Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

মতামত

বর্তমান আমরা ও অসাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা

Icon

জারীন সাবাহ সুবাইতা

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১৮ এএম

বর্তমান আমরা ও অসাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা

বিজ্ঞাপন

কিছুদিন আগে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম, তখন খেয়াল করলাম একটি গ্রাফিতি, সাধারণত আমি রাস্তায় সকল গ্রাফিতি গুলো পর্যবেক্ষণ করতে করতে বাসায় আসি, তবে একটি গ্রাফিতি দেখে কিছুক্ষণ নিঃশব্দ হয়ে গেলাম ভেতর থেকে, কেন জানি কিছু প্রশ্নের উদয় হলো। সেখানে লেখা ছিল "শিক্ষা ব্যবস্থার বারোটা",আসলেই তাই! আমি অনেকবার এই কথাটি শুনেছি, আসলেই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দশা "১২ টা বেজে ১৩ টা"। তবে এতে কারো কোন মাথা ব্যথা নেই, আমার ছোট থেকেই বাংলাদেশের  শিক্ষাব্যবস্থা  কখনই পছন্দ ছিল না। আমার মাথায় সব সময় একটি প্রশ্নই বারবার ঘুরপাক খেতো যে, বর্তমানে আমদেরটা কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে শুধু আছে মুখস্ত বিদ্যা। কারণ এখানে শুধু আছে শিক্ষক, বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ও তাদের সাথে আছে গাইডের ব্যবসা। আমার মনে আছে, আমি যখন ক্লাস ২ তে পড়ি তখন সন্ধ্যার পর, সকলেই টেবিলে বসে পড়তো দুই থেকে তিন ঘণ্টা আর পরীক্ষা আসলে সবার দরকার ১০০ তে ১০০। এরপর আসে রোলের ব্যাপার, কেউ এক; কেউ বা দুই এভাবে করে এক থেকে দশের মধ্যে যারা থাকে তারাই নাকি শ্রেষ্ঠ, তবে রোল ১১ থেকে যে বাকি থাকে একটা শ্রেণীতে তারা কি মেধাবী নয়? কারণ কখনোই আমি দেখলাম না শেষের যে স্টুডেন্টরা থাকে তাদেরকে কখনোই শিক্ষকরা ভালোমতো বা ভালো চোখে আমাদের সমাজ দেখে থাকে। কারণ আমি নিজেই  সব সময় শেষে পড়ে থাকা একজন স্টুডেন্ট, এখন হয়তো আপনি বলতে পারেন যে, আমি শেষে বলেই কথাগুলো বলছি। হয়তো, ধরে নিলাম। হ্যাঁ, আমি বলছি শেষের স্টুডেন্ট বলেই! তবে আপনি একটা উত্তর বলেন, আসলে কি এটাই শিক্ষা ব্যবস্থা?

আচ্ছা, আপনাদের মনে কি কখনো শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কোন প্রকার প্রশ্ন জেগে উঠে নি? আমি তো খুবই ছোট একজন, আমি মাত্র ক্লাস টেনে পড়ি। যদি আমার মাথায় প্রশ্নটি আসতে পারে, আপনাদের কি কখনো আসেনি? নাকি শুধু আমারই এসেছে? আপনারা তো আমার চেয়ে কতই বড় ,কত অভিজ্ঞ মানুষ! আপনাদের কি কখনো এসব প্রশ্ন মনে নাড়া দেয়নি? আচ্ছা, একটা শিশু পাঁচ বছর বয়সে এই শিক্ষাব্যবস্থায় পা রাখে এবং দিনশেষে সে কি আদৌ কিছু শিখে নাকি শুধু মুখস্ত বিদ্যা আর জিপিএ ৫? আমি কিছুদিন আগে "থ্রি ইডিয়েট" নামে একটি মুভি দেখেছি, সেখানে 'রেঞ্চ' নামের প্রধান অভিনেতা বলেছিলেন, “প্রতিবছর শিক্ষাকে কি পাচ্ছে বা শিক্ষার মজা কেউ পায় না বা চায় না, শুধু প্রতিবছর গাধা ম্যানুফ্যাকচার করা হচ্ছে। এখানে নতুন কোন বিষয়ের জ্ঞান চর্চার কোন কথাই নেই কিংবা নতুন কোন পরিকল্পনার দাম নেই।”  আসলেই, আমাদের কারিকুলামে আছে সৃজনশীল প্রশ্ন এইটা সত্য কিন্তু এর মাধ্যমে কি আসলেই আমরা সৃজনশীলতা অর্জন করতে পারছি? এমন কি, শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ নিয়েও আমার যথেষ্ট  সমালোচনা আছে।

প্রথমত, শ্রেণিকক্ষ আমার কাছে মনে হয় একটি অস্থায়ী খাঁচার মতো। যেখানে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকে এবং তার কাজের বড় একটি অংশ হলো ক্লাস কে শান্ত হতে বলা। শ্রেণিকক্ষ শব্দটি মাথায় আসলেই আমার কানে একটি কথাই আসে "চুপ কর”। আসলেই কি শ্রেণিকক্ষ এমন কোন স্থান যার বিকল্প শুধু এমনই এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ? শিক্ষার্থীরা একজন শিক্ষককে সম্মান করতে পারছে না ,তবে এটাই কি শিক্ষা? এটিই কি শিক্ষার সংজ্ঞা? এই কারিকুলাম আর এই গাদাগাদা জিপিএ ফাইভ এর সফলতা কোথায়? যার জন্য অজস্র শিক্ষার্থীদের ভুগতে হয় হতাশার মধ্যে। এই অব্যবস্থাপনা  শিশু শ্রেণী হতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত জড়িত। একইভাবে, আমার সহপাঠীদের যদি জিজ্ঞেস করি কিংবা কোন অভিভাবককে যে, আপনার ছেলে বা মেয়ে কিংবা তোমার (সহপাঠী) কি করতে ভালো লাগে বা বড় হয় কি করতে চাও? তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি উত্তর পাওয়া যাবে, উত্তরটি এমন যে আমার ছেলে বা মেয়ে বা আমি বুয়েট,মেডিকেলে পড়বো। যদিও এর মধ্যে কেউ যদি বলতে চান যে, আমি আর্টস নিয়ে পড়বো কিংবা কমার্স নিয়ে বা আমি বড় হয়ে ফ্যাশন ডিজাইনার হবো অথবা আমি একজন ব্যবসায়ী বা নিজে উদ্যোক্তা হতে চাই, সেখানে কেন যেন সবার চেহারা পাল্টিয়ে যায় কথাটি শোনার পর, কেন?  আমার মনে হয় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আপনি যদি খেয়াল করেন,  ৯০ ভাগ স্টুডেন্ট-ই সাইন্সে পড়ে, যদি সে নাও পড়তে চায় তাও তাকে জোর করে পড়ানো হয়। তবে তো ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ারেরও আমাদের দেশে কোন অভাব হওয়ার কথা নয়। তাহলে কেন একজন মানুষ অসুস্থ হলে  ইন্ডিয়া যায় বা বিদেশে যায় চিকিৎসা নিতে? কেন মানুষ বুয়েটে পড়ার পর বিদেশে চাকরি খোঁজে কিংবা বাংলাদেশে একটি ব্যাংকে চাকরি করে?

যাইহোক, আমাদের মধ্যে অনেকেই অনেক সময় সাইন্সে পড়তে চায় না, আর সে যদি কথাটি বলে তবে কেন তার দিকে অপরাধীর মতো দেখা হয়? তবে এটিই কি শিক্ষা? মানুষ অনেক বড় বড় ডিগ্রী নিচ্ছেন, অনেক পড়ালেখা করছেন, অনেক ভালো জানেন, তবে তারা কি আসল শিক্ষা ব্যবস্থার সংজ্ঞাটি জানেন? বাংলাদেশের এই শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা দেখার পরও কেউ কি এসব নিয়ে কথা বলবে না? দিনশেষে আমরা কি শিখলাম এই কথাটি কোন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করেন, সে বলতে পারবে তার রপ্ত করা সংজ্ঞা বা সূত্র। তবে আমি এটি বলতে পারি যে, সে বলতে পারবে না সে আসলে কি শিখলো বা এই জ্ঞানটা কি অথবা এটি তার জীবনে কি প্রভাব ফেলবে এবং এই শিক্ষাটি দিয়ে সে কি করবে? আপনি তাদের আচরণেই দেখতে পারবেন, শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে তারা আসলে কি শিখছে। আপনি রাস্তায় দেখবেন, ক্লাস ৬-এর ছেলে সিগারেট খাচ্ছে, তবে সে কি এই শিক্ষাটি পায়নি যে সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর? অবশ্যই পেয়েছে, কিন্তু সংজ্ঞা আকারে ও পরীক্ষার নম্বরের সংখ্যায়। সে বইয়ে পড়েছে যে, "মাদক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর" সে তা পড়েছে এবং লিখেছে ও পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছে, এতে শিক্ষক ও বাবা-মা দুজনেই খুশি। সে আসলে সেখান থেকে কি শিখল সেটা তাকে শেখানো হয়নি। এভাবেই, সে কি শিখল তাকে তা কেউ বলবে না ও আর শেখাবেনও না! এছাড়াও, স্কুল জীবনের সমাপ্তি সূচক পরীক্ষা, এসএসসি পরীক্ষা। যেখানেও প্রাধান্য পায় শুধুই জিপিএ ফাইভ। কিন্তু একটি মেয়ে বা ছেলে ১০ বছর স্কুলে পড়ে কি শিক্ষা পেল তার কোন কথা নেই! পরীক্ষার রেজাল্ট আসবে, বাবা-মা ও পাড়া-প্রতিবেশী শুনতে যাবে শুধু জিপিএ ফাইভ! সে কি শিক্ষা পেল এটি নিয়ে কোন কথাই উঠবে না। কিছুদিন পর সে ভুলেও যাবে সে কি পড়েছিল। তবে এটাই কি শিক্ষাব্যবস্থা?এভাবে গড়বো আমরা 'স্মার্ট বাংলাদেশ'? তবে এভাবে কি আসলেই গড়া সম্ভব 'স্মার্ট বাংলাদেশ'?

যাদের হাতে এসব শিক্ষা ব্যবস্থার খড়ি বর্তমান, যারা এদেশের বুদ্ধিজীবী মানুষ বা যারা এসব শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন বা যাদের হাতে ক্ষমতা আছে; তারা কি এদেশের শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে কাজ করছেন? আমরা যদি এখনো না বদলায় তাহলে কখন বদলাবো? তবে এই ২০০ বছর আগের এই অসার শিক্ষাপদ্ধতি এখনো কি এভাবেই চলবে? আর বাংলাদেশ সব সময় কি এভাবেই পিছিয়ে থাকবে? কেন আমরা বদলাতে পারি না? কেন আমরা সব সময় বিদেশ বিদেশ করি?

আপনি কি জানেন বাংলাদেশের মানুষ কতটা মেধাবী? শুধুমাত্র এই শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই হয়তোবা আমরা পিছিয়ে আছি আজ। আর দিনশেষে কারা কষ্ট ভোগেন কখনো কি ভেবে দেখেছেন? শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ উন্নয়নের জন্য আমাদের সবাইকে একত্রে হতে হবে,শিখতে হবে, সব কিছু একসাথে এগিয়ে নিতে হবে। তবে কিছু শ্রেণীর মানুষ এই চিন্তায় আসতে চান না কারণ দিনশেষে তাদের চাকরির গ্যারান্টি নেই। ফলে তারা তাদের পেট সামলাবেন নাকি শিক্ষা? আমরা কেন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে পারি না? তবে এটি নিয়ে কেউ কি কাজ করছেন না? হ্যাঁ, অবশ্যই করছেন। তবে কেন কিছু হচ্ছেনা? এখন হয়তো আপনি বলতে পারেন আমি বিদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উদাহরণ দিচ্ছি, আসলেই কি? না, আপনি খেয়াল করে দেখবেন আমি একবারও বিদেশের কথা চিন্তা করে  দেশের যে বাস্তবতা তার তুলনা করি নি। কেন বলার প্রয়োজন হবে বা কেনই বা বলব? আমরা বাঙালি আমরাই সেরা, আমরা হব আমাদের মত, আমাদের মত স্মার্ট! এসব তখনই বদলাবে, যখন বদলাবে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আমাদের ভাবজগতের চিন্তা গুলি। এই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে যে আমরা বাচ্চারা বা শিক্ষার্থীরা কিছুই শিখছি না, এটা অভিভাবক এবং বড় মানুষরা আমাদের চেয়ে ভালো জানে কিন্তু তারা কেন এটিকে সমর্থন করছে বা তারা আমাদের থেকে অত্যন্ত জ্ঞানী হয়েও তারা কেন এবং কিভাবে এটা সমর্থন করছে এখনো, আমার তা জানা নেই। আমি আপনাকে একটি বাড়ির কাজ দিতে চাই, একটু পর্যবেক্ষণ করে দেখুন, এই শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের কতটা এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে এবং দেশের  উন্নয়নে কতটা কাজ করেছে এই শিক্ষা ব্যবস্থা?

লেখক : জারীন সাবাহ সুবাইতা, শিক্ষার্থী, উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার