বিজ্ঞাপন
‘স্বশিক্ষিত’ শামীম সাঈদী এখন এইচএসসি পাস
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
বিজ্ঞাপন
যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তিনি নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরে লিখেছিলেন ‘স্বশিক্ষিত’। ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে দাখিল করা সেই হলফনামায় অন্য কোনো তথ্য ছিল না।
সাত বছর পর, ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর দাখিল করা নতুন হলফনামায় সেই পরিচয় বদলে যায়।
সেখানে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করা হয়েছে এইচএসসি। এই পরিবর্তন কিভাবে এলো, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এমনকি সনদের কপি নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও পাওয়া যায়নি।
তবে ফেসবুকে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য হিসেবে মাতুয়াইল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা সিটি কলেজ ও দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করেছেন শামীম সাঈদী।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত সক্রিয় তিনি। তার ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইলে অনুসারীর সংখ্যা প্রায় দুই লাখ ৭৯ হাজার। তিনি সাঈদী ফাউন্ডেশনের সভাপতি।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন শামীম সাঈদী।
এয়োদশ নির্বাচনে এবার পিরোজপুর-২ আসন থেকে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে। তবে দুই নির্বাচনের হলফনামা পাশাপাশি রাখলে একাধিক তথ্যের অমিল ও পরিবর্তন চোখে পড়ে।
মামলা থেকে অব্যাহতি
২০১৮ সালের হলফনামায় নিজের বিরুদ্ধে থাকা ১০টি মামলার তথ্য দিয়েছিলেন শামীম সাঈদী। এর মধ্যে ছয়টি মামলা উচ্চ আদালতে স্থগিত ছিল।
বাকি চারটি মামলার অভিযোগপত্র গঠন শুনানির অপেক্ষায় ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
এয়োদশ নির্বাচনের হলফনামায় তিনি দাবি করেছেন, ওই ১০টি মামলার অধিকাংশ থেকেই তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা সরকারের পতনের পর’ এসব মামলায় তিনি মুক্তি পান। তবে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের একটি মামলা এখনও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে, যা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত।
আয় বাড়ল, ব্যাখ্যা নেই
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী শামীম সাঈদীর আয়ের পরিমাণ ছিল সীমিত। এপার্টমেন্ট ভাড়া থেকে তাঁর বার্ষিক আয় ছিল এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। ব্যবসা থেকে আয় দেখানো হয়েছিল দুই লাখ ২০ হাজার টাকা। পাশাপাশি ব্যাংকের এফডিআর থেকে আয় ছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা।
সাত বছর পর দাখিল করা নতুন হলফনামায় আয়ের চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। এপার্টমেন্ট ভাড়া থেকে আয় সামান্য বেড়ে এক লাখ ৮৬ হাজার টাকায় দাঁড়ালেও ব্যবসা থেকে আয় বেড়ে হয়েছে আট লাখ ২০ হাজার টাকা। হিসাব বলছে, সাত বছর ব্যবধানে তাঁর ব্যবসায়িক আয় প্রায় চার গুণ বেড়েছে। তবে হলফনামায় ব্যবসার ধরন, বিস্তার বা এই আয় বৃদ্ধির উৎস সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই।
সাত বছরে সম্পদের ছড়াছড়ি
২০১৮ সালের হলফনামায় অস্থাবর সম্পদের হিসাব ছিল তুলনামূলকভাবে কম। সেখানে নগদ অর্থ দেখানো হয়েছিল চার লাখ ৯০ হাজার টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী আমানত ছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা। একটি গাড়ির কথা উল্লেখ থাকলেও তার মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি ৩০ তোলা সোনার কথা বলা হয়েছিল, যার মূল্য দেখানো হয় তিন লাখ টাকা।
২০২৫ সালের হলফনামায় অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেখানে শামীম সাঈদীর নগদ অর্থ দেখানো হয়েছে পাঁচ লাখ ১৩ হাজার টাকা। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তাঁর গৃহিনী স্ত্রী সুলতানা শামীম সাঈদীর। স্ত্রীর নামে নগদ অর্থ দেখানো হয়েছে ২৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। কোনো উৎস থেকে অর্থ হঠাৎ এসেছে তার কোনো তথ্যও নেই।
ব্যাংক হিসাবে শামীম সাঈদীর নামে ইসলামী ও সিটি ব্যাংকে জমা রয়েছে প্রায় ৪৪ লাখ টাকা। তাঁর স্ত্রীর নামে ইসলামী ব্যাংকে জমা রয়েছে পাঁচ লাখ ২১ হাজার টাকা। স্থায়ী আমানতের ক্ষেত্রে শামীম সাঈদীর নামে রয়েছে ১১ লাখ ১৯ হাজার টাকা, আর স্ত্রীর নামে এক লাখ টাকা। এছাড়া ১৪ লাখ টাকা মূল্যের একটি মোটরযান। তিন লাখ টাকা মূল্যের সোনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও সোনার পরিমাণ লেখা নেই।
সব মিলিয়ে হলফনামা অনুযায়ী শামীম সাঈদীর নামে অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭৭ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রীর নামে প্রায় ৩২ লাখ টাকা।
ফ্ল্যাটের মূল্য স্থির
একাদশ নির্বাচনের সময় স্থাবর সম্পদের তালিকায় ছিল ২৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা মূল্যের দুটি ফ্ল্যাট। পাশাপাশি যৌথ মালিকানায় থাকা আরেকটি ফ্ল্যাটের এক-পঞ্চমাংশের মূল্য দেখানো হয়েছিল পাঁচ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।
সাত বছর পরের হলফনামায় মিরপুর ও খিলগাঁও এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অর্জনকালীন ও বর্তমান উভয় সময়েই দুটি ফ্ল্যাটের মূল্য ১৮ লাখ টাকা। ঢাকার আবাসন বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে দামের ওঠানামার প্রেক্ষাপটে এই মূল্য অপরিবর্তিত থাকার বিষয়টিও প্রশ্ন তৈরি করছে।
ব্যাংক ঋণ শোধ, ব্যক্তিগত ঋণ সামান্য বেড়েছে
দায়সমূহের হিসাবে একাদশ নির্বাচনের সময় ইসলামী ব্যাংকের ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ এবং ব্যক্তিগত চার লাখ ৯০ হাজার টাকা ঋণের কথা বলা হয়েছিল। সাত বছরে ব্যাংক ঋণ শোধ হলেও ব্যক্তিগত ঋণ ১০ হাজার টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ টাকায়।
শামীম সাঈদী ও তাঁর স্ত্রীর নামে আয়কর নথি রয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে শামীম সাঈদী আয়কর রিটার্নে ৯০ লাখ আট হাজার টাকার সম্পদ দেখিয়ে বার্ষিক আয় উল্লেখ করেছেন আট লাখ ২০ হাজার টাকা। একই অর্থবছরে তার স্ত্রী ৩৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকার সম্পদের বিপরীতে বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন চার লাখ টাকা। নারীদের জন্য নির্ধারিত আয়কর সীমা সাড়ে চার লাখ টাকা হওয়ায় তাকে কর দিতে হয়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন বরিশালের সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিবর্তন, মামলার অবস্থান, আয় ও সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি শামীম সাঈদীর হলফনামা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আইন অনুযায়ী হলফনামায় মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ঘটনা খুবই বিরল।
বিজ্ঞাপন