বিজ্ঞাপন
মাহি ফেরদৌস জলিলের বক্তব্য: অপ্রিয় সত্য, নাকি অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক?
ভাষার অসংযমের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে কি কিছু জরুরি প্রশ্ন?
ড. আজিজুল আম্বিয়া
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৫ এএম
বিজ্ঞাপন
কখনো কখনো একটি বক্তব্য সমাজের দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসংগতি, অস্বস্তি ও অপ্রকাশিত সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে বক্তব্যের ভাষা, বক্তার ব্যক্তিগত পরিচয় কিংবা তাঁর অতীত। অথচ যে প্রশ্নগুলো সমাজের আয়নায় নিজেদের মুখোমুখি দাঁড় করানোর কথা, সেগুলোই আড়ালে পড়ে যায়। চ্যানেল এস টেলিভিশনের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান মাহি ফেরদৌস জলিলের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ঘিরে ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটিতে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, আমার কাছে বিষয়টি অনেকটা তেমনই।
তাঁর বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ বা প্রতিটি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং কিছু ক্ষেত্রে তাঁর ভাষা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত, আপত্তিকর এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সংযমের পরিপন্থী। বিশেষ করে সাংবাদিক সমাজ সম্পর্কে তিনি যে ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল ও সম্মানজনক পেশা। এই পেশার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তির অনৈতিক আচরণ থাকতে পারে, কারও বিরুদ্ধে স্বার্থসংশ্লিষ্টতা কিংবা পেশাগত অসততার অভিযোগও উঠতে পারে। কিন্তু সেই দায় সমগ্র সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।
তাই মাহি ফেরদৌস জলিলের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, সাংবাদিকদের সম্পর্কে ব্যবহৃত আপত্তিকর শব্দগুলো তিনি প্রত্যাহার করুন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভাষার দায়িত্বশীল ব্যবহারও সমান জরুরি।
কিন্তু এখানেই কি আলোচনা শেষ? তাঁর বক্তব্যের ভাষা নিয়ে প্রতিবাদ হবে, অথচ বক্তব্যের অন্তর্নিহিত প্রশ্নগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না? একজন বক্তার শব্দচয়ন ভুল হতে পারে, কিন্তু তাই বলে তাঁর উত্থাপিত প্রতিটি প্রশ্নও কি ভুল হয়ে যায়?
আমার মনে হয়, এখানেই আমাদের একটু থেমে ভাবা প্রয়োজন।
অ্যাওয়ার্ড, সম্মাননা নাকি সম্মান বিক্রির প্রতিযোগিতা?
ব্রিটেনে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে অ্যাওয়ার্ড আয়োজনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সম্মাননা প্রদান নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। যাঁরা সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ব্যবসা, সাংবাদিকতা কিংবা মানবসেবায় অসামান্য অবদান রাখেন, তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়া সভ্য সমাজের সুন্দর ঐতিহ্য।
কিন্তু সেই স্বীকৃতি যদি যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সম্মাননার প্রকৃত মর্যাদাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের কমিউনিটিতে এমন কিছু আয়োজনের অভিযোগ রয়েছে, যেখানে অর্থ ব্যয়, পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগ পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যাঁরা অ্যাওয়ার্ড আয়োজন করছেন, তাঁদের অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, স্বচ্ছতা কিংবা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, যাঁরা পুরস্কার গ্রহণ করছেন, তাঁদের প্রত্যেকের অবদানও যে সেই সম্মাননার সমানুপাতিক, তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন হলো, সম্মাননা কি মানুষের অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য, নাকি অর্থের বিনিময়ে সামাজিক পরিচিতি ও মর্যাদা কেনার একটি মাধ্যম হয়ে উঠছে?
সম্মাননা তখনই সম্মানের মর্যাদা পায়, যখন তার পেছনে থাকে স্বচ্ছ নির্বাচনপ্রক্রিয়া, নিরপেক্ষ বিচারক এবং গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান। অন্যথায় মঞ্চ, আলোকসজ্জা, ট্রফি আর ক্যামেরার ঝলকানি দিয়ে সাময়িক প্রচার পাওয়া গেলেও প্রকৃত সম্মান অর্জন করা যায় না।
১২ হাজার রেস্টুরেন্টের রহস্য: পরিসংখ্যান কোথায়?
ব্রিটেনের বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট শিল্প আমাদের কমিউনিটির অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছি। দীর্ঘ এই সময়ে একটি পরিসংখ্যান বারবার শুনে আসছি, ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের পরিচালিত রেস্টুরেন্টের সংখ্যা ১২ হাজার।
ব্রিটিশ কারি অ্যাওয়ার্ড, বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন, এশিয়ান কারি অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছে। সাংবাদিক সৈয়দ নাহাস পাশার উদ্যোগে আয়োজিত অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানেও এই সংখ্যা উল্লেখ করতে শুনেছি। প্রায় প্রতিটি আয়োজনেই বলা হয়, এই শিল্পে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
পরিসংখ্যানটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমার প্রশ্ন, এই ১২ হাজার সংখ্যার নির্ভরযোগ্য উৎস কী?
গত তিন দশকে ব্রিটেনে অসংখ্য রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়েছে, আবার নতুন অসংখ্য রেস্টুরেন্ট চালু হয়েছে। ব্যবসার ধরন বদলেছে, মালিকানা বদলেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান অন্য কমিউনিটির মানুষের হাতে চলে গেছে। অথচ বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের সংখ্যা সেই ১২ হাজারেই স্থির!
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত তথ্যের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে হিসাবের অসংগতি তৈরি হয়। প্রচলিত বিভিন্ন পরিসংখ্যানকে একত্র করে হিসাব করলে সংখ্যাটি ৬০ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছানোর মতো বিভ্রান্তিও তৈরি হতে পারে। তবে এটি কোনো যাচাইকৃত পরিসংখ্যান নয়, বরং তথ্যের অসংগতি বোঝানোর একটি উদাহরণ।
আমাদের প্রয়োজন আবেগনির্ভর সংখ্যা নয়, প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক পরিসংখ্যান। যুক্তরাজ্যে প্রকৃতপক্ষে কতটি বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্ট রয়েছে, কতজন মানুষ এই শিল্পে কর্মরত এবং কত পরিবার এর ওপর নির্ভরশীল, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে নিরূপণ করা জরুরি।
অ্যাওয়ার্ডের আলোকসজ্জা আছে, শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা কোথায়?
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। ব্রিটিশ কারি শিল্পকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর বড় বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করছে। এসব অনুষ্ঠানের আলোকসজ্জা, ভেন্যু, প্রচার, অতিথি আপ্যায়ন ও আয়োজনের পেছনে হাজার হাজার পাউন্ড ব্যয় হয়। এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিপুল আয়োজনের পাশাপাশি শিল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা বাস্তব কাজ হচ্ছে?
আজ ব্রিটেনের অনেক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট মালিকের সন্তান এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। নতুন প্রজন্মের অনেকেই কারি শিল্পকে ভবিষ্যৎ পেশা হিসেবে দেখতে চায় না। ফলে দক্ষ শেফ, অভিজ্ঞ কর্মী এবং নতুন নেতৃত্বের সংকট ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তাহলে অ্যাওয়ার্ড আয়োজনের বাজেটের একটি অংশ কি দক্ষ শেফ তৈরির প্রশিক্ষণ, তরুণদের কর্মমুখী শিক্ষা এবং নতুন কর্মী তৈরির কাজে ব্যয় করা যায় না?
একটি শিল্পের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হয় না। উন্নয়ন হয় দক্ষ জনশক্তি তৈরি, শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত, কর্মপরিবেশ উন্নত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই পেশায় আগ্রহী করে তোলার মাধ্যমে।
আরও একটি বিষয় আমাকে ভাবায়। বছরে দুটি ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। অথচ এই দুটি দিনেও অনেক রেস্টুরেন্ট কর্মীকে ছুটি দেওয়া হয় না। যাঁরা সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখেন, তাঁদের ধর্মীয় ও পারিবারিক আনন্দের অধিকার কি বিবেচনার দাবি রাখে না?
অবশ্যই প্রতিটি ব্যবসার বাস্তবতা ও কর্মীদের চুক্তিগত বিষয় বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ঈদের ছুটি, বিকল্প ছুটি কিংবা ন্যায্য কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া অসম্ভব নয়।
আমরা যদি সত্যিই ব্রিটিশ কারি শিল্পকে ভালোবাসি, তাহলে শুধু ব্যবসার সাফল্য উদ্যাপন করলেই চলবে না, এই শিল্পের শ্রমিকদের জীবনমান নিয়েও ভাবতে হবে।
একটি শিল্পের শক্তি তার মালিকদের সম্পদে নয়, তার কর্মীদের দক্ষতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তায়ও পরিমাপ করা হয়।
সংগঠন, নেতৃত্ব ও অ্যাওয়ার্ডের স্বচ্ছতা
আরেকটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের কমিউনিটিতে বিভিন্ন নামে অসংখ্য সংগঠন গড়ে উঠছে। নতুন কমিটি হচ্ছে, নতুন নেতৃত্ব আসছে, অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ? পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে কতটা নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হচ্ছে?
কোনো সংগঠন যদি শুধু নিজেদের পছন্দের মানুষদের নিয়ে কমিটি গঠন করে, পরিচিত মহলের মধ্যে সম্মাননা বিতরণ করে এবং অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে প্রকৃত যোগ্য নেতৃত্ব সামনে আসবে কীভাবে?
সাংবাদিক সংগঠনসহ সব সামাজিক ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। সংগঠনের উদ্দেশ্য কি ব্যক্তিগত পরিচিতি বাড়ানো, নাকি বৃহত্তর কমিউনিটির কল্যাণে কাজ করা?
নেতৃত্বের মূল্যায়ন হওয়া উচিত কাজের মাধ্যমে, পদবির মাধ্যমে নয়। সম্মাননা পাওয়া উচিত অবদানের ভিত্তিতে, অর্থের ভিত্তিতে নয়। আর সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হওয়া উচিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে।
সিলেটি সমাজের অবদান এবং বিতর্কিত মন্তব্য
মাহি ফেরদৌস জলিল তাঁর বক্তব্যে সিলেটি সমাজ নিয়েও একটি বিতর্কিত উদাহরণ দিয়েছেন, যা অনেকের কাছে আপত্তিকর ও অসম্মানজনক মনে হয়েছে। এ বিষয়ে তাঁর শব্দচয়ন নিয়ে আপত্তি থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
তবে সিলেটি সমাজের অবদানকে একটি বিতর্কিত মন্তব্যের আলোকে বিচার করাও ঠিক হবে না। ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটির ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক অগ্রগতিতে সিলেটিদের অবদান অনস্বীকার্য।
ব্রিটেনের সাবেক হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী, সংসদ সদস্য রুশনারা আলী ও টিউলিপ সিদ্দিক এবং টাওয়ার হ্যামলেটসের বর্তমান নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান ও কাউন্সিলের স্পিকার মুস্তাক আহমদের মতো ব্যক্তিত্ব এই কমিউনিটির পরিচিত মুখ। তাঁদের অর্জন আমাদের প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা।
সিলেটি সমাজ শুধু অভিবাসনের ইতিহাস রচনা করেনি, ব্রিটিশ সমাজের রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা ও সংস্কৃতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সুতরাং কোনো ব্যক্তির বিতর্কিত মন্তব্য দিয়ে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মর্যাদা নির্ধারণ করা যায় না।
এখানে বক্তার উদ্দেশ্য এবং ব্যবহৃত ভাষার মধ্যে পার্থক্যটি বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। কোনো বক্তব্যের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, কিন্তু তাতে আপত্তিকর শব্দের দায় মুছে যায় না।
রিফর্ম পার্টি ও বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রশ্ন
মাহি ফেরদৌস জলিল রিফর্ম পার্টির বিভিন্ন নীতি এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতি তাদের অবস্থান নিয়েও সমালোচনা করেছেন। ব্রিটেনের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অভিবাসী ও সংখ্যালঘু কমিউনিটির অধিকার, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা তার নেতাদের বক্তব্য ও নীতির সমালোচনা করা নাগরিক অধিকার। তবে সেই সমালোচনাও হওয়া উচিত তথ্য, যুক্তি ও বাস্তবতার ভিত্তিতে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন ব্যক্তিগত বিদ্বেষে পরিণত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিবাদের পাশাপাশি আত্মসমালোচনাও প্রয়োজন
মাহি ফেরদৌস জলিলের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ প্রেসক্লাবসহ সাংবাদিক সংগঠনগুলো। তাঁদের প্রতিবাদ জানানোর অধিকার রয়েছে। পেশার মর্যাদা ও সাংবাদিকদের আত্মসম্মান রক্ষায় সংগঠনগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রতিবাদ শুধু প্রতিক্রিয়ার নাম নয়, আত্মসমালোচনারও একটি সুযোগ। সাংবাদিকতার নামে কেউ যদি ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করেন, অর্থের বিনিময়ে প্রচার কিংবা সম্মাননার ব্যবস্থা করেন, তাহলে সেই প্রবণতার বিরুদ্ধেও সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সোচ্চার হতে হবে।
একইভাবে, সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচন, অ্যাওয়ার্ড প্রদান এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। নিজের ঘরের অসংগতি নিয়ে কথা না বলে শুধু বাইরের সমালোচনার প্রতিবাদ করলে মানুষের আস্থা অর্জন কঠিন।
সমাজের প্রতিটি পেশার মতো সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও আত্মশুদ্ধি জরুরি। কারণ সাংবাদিকতার শক্তি তার কণ্ঠের উচ্চতায় নয়, তার সত্যনিষ্ঠা ও বিশ্বাসযোগ্যতায়।
মানুষকে বিচার করার আগে তাঁর কাজও বিবেচনা করা উচিত
মাহি ফেরদৌস জলিলের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তাঁর বিরুদ্ধে কারও অভিযোগ থাকলে তারও যথাযথ জবাব ও ন্যায়সংগত পর্যালোচনা হওয়া উচিত। কেউ সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু একটি বক্তব্য কিংবা একটি বিতর্কের কারণে কোনো ব্যক্তির দীর্ঘদিনের অবদান সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও ন্যায়সংগত নয়।
ব্রিটেনে যখন ভালো মানের বাংলা টেলিভিশন সম্প্রচারের সুযোগ সীমিত ছিল, তখন চ্যানেল এসের মাধ্যমে মাহি ফেরদৌস জলিল ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির সংবাদ, সংস্কৃতি, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও নানা অর্জন তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে কমিউনিটির মানুষের কাছে বাংলা টেলিভিশন পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা আলোচনার দাবি রাখে।
এ ছাড়া সম্প্রতি অনলাইন অনুষ্ঠান ‘দ্য সানরাইজ টুডে’-তে তিনি ভাষাগত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলেও জানা গেছে। ভুল স্বীকার করা এবং দুঃখ প্রকাশ করা দায়িত্বশীল আচরণের অংশ। তাঁর এই অবস্থানকেও আলোচনায় রাখা উচিত।
তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেগুলো তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিবেচিত হোক। তাঁর বক্তব্যে ভুল থাকলে তার সমালোচনা হোক। আবার তাঁর কোনো বক্তব্যে সত্য ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এলে সেটিও গুরুত্ব পাক।
কারণ, মানুষকে শুধু তাঁর ভুল দিয়ে বিচার করলে তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় জানা হয় না। একইভাবে, কারও অবদান আছে বলে তাঁর ভুলও উপেক্ষা করা যায় না।
শেষ কথা: ব্যক্তি নয়, প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজুন
আমাদের কমিউনিটির আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আত্মসমালোচনা এবং সত্যকে গ্রহণ করার সাহস। কে কাকে কী বললেন, কে কার প্রতিবাদ করলেন, কে কোন সংগঠনের সদস্য, এসবের বাইরে গিয়ে আমাদের বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে।
অ্যাওয়ার্ডের নামে সম্মান বিক্রি বন্ধ করতে হবে। সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। কারি শিল্পের প্রকৃত পরিসংখ্যান নির্ধারণ করতে হবে। দক্ষ শেফ ও কর্মী তৈরিতে বিনিয়োগ করতে হবে। শ্রমিকদের অধিকার ও উৎসবের ছুটির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব ও সম্মাননা প্রদানের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
মাহি ফেরদৌস জলিলের বক্তব্যের ভাষা নিয়ে আপত্তি থাকতেই পারে। তাঁর ব্যবহৃত শব্দের সমালোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু সেই সমালোচনার আড়ালে তাঁর উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোকে চাপা দেওয়া উচিত নয়।
আমি তাঁর সব বক্তব্যের সমর্থক নই, আবার তাঁর সব বক্তব্যের বিরোধিতাও করতে চাই না। আমি চাই, প্রতিটি বক্তব্যের মূল্যায়ন হোক যুক্তি, তথ্য ও ন্যায়বোধের ভিত্তিতে।
আমরা কি শুধু প্রতিবাদের রাজনীতি করব, নাকি নিজেদের ভেতরের অসংগতিগুলোও সংশোধনের সাহস দেখাব?
মনে রাখতে হবে, প্রতিবাদ করা সহজ, কিন্তু পরিবর্তন আনা কঠিন। আর সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি শুরু হয় তখনই, যখন আমরা অন্যের ভুল ধরার পাশাপাশি নিজেদের ভুলের মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন করি।
ব্যক্তি নয়, বক্তব্যের বিচার হোক। আবেগ নয়, যুক্তির জয় হোক। সম্মাননা হোক যোগ্যতার স্বীকৃতি, অর্থের বিনিময়ে কেনা পরিচিতি নয়।
লেখক পরিচিতি : ড. আজিজুল আম্বিয়া
কলাম লেখক ও গবেষক