগের একটি অংশ প্রকাশ্যে স্বাগত কর্মসূচি দিতে পারে। এতে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকির কারণে নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ প্রকাশ্যে না এসে নেপথ্যে সাংগঠনিক যোগাযোগ বাড়াতে পারে। এতে রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক বড় মিছিল দেখা না গেলেও দলটির পুনর্গঠনের চেষ্টা জোরদার হতে পারে।
তৃতীয়ত, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোও পাল্টা কর্মসূচিতে যেতে পারে। এতে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। রয়টার্সের আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ তখনও ভারতের কাছ থেকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে জবাবের অপেক্ষায় ছিল এবং ভারত জানিয়েছিল বিষয়টি তারা পর্যালোচনা করছে।
সব মিলিয়ে ডিসেম্বর শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে। তিনি সত্যিই দেশে ফিরলে সেটি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তন হবে না; একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান, নেতা-কর্মীদের সক্রিয়তা, সরকারের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।