বিজ্ঞাপন
একাত্তরের জন্য ক্ষমা, নেতৃত্বে পরিবর্তনসহ জামায়াতকে রাজ্জাকের ৫ পরামর্শ
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৩ এএম
বিজ্ঞাপন
‘জামায়াতে ইসলামীর ভবিষ্যৎ আপাতত অনিশ্চিত’—নিজের লেখা বইয়ে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান মূল্যায়ন করতে গিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থাকতে হলে আধুনিকায়ন ও সংস্কারের পাশাপাশি ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া, নেতৃত্বে পরিবর্তনসহ পাঁচটি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
২০২৫ সালের ৪ মে মৃত্যুর আগে ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইটি লিখে যান আবদুর রাজ্জাক। বইটি গত মাসে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) প্রকাশ করে। বইয়ের শেষ দিকে ‘জামায়াতের সামনে এগোনোর পথ ’ অধ্যায়ে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন তিনি।
আবদুর রাজ্জাকের মতে, ১৯৭১ সালের ভূমিকা এখনো জামায়াতের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে বড় প্রভাব ফেলছে। স্বাধীনতাসংগ্রামের বিরোধিতা এবং সে সময়ের কর্মকাণ্ডের জন্য দলটি পুরোপুরি জবাবদিহি করেনি—এমন ধারণা বহু মানুষের মধ্যে রয়েছে। তাঁর মতে, অতীতের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে জামায়াতের পক্ষে টেকসই রাজনৈতিক পুনরুত্থান কঠিন। এজন্য নিজেদের ইতিহাসের সঙ্গে সৎভাবে সম্পৃক্ত হয়ে দায় স্বীকার ও আত্মসমালোচনার পথে যেতে হবে।
দলের সাংগঠনিক কাঠামোকেও বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখেছেন আবদুর রাজ্জাক। তাঁর ভাষ্য, দ্রুত পরিবর্তনশীল বাংলাদেশে জামায়াত এখনো অনেকটাই পুরোনো ও রক্ষণশীল কাঠামোয় আটকে আছে। এতে তরুণদের সঙ্গে দলের দূরত্ব বাড়ছে। তরুণ কর্মীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পর্যাপ্ত সুযোগ না দেওয়া এবং নতুন চিন্তার প্রতি অনাগ্রহ দলটির ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
জামায়াতের ভাবমূর্তির সংকট নিয়েও বইয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার ও কয়েকজন নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দলটির ওপর রাজনৈতিক ও আবেগগত প্রভাব ফেলেছে বলে উল্লেখ করেন রাজ্জাক। একই সঙ্গে কঠোর রক্ষণশীল ও আধুনিকতার প্রতি অনাগ্রহী দল হিসেবে জামায়াতের যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তা শহুরে ও শিক্ষিত শ্রেণির একটি অংশকে দূরে রাখছে বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ।
দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় চাপ, গণমাধ্যমে প্রান্তিকতা ও আইনি চ্যালেঞ্জের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত অনেক সময় নিজেদের নিপীড়নের শিকার হিসেবে তুলে ধরেছে বলেও বইয়ে উল্লেখ করেছেন রাজ্জাক। তাঁর মতে, এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ও জাতীয় ইস্যুতে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
১৯৮৬ সালে জামায়াতে যোগ দেওয়া আবদুর রাজ্জাক ২০০৩ সালে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়ার প্রশ্নে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন।
বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠন সময়ের সঙ্গে নিজেদের পরিবর্তন করলেও জামায়াত পুরোনো বয়ান ও কৌশলে আটকে আছে বলে মনে করেন রাজ্জাক। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সময়ও দলটি রাজনৈতিকভাবে বড় সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। তরুণদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতে না পারাকে তিনি দলটির অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বইয়ের শেষাংশে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে জামায়াতকে পাঁচটি পরামর্শ দিয়েছেন আবদুর রাজ্জাক। এগুলো হলো—
১. অতীতের মুখোমুখি হওয়া: ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া এবং জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেওয়া।
২. নেতৃত্বের আধুনিকায়ন: তরুণ ও সংস্কারপন্থীদের নেতৃত্বে আনা এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো।
৩. রাজনৈতিক কর্মসূচির বৈচিত্র্য আনা: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া।
৪. তরুণদের সম্পৃক্ত করা: তরুণদের আকৃষ্ট করতে সময়োপযোগী রাজনৈতিক বয়ান ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
৫. আস্থা পুনর্গঠন: নাগরিক সমাজের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং জাতীয় ইস্যুতে উন্মুক্ত ও গঠনমূলক সংলাপে অংশ নেওয়া।