এনসিপিতে বড় ভাঙন, ১৪ কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগ
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম
নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বর্তমানে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দলটির ভেতরে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বসহ সারাদেশে একের পর এক নেতার পদত্যাগ চলছে। সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা এনসিপির সব ধরনের পদ-পদবি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
এছাড়া দলের প্রধান নাহিদ ইসলামের হলফনামায় দেখানো আয় নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিপি থেকে শীর্ষ নেতাদের চলে যাওয়া কিংবা পদত্যাগ, দলটির জন্য বিরাট ক্ষতি। যেসব শীর্ষ নেতা দলে রয়েছেন, তারাও কেন ব্যর্থ হচ্ছেন দল থেকে পদত্যাগকারীদের ঠেকাতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দল গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই এমন ব্যাপক ভাঙন এনসিপির জন্য মারাত্মক ধাক্কা। দলটির শীর্ষ নেতারা কেন এই সংকট সামাল দিতে পারছেন না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
জামায়াতের সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতার ঘোষণার পর থেকেই এনসিপির ভেতরে মতবিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। দলের একাংশ এই সিদ্ধান্তকে আদর্শবিরোধী ও রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী বলে মনে করছেন। এর জেরে অনেক কেন্দ্রীয় নেতা শুধু পদত্যাগই করছেন না, কেউ কেউ নির্বাচনি কার্যক্রম থেকেও সরে দাঁড়াচ্ছেন। আবার যারা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেননি, তাদের একটি বড় অংশ দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে এনসিপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মুখপাত্র, যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন পদত্যাগ করেন। তিনি একই সঙ্গে পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ উইংয়ের কো-লিডের দায়িত্বেও ছিলেন। একই দিনে পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন।
এর আগে ১ জানুয়ারি রাতে দল ছাড়ার ঘোষণা দেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ উইংয়ের প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ। তিনি এনসিপির নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন। তার স্ত্রী ডা. তাসনিম জারা ইতোমধ্যেই ২৮ ডিসেম্বর দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং বর্তমানে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
এনসিপির ভেতরের সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মুশফিক উস সালেহীন বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত দলের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার ভাষায়, এনসিপি যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলেছিল, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে গেছে এবং দলটি পুরোনো ধারার রাজনীতিতেই ঢুকে পড়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে তারা ভিন্ন কিছু প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু একের পর এক পরিচিত মুখের বিদায়ে তারা হতাশ হচ্ছেন।
এদিকে শহীদ পরিবারের আরেক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এনসিপির ভাঙন জুলাই আন্দোলনের পক্ষের মানুষদের প্রত্যাশাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি এনসিপির কাছ থেকেও তারা কার্যকর সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দলের ভেতরের একাধিক সূত্র জানায়, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ‘বিশেষ’ দুই ব্যক্তির মতামতই প্রাধান্য পেয়েছে। অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতাকে উপেক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে অনেকেই দল ছাড়ছেন।
বর্তমানে যেসব কেন্দ্রীয় নেতা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন—ডা. তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, ফারহাদ আলম ভূঁইয়া, আরিফ সোহেল, আজাদ খান ভাসানী, আসিফ নেহাল, মীর হাবিব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, মীর আরশাদুল হক, খালেদ সাইফুল্লাহ, খান মো. মুরসালীন, মুশফিক উস সালেহীন, ওয়াহিদুজ্জামান ও আল আমিন টুটুল।
এ বিষয়ে আগে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দলে থাকা বা নির্বাচন করা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে তার এই বক্তব্যের পরপরই দল ছাড়ার প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।