বিজ্ঞাপন
প্রকৃতি রক্ষা করেই হোক বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো পরিকল্পনা
হাওর ধ্বংস করে উন্নয়ন নয়
আবু নাসের চৌধুরী রাহী
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৮ এএম
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ নদী, হাওর, বিল ও জলাভূমির দেশ। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীবন-জীবিকা এসব প্রাকৃতিক জলাধারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অথচ অপরিকল্পিত উন্নয়ন, জলাভূমি ভরাট, নদী-খাল দখল এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে অবকাঠামো নির্মাণের কারণে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটি দেশের অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু যে উন্নয়ন প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করে, কৃষিজমি সংকুচিত করে এবং মানুষের দীর্ঘদিনের জীবিকার ভিত্তি ধ্বংস করে—তাকে কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়ন বলা যায় না। আজকের একটি অপরিকল্পিত প্রকল্প ভবিষ্যতে বন্যা, খাদ্যসংকট, পরিবেশগত বিপর্যয় ও বাস্তুচ্যুতির মাধ্যমে বহুগুণ বেশি ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল সবুজ প্রকৃতি, বিস্তীর্ণ জলরাশি এবং বৈচিত্র্যময় প্রাণ-প্রকৃতির এক অনন্য আধার। বর্ষাকালে হাওরগুলো বিশাল জলভূমিতে পরিণত হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে এসব এলাকার বিস্তীর্ণ জমি হয়ে ওঠে কৃষকের ধান উৎপাদনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। একই সঙ্গে হাওর মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পরিযায়ী পাখি এবং অসংখ্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস ও বিচরণস্থল।
হাওরের গুরুত্ব কেবল খাদ্য উৎপাদন কিংবা মৎস্যসম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে বর্ষার পানি ধারণ করে, পানি নিষ্কাশনে সহায়তা করে, বন্যার চাপ কমায় এবং স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে হাওরের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হলে তার প্রভাব একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক জলবায়ু সহনশীলতার ওপর।
মৌলভীবাজারের হাওরে নতুন উদ্বেগ
মৌলভীবাজার চা-বাগান, পাহাড়, নদী-ছড়া ও বিস্তীর্ণ হাওরের জেলা। হাকালুকি, কাউয়াদীঘি, হাইল ও পূবের হাওরসহ জেলার বিভিন্ন জলাভূমি স্থানীয় প্রাকৃতিক প্রতিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এসব হাওর এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
‘হাওর রক্ষা আন্দোলন, মৌলভীবাজার’-এর অভিযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওর এলাকায় বিপুল পরিমাণ ভূমি, জলাভূমি ও কৃষিজমি প্রকল্পের আওতায় নেওয়ার চেষ্টা করছে। সংগঠনটি প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও আজম জে চৌধুরীর ইসি হোল্ডিংসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে দাবি করেছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমি কেনার পাশাপাশি সরকারি খাসজমি দখলেরও চেষ্টা চলছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় সাত থেকে আট হাজার একর জমি ও জলাভূমি সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় আসতে পারে।
এগুলো সংশ্লিষ্ট পরিবেশবাদী সংগঠনের উত্থাপিত অভিযোগ। তাই প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্যসহ প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা। কোনো প্রকল্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মানেই সেটি প্রমাণিত—এমন নয়। একইভাবে, উন্নয়নের নাম ব্যবহার করে পরিবেশগত ঝুঁকি, ভূমির মালিকানা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
বিশেষ করে হাওরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ বা শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা, পানির প্রবাহ বিশ্লেষণ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করা অপরিহার্য। প্রকল্পটি কোথায় হবে, কত জমি প্রয়োজন, জমির বর্তমান শ্রেণি কী, জলাভূমির কত অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং স্থানীয় কৃষক ও জেলেদের ওপর কী প্রভাব পড়বে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকতে হবে।
আইন থাকলেই হবে না, বাস্তবায়নও প্রয়োজন
হাওর ও জলাভূমি রক্ষায় আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ’ জারি করে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদে এটি ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন, ২০২৬’ হিসেবে কার্যকর হয়েছে।
কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—আইন প্রণয়নের পরও উন্নয়নের নামে হাওর, নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রতিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকছে? আইন যদি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ না হয়, হাওরের সীমানা যদি নির্ধারিত না থাকে এবং ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন কিংবা জলাভূমি ভরাটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে কাগজে থাকা আইন প্রকৃতি রক্ষায় খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে না।
হাওর রক্ষার প্রথম শর্ত হওয়া উচিত প্রতিটি হাওরের সীমানা, আয়তন ও ভূমির প্রকৃতি বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে স্বাধীন পরিবেশগত ও কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই নিশ্চিত করতে হবে।
হাওরের প্রাকৃতিক মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ, নদী ও খাল পুনঃখনন এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখাও অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় কৃষক, জেলে ও হাওরনির্ভর জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। তাদের সম্মতি, অভিজ্ঞতা ও জীবন-জীবিকার নিরাপত্তাকে যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।
জলবায়ু অর্থায়নের জবাবদিহি কোথায়?
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক তহবিলের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থায়ন পেয়ে থাকে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড বা জিসিএফ বাংলাদেশের জন্য প্রায় ৪৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। এর বাইরে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের জন্য আরও প্রায় ৬ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার অনুমোদনের তথ্য রয়েছে।
বাংলাদেশের ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন বা এনডিসি ৩.০-তে বলা হয়েছে, জিসিএফের মাধ্যমে সাতটি একক-দেশীয় এবং দুটি বহু-দেশীয় প্রকল্পে বাংলাদেশের জন্য ৫৮৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন অনুমোদিত হয়েছে। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের প্রকল্পসেবা সংস্থা ইউএনওপিএসের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত রোগ মোকাবিলা ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এর আগে ২০২৪ সালে বন্যার আগাম প্রস্তুতি ও সহায়তার জন্য জাতিসংঘের সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সি রেসপন্স ফান্ড—সিইআরএফ এবং অংশীদারদের মাধ্যমে প্রায় ৮ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছিল, যা প্রায় ছয় লাখ মানুষকে সহায়তা করেছে।
এসব পরিসংখ্যান সামনে রেখে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন: বাংলাদেশ মোট কত অর্থ পাচ্ছে? সেই অর্থ কোন কোন প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে? প্রকৃতি, নদী ও জলাভূমি রক্ষায় কতটা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে? প্রকল্পগুলোর ফলাফল মূল্যায়ন এবং ব্যয়ের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করার পরও যদি হাওর, নদী-নালা ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রতিবেশ ধ্বংস করা হয়, তাহলে সেই উন্নয়নকে কি সত্যিই জলবায়ুবান্ধব বলা যাবে?
একদিকে জলবায়ু সহনশীলতা তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন গ্রহণ করা এবং অন্যদিকে দেশের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো শিল্পায়ন ও অবকাঠামোর চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া—এই দ্বিমুখী নীতি দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী হতে পারে।
উন্নয়ন হোক প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ
‘হাওর রক্ষা আন্দোলন, মৌলভীবাজার’ উন্নয়ন বন্ধ করার কথা বলছে না। সংগঠনটির বক্তব্য হলো—উন্নয়ন হতে হবে প্রকৃতি, পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য কৃষিজমি, জলাভূমি ও হাওরের স্বাভাবিক প্রতিবেশ ধ্বংস করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য হাওর কিংবা উৎপাদনশীল কৃষিজমির পরিবর্তে পরিত্যক্ত বা অনাবাদি জমি, ভবনের ছাদ, সরকারি স্থাপনা, শিল্পাঞ্চল এবং পরিবেশগতভাবে কম সংবেদনশীল স্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। বিকল্প স্থান থাকা সত্ত্বেও জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ জলাভূমিকে প্রকল্পের জন্য বেছে নেওয়া হলে সেটি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনের মূল দর্শনের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে এমন উন্নয়ন প্রয়োজন, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি হাওর, নদী, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যও সুরক্ষিত থাকবে। উন্নয়নের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে, কিন্তু তার মূল্য হিসেবে মানুষের বসতভিটা, জীবিকা ও প্রাকৃতিক নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া যাবে না।
প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। হাওর রক্ষা মানে কেবল একটি জলাভূমি রক্ষা নয়; এর অর্থ কৃষক ও জেলের জীবিকা রক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ সংরক্ষণ করা।
কারণ হাওর বাঁচলে শুধু প্রকৃতি বাঁচবে না—বাঁচবে মানুষ, জীববৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
লেখক : আবু নাসের চৌধুরী রাহী
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাংবাদিক