চরমোনাইকে ছেড়ে দেওয়া আসনেও জামায়াতের প্রার্থী
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৪ এএম
প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরও জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলনের জোট হবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এলডিপি, খেলাফত মজলিস, বিডিপির জন্য ২৪টি আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। তবে ইসলামী আন্দোলনের জন্য কোনো আসন খালি রাখেনি।
যেসব আন চরমোনাইকে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত, সেখানেও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আবার ইসলামী আন্দোলন যেসব আসন জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেখানেও মনোনয়ন জমা দিয়েছেন হাতপাখার প্রার্থীরা। নির্বাচন কমিশনের প্রার্থি তালিকা এবং দল দুটির সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জামায়াত ২৭৬ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী দিয়েছে ২৬৮ আসনে। এনসিপি, এবি, এলডিপিকে জামায়াতের ছেড়ে দেওয়া আসনে রয়েছে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী। জামায়াত এখন পর্যন্ত হাতপাখাকে ৩১ আসন ছাড়তে সম্মত হলেও দলটি জোটে থাকতে অন্তত ৭৫ আসনে নির্বাচন করতে চায়। এনসিপির মতো নতুন দলকে ‘বেশি গুরুত্ব দিয়ে’ ৩০ আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তেও ক্ষুব্ধ চরমোনাই পীরের দল।
যদিও দুই দলের নেতারা বলছেন, আসন সমঝোতা বা জোট গঠন নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। আলোচনা চলছে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আগে সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে দুটি দলের নেতারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেছেন, জোট হবে কিনা তা নিশ্চিত নয়।
গত মে মাসে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম পার্টি এবং খেলাফত আন্দোলন মিলে নির্বাচনী মোর্চা গঠনের প্রচেষ্টা শুরু হয়। তবে এই উদ্যোগ থেকে বেরিয়ে জমিয়ত চলে যায় বিএনপি জোটে।
ইসলামপন্থিদের ভোট এক প্রতীকে আনার উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার কথা বলে গত সেপ্টেম্বরে জামায়াত এতে যোগ দেয়। যুক্ত হয় জাগপা এবং বিডিপি। এই আট দল মিলে নির্বাচনের আগে গণভোটসহ পাঁচ দাবিতে বিভাগীয় সমাবেশসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে। গত ৮ ডিসেম্বর আট দলের আসন সমঝোতা শুরু হয়। কয়েক দিনের টানাপোড়েনের পরও আলোচনায় আসন বণ্টন অনেকটা গুছিয়ে আনে দলগুলো। তবে ২৮ ডিসেম্বর এই আলোচনায় এনসিপি, এবি, এলডিপি যুক্ত হওয়ার পর ফের টানাপোড়েন শুরু হয়। জামায়াতের জোট এই তিনটি দলকে ৪০টি আসন ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে। তবে ইসলামী আন্দোলন চায়, ছাড় দিতে হবে ২০০ আসনে নির্বাচন করতে চাওয়া জামায়াতকে।
এনসিপি এবং অন্যদের ছাড়
জামায়াত যে ২৪ আসনে প্রার্থী দেয়নি, এর অধিকাংশ এনসিপির জন্য ছাড়া হয়েছে। জামায়াত জোট গঠনের সময় জানিয়েছিল, রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের একটিও ছাড়বে না। তবে চব্বিশের অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের গঠিত এনসিপির জন্য এই বিভাগে দুটি আসনে প্রার্থী দেয়নি। এর একটি এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনের রংপুর-৪। অন্যটি যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদের কুড়িগ্রাম-২। এই দুটি আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থান। তবে দুটি আসনেই এনসিপির বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। জামায়াতের প্রার্থীও এ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, এ আসন ছেড়ে দেওয়া হবে এনসিপিকে। এ আসনেও হাতপাখার প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
এনসিপির আরেক মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর জন্য কুমিল্লা-৪ আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের জন্য ঢাকা-১৮, মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর জন্য ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থী দেয়নি। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনেও এনসিপির জন্য মনোনায়নপত্র জমা দেননি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আবদুল জব্বার। এ চারটি আসনে ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী দিয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফতের আমির মাওলানা মামুনুল হকের জন্য ঢাকা-১৩, দলটির যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিনের জন্য কিশোরগঞ্জ-৬, খেলাফতের আরেক অংশের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদেরের জন্য হবিগঞ্জ-৪, দলটির সিরাজুল হক মামুনের জন্য নারায়ণগঞ্জ-৫, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর জন্য ফেনী-২, দলটির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ফুয়াদের জন্য বরিশাল-৩, এলডিপির প্রেসিডেন্টে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুকের জন্য চট্টগ্রাম-১৪, বিডিপির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলামের জন্য ময়মনসিংহ-৯ আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত।
হাতপাখার জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধেও প্রার্থী
জোটের অন্য দলগুলোর জন্য ২৪টি আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। তবে ইসলামী আন্দোলনকে দেওয়া প্রতিশ্রুত আসনে দাঁড়িপাল্লা রয়েছে। চরমোনাই পীরের ভাই এবং দলের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ এবং ৬ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। দুটি আসনে জামায়াতের প্রার্থী রয়েছে।
পীরের অন্য দুই ভাই সৈয়দ ইসাহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের বরিশাল-৪ এবং দলের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী ঢাকা-৪ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনুস আহমদ শেখ খুলনা আসনে প্রার্থী হয়েছেন। এই তিনটি আসনের দুটি ছেড়ে দিতে জামায়াত সম্মত হলেও সব জায়গায় জামায়াত প্রার্থী দিয়েছে।
জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে হাতপাখার প্রার্থী
ইসলামী আন্দোলন জামায়াতের সব জ্যেষ্ঠ নেতার বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ এবং নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান রাজশাহী-১ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। এই দুটি আসনে ইসলামী আন্দোলনসহ জোটের শরিক দলগুলো প্রার্থী দেয়নি।
সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫, নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম রংপুর-২, ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের কুমিল্লা-১১, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলদের মধ্যে রফিকুল ইসলাম খান সিরাজগঞ্জ-৪, হামিদুর রহমান আযাদ কক্সবাজার-২ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। তাদের আসনে প্রার্থী দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন।
এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত, খেলাফত মজলিসসহ অন্যান্য শরিক দলের শীর্ষ নেতাদের আসনে রয়েছে হাতপাখার প্রার্থী।
আসন বণ্টন এখনও অস্পষ্ট
কোন দলের প্রার্থী কোন আসনে জোটের সমর্থনে নির্বাচন করবেন, তাও খোলাসা করছে না জামায়াত জোটের কোনো দল। এনসিপিকে ৩০ আসন ছেড়েছে জামায়াত। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রায় সবাই এই তালিকায় রয়েছেন। তবে সেগুলো কোন কোন আসন তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
জামায়াতের হিসাব অনুযায়ী, ২৪৮ আসনে সমঝোতা হয়েছে। বাকি ৫২ আসনে জরিপ করে প্রার্থী ঠিক করার প্রস্তাব করেছে। ২৪৮ আসনের মধ্যে ১৭১টি জামায়াত নিজের জন্য রেখেছে। বাকি ৭৭ আসন শরিকদের ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত করেছে। জরিপের জন্য রাখা ৫২ আসনের অধিকাংশে জামায়াত দলীয় প্রার্থী দিতে চায়। তবে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এই প্রস্তাব মানেনি।
জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, এলডিপিকে সাতটি এবং এবি পার্টিকে তিনটি আসন ছাড়া হবে। এলডিপি মেনে নিলেও এবি পার্টি আরও বেশি আসন চায়। তাই দলটি জোটের ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে দিচ্ছে না। ৫৩ আসনে প্রার্থী দিয়েছে দলটি। এলডিপি প্রার্থী দিয়েছে ২৪ আসনে।
জামায়াতের হিসাবে সমঝোতা হওয়া ২৪৮ আসনের মধ্যে ইসলামী আন্দোলনকে ৩১ এবং বাংলাদেশ খেলাফতকে ১৩টি আসন ছাড়ার কথা জানাচ্ছেন দলটির নেতারা। ইসলামী আন্দোলনের মতো মামুনুল হকের দলও তা মানেনি। দলটি রিকশা প্রতীকে ৯৪ আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
কী বলছেন নেতারা
সামাজিক মাধ্যমে জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলনের পুরোনো বাহাস শুরু হয়েছে আসন বণ্টনের জটিলতা সামনে আসার পর। দলটির নেতারাও একে অন্যের প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলছেন। জামায়াতের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছেন, জোট ভেঙে গেলে এই দায় জামায়াতের নয়। ইসলামী আন্দোলন যেভাবে ৭৫ আসন দাবি করছে, তা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই জোট ভাঙলে, দায় তাদের।
আসন সমঝোতার সমন্বয়ক এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় রয়েছে। এর আগে সমঝোতা হয়ে যাবে। কোনো সমস্যা থাকবে না। ৩০০ আসনে জোটের একক প্রার্থী থাকবে।
যদিও ইসলামী আন্দোলনের একাধিক নেতা জামায়াতকে দায়ী করে বলেছেন, তারা জোট নিয়ে আশাবাদী নন। বিএনপি তার জোট শরিকদের যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, জামায়াতও তাই করতে চাইছে। তবে জামায়াত এত বড় শক্তি নয়, যা তারা বুঝতে পারছে না। ইসলামী আন্দোলন প্রত্যাশিত সংখ্যার আসন ছাড়া জোটে থাকবে না।
তবে ফয়জুল করীম বলেছেন, জোট ভেঙে যাওয়ার কোনো শঙ্কা নেই। আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে। শিগগির সমাধান হয়ে যাবে।
ইসলামী আন্দোলন কত আসন চায়– প্রশ্নে তিনি বলেছেন, ‘আমরা কখনও বলিনি, ১০০ আসন দিতে হবে। জামায়াতও এমন কিছু বলেনি।’ সূত্র: সমকাল