বিজ্ঞাপন
ক্ষমতার পালাবদল নয়, ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ চাই
ড. আজিজুল আম্বিয়া
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু প্রতিবার ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি শুধু মুখ বদলায়, আর রাষ্ট্রের চরিত্র না বদলায়, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা একসময় হতাশায় পরিণত হয়। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে আইন হবে সবার জন্য সমান, বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কথা বলবে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য কারও মৌলিক অধিকার কেড়ে নেবে না।
কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আমাদের আবারও গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করছে: আমরা কি সত্যিই সেই বাংলাদেশ নির্মাণের পথে হাঁটছি?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনির আবেগঘন বক্তব্য এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি যখন বললেন, ‘আমি এখন আর জামিন চাই না’, তখন সেটিকে শুধু একজন আসামির বক্তব্য হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। তাঁর বক্তব্যে ছিল দীর্ঘ কারাবাসের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, একজন জীবনসঙ্গীকে শেষ সময়ে পাশে না পাওয়ার বেদনা এবং রাষ্ট্রের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে গভীর অভিমান।
অবশ্যই একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলেই তিনি নির্দোষ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। আবার মামলা হয়েছে বলেই তিনি অপরাধী, সেটিও আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, আর ন্যায়বিচারের দায়িত্ব আদালতের।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিচার কি প্রতিশোধের ভাষায় পরিচালিত হবে, নাকি ন্যায়বিচারের ভাষায়?
এই প্রশ্নটি শুধু দীপু মনির জন্য নয়। এটি আজ বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রশ্ন।
রাষ্ট্র বদলেছে, নাকি শুধু ক্ষমতার মালিক বদলেছে?
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দল, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতা, নির্বাচন ও মানবাধিকার নিয়ে যে অভিযোগগুলো উঠেছিল, সেগুলোই একসময় জনমনে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছিল। আর এই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন যারা এই দেশের অগ্রগতি পছন্দ করতেননা তারা । তারাই তৈরি করেছিলেন মহাপ্লান । ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ।
সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমেছিল শুধু একটি সরকারকে সরানোর জন্য নয়। তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রের সংস্কার।
তাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা কি সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করছি?
যদি বিরোধী মতের মানুষকে নির্বিচারে মামলা দেওয়া হয়, যদি দীর্ঘদিন বিচার ছাড়াই মানুষ কারাগারে থাকে, যদি পুলিশ রাজনৈতিক পরিচয় দেখে আচরণ করে, যদি সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানো হয়, তাহলে শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদলাবে, রাষ্ট্রের সংস্কৃতি বদলাবে না।
এমন পরিবর্তন জনগণকে শেষ পর্যন্ত হতাশই করবে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের আয়না
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হলো সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীন।
সাংবাদিক সরকারের প্রশংসা করবেন, আবার প্রয়োজন হলে সরকারের কঠোর সমালোচনাও করবেন। প্রশ্ন করবেন, অনুসন্ধান করবেন, ভুল ধরবেন। কখনো ভুলও করতে পারেন। কিন্তু একটি প্রতিবেদন বা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার আগে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে।
সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রসঙ্গে Committee to Protect Journalists বা CPJ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং অভিযোগ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি মনে করছে, সাংবাদিকদের সংবাদকর্ম ও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে অপরাধীকরণ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে।
এই অভিযোগের সত্যতা বা আইনি ভিত্তি আদালতেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিক সমাজের অবশ্যই আছে।
কারণ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকের অধিকার নয়; এটি পাঠকের অধিকারও। একটি সমাজে সংবাদপত্র যদি প্রশ্ন করতে ভয় পায়, তাহলে সাধারণ মানুষ অন্ধকারে থাকে।
রাষ্ট্রের সমালোচনা করা অপরাধ নয়। আবার সাংবাদিকের পরিচয়ও অপরাধের দায় থেকে কাউকে মুক্ত করে না। প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা, যেখানে সাংবাদিকতা ও অপরাধকে আলাদা করে দেখা হবে।
আইনশৃঙ্খলা: ভয় নয়, আস্থা দরকার
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি রাষ্ট্রের আয়না। মানুষ যখন রাস্তায় নিরাপদ বোধ করে না, যখন মব জাস্টিস বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটে, যখন রাজনৈতিক পরিচয় মামলার প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে, তখন শুধু পুলিশের সংখ্যা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান করা যায় না।
রাষ্ট্রকে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয়।
পুলিশকে বুঝতে হবে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের দায়িত্বের চরিত্র পরিবর্তন হয় না। পুলিশ কোনো দলের বাহিনী নয়। পুলিশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, জনগণের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত।
একইভাবে বিচারব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক চাপের ধারণা দূর করতে হবে। মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে, আদালতে তার পরিচয় নয়, প্রমাণ কথা বলবে।
দায় কার?
এই প্রশ্নের উত্তর একক নয়।
সরকারের দায় সবচেয়ে বেশি, কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র তার নিয়ন্ত্রণে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে আইন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হবে না।
কিন্তু জনগণের দায়ও আছে। আমরা অনেক সময় নিজের দলের অন্যায়কে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ বলি, আর প্রতিপক্ষের একই কাজকে ‘ন্যায়বিচার’ বলে স্বাগত জানাই। এই দ্বৈত মানসিকতা গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।
সাংবাদিকদেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যম যদি কোনো দলের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতাও থাকতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোরও বুঝতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যে আইন দিয়ে আপনি প্রতিপক্ষকে আঘাত করছেন, কাল সেই আইন আপনার বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে।
তাহলে কি জনগণ আবার শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রাখবে?
এই প্রশ্নটি আজ রাজনৈতিক আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই উঠছে।
আমার মনে হয়, এর উত্তর এত সরল নয়।
মানুষ যদি বর্তমান সরকারের মধ্যে পুরোনো সরকারের ভুলের পুনরাবৃত্তি দেখতে পায়, তাহলে অবশ্যই অতীতকে নতুন করে মূল্যায়ন শুরু করবে। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে বর্তমানের ব্যর্থতা মানুষকে অতীতের কিছু ভালো দিক মনে করিয়ে দেয়।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মানুষ অবধারিতভাবে শেখ হাসিনার কাছে ফিরে যাবে।
বাংলাদেশের জনগণ হয়তো এবার আরও বড় কিছু চাইবে। তারা হয়তো কোনো একজন নেতার ওপর নির্ভর করতে চাইবে না। তারা চাইবে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নেতা পরিবর্তন হলেও নাগরিকের অধিকার পরিবর্তন হবে না।
তারেক রহমানের জন্যও এটি বড় পরীক্ষা
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনীতি বা আইনশৃঙ্খলা নয়; রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন।
বিরোধী অবস্থানে থেকে যে স্বাধীনতার কথা বলা সহজ, ক্ষমতায় গিয়ে সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা অনেক কঠিন।
ক্ষমতায় থাকা মানে শুধু নিজের সমর্থকদের নিরাপদ রাখা নয়; নিজের বিরোধীদের অধিকারও রক্ষা করা।
একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় সে তার সমালোচকদের সঙ্গে কী আচরণ করে, তা দিয়ে।
পরিত্রাণের পথ কোথায়?
পরিত্রাণের পথ একটাই: আইনের শাসন।
মামলা হতে হবে নির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে। দীর্ঘ প্রাক-বিচার আটক কমাতে হবে। জামিনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও অভিন্ন নীতি থাকতে হবে। পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। সাংবাদিকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়াকে দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ কোনো একটি রাজনৈতিক দলের জন্য ছিল না। এটি ছিল একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রের স্বপ্নের জন্য।
তাই বাংলাদেশের পুরোনো ইমেজ ফিরিয়ে আনার চেয়েও বড় প্রয়োজন একটি নতুন বাংলাদেশের ইমেজ তৈরি করা।
যে বাংলাদেশে সাবেক মন্ত্রীও ন্যায়বিচার পাবেন, আবার তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ বিচারও হবে। যে বাংলাদেশে সাংবাদিক সরকারকে প্রশ্ন করতে পারবেন, আবার দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার জবাবদিহিও থাকবে। যে বাংলাদেশে পুলিশ ক্ষমতাবানের পাহারাদার নয়, জনগণের রক্ষক হবে। যে বাংলাদেশে আদালত প্রতিশোধের জায়গা নয়, ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয় হবে।
ক্ষমতার পালাবদল ইতিহাসের একটি অধ্যায় মাত্র। রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোই আসল পরিবর্তন।
দীপু মনির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলা কথাগুলো তাই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বেদনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সেখানে আমরা যেন বাংলাদেশের রাজনীতির বহু বছরের একটি প্রশ্ন শুনতে পাই:
‘ক্ষমতা কার হাতে থাকবে’ নয়, বরং ‘ক্ষমতা যার হাতেই থাকুক, নাগরিকের অধিকার কি নিরাপদ থাকবে?’
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের ইতিহাস।
আর সেই উত্তর যদি ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও আইনের শাসনের পক্ষে হয়, তবেই বাংলাদেশ তার হারানো আস্থা ফিরে পাবে। কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি নয়, নিজের রাষ্ট্রের প্রতি।
লেখক: ড. আজিজুল আম্বিয়া
কলাম লেখক ও গবেষক