বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষার গড় পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৩৮ শতাংশ অকৃতকার্য। এসএসসির পর এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল আরও বিপর্যয়কর। এইচএসসিতে কৃতকার্য হয়েছে ৫২দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য।
বড় দুটি পাবলিক পরীক্ষার এমন ফলাফল নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এখানে শুধু বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয় নয়; বরং আমাদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষকসমাজ ও সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব ও সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের করণীয় নির্ধারণের বিষয়ও জড়িত।
পরীক্ষার ফল খারাপ হলে আমরা সাধারণত শিক্ষার্থীদের অমনোযোগ, পড়াশোনায় অনীহা কিংবা মেধার ঘাটতিকে দায়ী করি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থী কেন পড়ার টেবিল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? কেন তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমছে? দীর্ঘ শিক্ষাজীবন পার করার পরও কেন সে প্রত্যাশিত প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করতে হবে।
অভিভাবকদের অসচেতনতা ও নজরদারির অভাব
শিক্ষার্থীদের ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে অভিভাবকদের অসচেতনতা ও দায়িত্বহীনতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানো এবং প্রাইভেট ও কোচিংয়ে পাঠিয়ে ভালো ফল প্রত্যাশা করলেই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয় না। সন্তানের প্রতিদিনের পড়াশোনা, বন্ধুবান্ধব, চলাফেরা, অবসর কাটানোর ধরন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও মানসিক অবস্থার প্রতিও নজর রাখা জরুরি।
সন্তান নিয়মিত ক্লাসে যাচ্ছে কি না, পড়াশোনা করছে কি না, কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন- এসব বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার অভ্যাস অনেক পরিবারে অনুপস্থিত। সন্তানের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজন দায়িত্বশীল শাসন, সময় দেওয়া, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও নিয়মিত তদারকি। সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনে অভিভাবকের ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই।
স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা ও আসক্তি
তথ্যপ্রযুক্তি ও স্মার্টফোন আধুনিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের জন্য হুমকিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম, ভিডিও এবং বিনোদনমূলক কনটেন্টে অনেক শিক্ষার্থীর মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকার অভ্যাস ঘুম, সময় ব্যবস্থাপনা ও পড়াশোনায় মনোযোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রযুক্তি যখন শিক্ষার সহায়ক না হয়ে প্রধান বিনোদন ও আসক্তির উপকরণে পরিণত হয়, তখন স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়াই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন দায়িত্বশীল ব্যবহার ও প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ।
অযাচিত সঙ্গ, আড্ডা ও পড়াশোনাবিমুখতা
কৈশোর ও তারুণ্যে বন্ধু ও সঙ্গের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। ভালো সঙ্গ একজন শিক্ষার্থীকে এগিয়ে নিতে পারে, আবার অসুস্থ সঙ্গ তাকে বিপথেও পরিচালিত করতে পারে। অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, উদ্দেশ্যহীন ঘোরাফেরা ও নেতিবাচক বন্ধুদের প্রভাবে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারায়। এখানে শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করলে চলবে না। অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের দায়িত্ব হলো তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল বিকাশের পরিবেশ তৈরি করা।
শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতা
শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ববোধ, পাঠদানের মান, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষকতার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত পাঠ্যবিষয় বোঝানো, চিন্তাশক্তি বিকশিত করা, নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ শেখানো এবং জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী করে তোলা।
অথচ অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিংনির্ভরতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিছু শিক্ষক ব্যক্তিগত স্বার্থে রাজনৈতিক আনুগত্য ও সুবিধার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন, যার প্রভাব পড়ছে পেশাগত দায়িত্ব পালনে। তবে সব শিক্ষককে একই বিবেচনায় দেখার সুযোগ নেই। অনেক শিক্ষক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
সনাতন শিক্ষাপদ্ধতি ও সময়োপযোগী পাঠ্যক্রমের অভাব
শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল কিংবা সনদ অর্জন নয়; বরং জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও বাস্তব জীবনের উপযোগী সক্ষমতা অর্জন। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি ও সনাতন পাঠদান পদ্ধতির প্রাধান্য রয়েছে। শিক্ষার্থীরা অনেক সময় বুঝে শেখার পরিবর্তে পরীক্ষায় কী আসবে বা কীভাবে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে, সেদিকেই বেশি মনোযোগী হয়।
পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী, বিজ্ঞানভিত্তিক, আনন্দময় ও কর্মমুখী না হলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারে না। শ্রেণিকক্ষের পাঠ বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত না হলে আগ্রহ কমে যায়। প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, ভাষা, কারিগরি দক্ষতা, সমস্যা সমাধান ও সৃজনশীল চিন্তাকে শিক্ষার মূল ধারায় যুক্ত করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে, শিক্ষা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়; নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য।
নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক বন্ধন ও মূল্যবোধের সংকট
শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ভালো ফল করলেই একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হয়ে ওঠে না। তার মধ্যে সততা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, আত্মসম্মান ও আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চাও থাকতে হবে। বর্তমানে অনেক পরিবারে পারস্পরিক সময় দেওয়া, সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার চর্চা কমছে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হলে সন্তানের মানসিক বিকাশ ও আচরণেও তার প্রভাব পড়ে।
অন্যদিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা, অনৈতিকতার দৃষ্টান্ত ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিভিন্ন উপাদান কিশোর-তরুণদের প্রভাবিত করছে। চারপাশে দেখা আচরণ ও দৃষ্টান্তের কিছু অংশ তারা নিজেদের জীবনেও অনুসরণ করে। তাই শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়; পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও।
শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগের ঘাটতি
ফল বিপর্যয়ের আলোচনায় শিক্ষার সুযোগ ও মানের বৈষম্যও গুরুত্বপূর্ণ। শহর ও গ্রামের এবং সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঠদানের পরিবেশ, শিক্ষকসংকট, অবকাঠামো, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার ও প্রযুক্তিগত সুবিধায় পার্থক্য রয়েছে।
অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণ ও মানসম্মত পাঠদানের সুযোগ পায় না। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেকে কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভর শিক্ষায় পিছিয়ে থাকে। কারও পরিবারে শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ নেই, আবার কারও ক্ষেত্রে মানসিক চাপ ও পারিবারিক সংকট পড়াশোনায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসব বাস্তবতা বিবেচনা না করে শুধু শিক্ষার্থীদের অমনোযোগী আখ্যা দেওয়া সমস্যার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের পরিবর্তে দায় এড়িয়ে যাওয়ার শামিল।
পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতির দুর্বলতা
শিক্ষার্থীরা প্রকৃত অর্থে কতটা শিখছে, তা মূল্যায়নে আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শুধু চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর পুরো শিক্ষাজীবন মূল্যায়ন যথেষ্ট নয়। নিয়মিত শ্রেণি মূল্যায়ন, সৃজনশীল চিন্তা, ব্যবহারিক জ্ঞান, উপস্থিতি, ধারাবাহিক অগ্রগতি ও বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
একই সঙ্গে প্রশ্নপত্রের মান, পাঠ্যসূচির সঙ্গে প্রশ্নের সামঞ্জস্য, পরীক্ষার প্রস্তুতি ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষার্থীরা কোন বিষয়ে কেন দুর্বল হচ্ছে, তা আগেই শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া গেলে চূড়ান্ত পরীক্ষায় বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে
শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফল খারাপ হলে অভিভাবক শিক্ষকদের দায়ী করেন, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের অমনোযোগী বলেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে। আর নীতিনির্ধারকেরা অনেক সময় সমস্যার গভীরে না গিয়ে ফলাফল প্রকাশের মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করেন। এই দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল পর্যালোচনা, বিষয়ভিত্তিক অকৃতকার্যতার কারণ অনুসন্ধান, শিক্ষকদের পাঠদানের মান যাচাই ও শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বয়, কাউন্সেলিং, মানসিক সহায়তা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিশেষে বলতে চাই, বড় দুটি পাবলিক পরীক্ষার ফল বিপর্যয় কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও আত্মজিজ্ঞাসার উপলক্ষ। প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার দায় শুধু তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমরা দায়িত্ব শেষ করতে পারি না। একজন শিক্ষার্থী যখন পড়াশোনায় আগ্রহ হারায়, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়; তখন এর পেছনে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, সামাজিক পরিবেশ ও শিক্ষাব্যবস্থার কোন কোন সীমাবদ্ধতা কাজ করছে, তা খুঁজে দেখা জরুরি।
লেখক: সাংবাদিক, সংগঠক ও সমাজকর্মী