Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

মতামত

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি—অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র

Icon

ছামির মাহমুদ

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি—অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র

বিজ্ঞাপন

"শিক্ষা লাভ করা সহজ, কিন্তু মানুষ হওয়া কঠিন।"— বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর​ কলম থেকে বেরিয়ে আসা এই কথাটি শতাধিক বছর পর আজও প্রাসঙ্গিক। তাই আজকের লেখাটি বিশ্বকবির বিখ্যাত এই উক্তি দিয়েই শুরু করলাম।

আমাদের জাতীয় মানচিত্র ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের শিকড় যেসব মহান মনীষীদের ঘামে, মেধা ও দর্শনে সিঞ্চিত হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে তাঁদের প্রতি পরিলক্ষিত অনাচার আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র তুলে ধরছে। গতকাল ১০ অক্টোবর ঢাকায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে যেভাবে কালি লেপে দেওয়া হলো, তা কেবল একটি প্রতিকৃতিকে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা নয়; বরং তা আমাদের দীর্ঘদিনের সংবর্ধিত কৃষ্টি, ঐতিহ্য এবং সভ্যতার কপালেই চুনকালি মাখানোর এক হীন মানসিকতা।

বাংলাদেশের স্থপতি, আমাদের মহান স্বাধীনতার স্তম্ভ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর ও অবমাননার পর রবীন্দ্র-গ্রাফিতিতে কালি লেপার এই ধৃষ্টতা প্রমাণ করে, সমাজদেহে এক বিপজ্জনক ও মৌলবাদী মব-সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে।​ '২৪ এর ৫ আগস্ট থেকে রাষ্ট্রীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সূচিত হওয়া মব সংস্কৃতি আজ বিশ্ব দরবারে পুরো বাঙালি জাতিকে লজ্জায় ফেলে দিলো। বঙ্গবন্ধুর গ্রাফিতি ও ম্যুরাল ভাঙচুর দিয়ে শুরু হওয়া মব এখন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত পৌছালো। এই নির্বোদদের কান্ড কোথায় গিয়ে থামবে? তা বলা কঠিন।

যে জাতি তার ইতিহাসের বাতিঘরদের সম্মান জানাতে জানে না, সে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। রবীন্দ্র-বিরোধিতার এই ন্যক্কারজনক প্রবণতার পেছনে কাজ করছে সেই চিহ্নিত প্রতিক্রিয়াশীল ও পরাজিত শক্তির মনস্তত্ত্ব, যারা কোনোদিনও অসাম্প্রদায়িক, উদার ও প্রগতিশীল বাংলা সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারেনি। এদের কাছে রবীন্দ্রনাথ অচেনা, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা-স্বাধীকারের আন্দোলন সংগ্রাম অজানা, বিদ্যাসাগরের সংস্কার অনুপস্থিত, সত্যজিতের সৃষ্টি অনাবিষ্কৃত। তাদের এই সাংস্কৃতিক অজ্ঞতা ও ঔদ্ধত্যের কারণে কবির সেই সতর্কবাণীই আবার সত্য হয়ে দেখা দেয়—​"চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীরআপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরীবসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি..."​কিন্তু যে বিশ্বমানবের জ্ঞান ও বাণী আমাদের সংকীর্ণ প্রাচীর ভেঙে উন্মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল, তাঁর প্রতিকৃতিতেই আজ অমানবিকতার কালি মাখানো হচ্ছে।​ 

তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো জ্বেলে দেয় অন্য এক দৃশ্য। কবিগুরুর মুখে লেপে দেওয়া সেই হীনতার কালি পরম শ্রদ্ধায় ও মমতায় নিজের হাতে মুছে দিচ্ছেন এক সাধারণ রিকশাচালক। এই দুটি বিপরীতমুখী চিত্রই আজ আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে— প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করা আর প্রকৃত 'মানুষ' হয়ে ওঠার মধ্যে পার্থক্যটা ঠিক কোথায়! যে মানুষটি সারাদিন রিকশার প্যাডেল ঘুরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁর হয়তো বড় বড় শিক্ষাগত ডিগ্রি নেই, অ্যাকাডেমিক সনদ নেই; কিন্তু তাঁর হৃদয়ে রয়েছে বঙ্গ সংস্কৃতি ও মনীষীদের প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা ও সঠিক বোধ। অন্যদিকে, যারা কবিগুরুর ছবিতে কালি মাখিয়ে তথাকথিত স্পর্ধা দেখায়, তারা হয়তো ডিগ্রিধারী হতে পারে, কিন্তু মানসিক ও নৈতিক দিক থেকে চরম দেউলিয়া। এই সাধারণ শ্রমজীবী মানুষটি প্রমাণ করেছেন— শ্রদ্ধাবোধ বা সংস্কৃতির কোনো সামাজিক বা আর্থিক শ্রেণিবিভাগ হয় না।​ মনে রাখা উচিত, কালির আঁচড় দিয়ে রবীন্দ্রনাথের মুখ সাময়িকভাবে ঢেকে দেওয়া গেলেও তাঁর সৃষ্টি, দর্শন ও কালজয়ী অবদানকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে তিনি বিশ্বদরবারে বাংলা ভাষাকে যে গৌরবের আসনে বসিয়েছিলেন, তা কোনো সংকীর্ণ অপশক্তির পক্ষে ধূলিসাৎ করা সম্ভব নয়। বিশ্বকবি একই সাথে দুই সার্বভৌম রাষ্ট্র— বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টা। আমাদের জাতীয় সত্তা ও অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে তাঁর 'আমার সোনার বাংলা'।​ 

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু একটি স্বাধীন দেশের ইতিহাস, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অবমাননা করাকে কোনোভাবেই বাকস্বাধীনতা বা প্রতিবাদের ভাষা বলা যায় না। এই ধরনের কুপমণ্ডূকতা কেবল নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকেই অপমানিত করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মনীষীরা বাঙালি জাতিকে বিশ্বের বুকে অমরত্ব দিয়েছেন। তাঁদের প্রতি এই ন্যক্কারজনক অবমাননা বন্ধ করা এবং সামাজিক স্তরে এই মব-সংস্কৃতিকে রুখে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।​ যে রিকশাচালক ভাইটি কালি মুছে রবীন্দ্র-চেতনাকে স্যালুট জানালেন, আসল শিক্ষাটি আমাদের তাঁর কাছ থেকেই নিতে হবে। কালি মাখানো সেই অন্ধকারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন— সভ্যতা ও সংস্কৃতির আসল প্রদীপটি জ্বলে থাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়েই। এই প্রদীপ যেন কখনোই নিভে না যায়, সেই অঙ্গীকারই হোক আজকের বাংলাদেশের।

ছামির মাহমুদ; বিলেত প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার