Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

মতামত

নবম পে-স্কেল ও আর্থ-সামাজিক প্রভাব

Icon

ফরিদুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩০ এএম

নবম পে-স্কেল ও আর্থ-সামাজিক প্রভাব

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার অন্যতম বিষয় হলো নতুন বেতন কাঠামো। ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল চালুর পর এক দশকেরও বেশি সময় পার হয়েছে। এ সময়ে দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে একই বেতন কাঠামোয় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই চাপে পড়েছে। এই বাস্তবতায় নবম জাতীয় পে-স্কেল শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের মূল্যস্ফীতি, ভোগব্যয়, রাজস্ব, কর্মসংস্থান, সঞ্চয়, বাজারব্যবস্থা এবং সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। সরকারি তথ্য ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন কাঠামোর জন্য বাজেটে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কমিটি নবম পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে বাস্তবায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ করছে।

অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা আজকের তুলনায় ভিন্ন ছিল। এক দশকের বেশি সময় ধরে একই মূল বেতন কাঠামো বহাল থাকায় মূল্যস্ফীতির প্রভাবে বেতনের প্রকৃত মূল্য কমেছে। অর্থাৎ কাগজে বেতন একই থাকলেও সেই বেতন দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হচ্ছে। নবম পে-কমিশনের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশের কথা প্রকাশিত হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল বেতনের অনুপাত ১:৮ করার কথাও এসেছে, যা বর্তমান কাঠামোর প্রায় ১:৯-এর তুলনায় কিছুটা সংকুচিত। তবে মনে রাখতে হবে, কমিশনের সুপারিশ এবং সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন ও গেজেট এক বিষয় নয়। জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত নতুন কাঠামো নিয়ে পর্যালোচনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া চলমান থাকার খবর প্রকাশিত হয়েছে। নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ওপর। আয় বাড়লে পরিবারগুলো খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যয় করতে তুলনামূলকভাবে সক্ষম হবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির প্রভাব হতে পারে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। একজন নিম্নবেতনের কর্মচারীর আয় বাড়লে তার পরিবারের পুষ্টি, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং বাসস্থানের মানোন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো, সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা তৈরির সুযোগও বাড়তে পারে।

সরকারি কর্মচারীদের আয় বৃদ্ধির একটি বড় অর্থনৈতিক প্রভাব হলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি। বেতন বাড়লে মানুষ বাজারে বেশি ব্যয় করতে পারে। পোশাক, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন, আবাসন, ইলেকট্রনিক পণ্য ও অন্যান্য সেবার চাহিদা বাড়তে পারে। এই অতিরিক্ত চাহিদা উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের জন্য বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার বিকাশ ঘটতে পারে এবং পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে। তবে এখানেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। সরবরাহের তুলনায় চাহিদা যদি দ্রুত বাড়ে, তাহলে পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ববর্তী বিশ্লেষণেও নতুন পে-স্কেলের মতো বড় বেতন সমন্বয় সামগ্রিক চাহিদা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল। পে-স্কেল বাস্তবায়নকে সফল করতে হলে শুধু বেতন বাড়ালেই হবে না; একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ বেতন বৃদ্ধির পর যদি খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ কারণে পে-স্কেলের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাজার তদারকি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগিতা কমানোর কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সরকারের আর্থিক সক্ষমতা। বেতন ও ভাতা বাড়লে সরকারের রাজস্ব ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে পেনশনভোগী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীদের ওপরও আর্থিক দায় বাড়তে পারে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকার প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে এ ব্যয় আরও বাড়বে। তাই পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় বেতন বৃদ্ধির অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ বেতন একজন কর্মচারীর আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। পর্যাপ্ত বেতন ও সামাজিক নিরাপত্তা থাকলে অনৈতিক আয় বা দুর্নীতির প্রতি কিছু মানুষের আকর্ষণ কমার সম্ভাবনা থাকে। তবে বেতন বৃদ্ধি একাই দুর্নীতি নির্মূল করতে পারে না। দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা, সম্পদের হিসাব, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নৈতিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি। তাই নবম পে-স্কেলের সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কারকে সমান্তরালে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

একটি প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দক্ষ ও মেধাবী জনবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি চাকরিতে যদি বেতন কাঠামো দীর্ঘদিন বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন থাকে, তাহলে মেধাবীদের একটি অংশ বিকল্প কর্মক্ষেত্রের দিকে ঝুঁকতে পারে। যৌক্তিক বেতন কাঠামো সরকারি চাকরিকে আকর্ষণীয় করতে পারে। এতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক সেবার মান উন্নয়নের সম্ভাবনা বাড়বে। তবে বেতন কাঠামোর পাশাপাশি পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং পেশাগত মর্যাদার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে হবে। নবম পে-স্কেলের অন্যতম ইতিবাচক দিক হতে পারে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়া। কারণ নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা মূল্যস্ফীতির অভিঘাত বেশি অনুভব করেন। তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়। অন্যদিকে উচ্চ গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা এবং সরকারি-বেসরকারি বেতন বৈষম্যের বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। বেতন কাঠামোর লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেতন বাড়ানো নয়; বরং ন্যায্যতা, দায়িত্ব, দক্ষতা ও সামাজিক প্রয়োজনের মধ্যে একটি যুক্তিসংগত ভারসাম্য তৈরি করা।

নতুন পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রভাব পড়বে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের ওপর। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর অবসরজীবনে চিকিৎসা, বাসস্থান ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ অনেকের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তাই পে-স্কেলের সঙ্গে পেনশন কাঠামোকে বাস্তবসম্মত ও টেকসই করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। নবম পে-স্কেলের সফলতা নির্ভর করবে এর সঙ্গে কর্মদক্ষতার সম্পর্ক কতটা প্রতিষ্ঠিত করা যায় তার ওপর। জনগণের করের অর্থে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়। তাই বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি জনগণকে আরও উন্নত, দ্রুত, সহজ ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা দেওয়ার অঙ্গীকারও থাকতে হবে। সরকারি চাকরি শুধু জীবিকা নয়; এটি জনসেবা। নতুন বেতন কাঠামোর মাধ্যমে কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়লে তাদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীলতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি প্রত্যাশিত হবে।

প্রকাশিত বাজেট-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে নতুন পে-স্কেল ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। বাজেটে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মহলে মূল বেতন ও ভাতা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের বিভিন্ন প্রস্তাব আলোচিত হয়েছে। ধাপে বাস্তবায়নের সুবিধা হলো সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় আর্থিক চাপ পড়ে না। একই সঙ্গে রাজস্ব পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশে পে-স্কেল নিয়ে সাধারণত দীর্ঘ বিরতির পর আলোচনা শুরু হয়। এই দীর্ঘ বিরতি কর্মচারী ও সরকারের উভয়ের জন্য সমস্যা তৈরি করে। ভবিষ্যতে প্রতি ৩ থেকে ৫ বছর পরপর জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব পরিস্থিতি ও উৎপাদনশীলতা বিবেচনায় বেতন কাঠামো পর্যালোচনার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে একদিকে কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা হঠাৎ বড় ধরনের ধাক্কা খাবে না, অন্যদিকে সরকারের ওপর এককালীন বড় আর্থিক চাপও তৈরি হবে না।

নবম পে-স্কেল নিঃসন্দেহে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার। কিন্তু এর প্রভাব শুধু সরকারি কর্মচারীর বেতন স্লিপে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি দেশের বাজার, ভোগব্যয়, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব, পেনশন, কর্মসংস্থান, সঞ্চয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। তাই নতুন পে-স্কেলকে দেখতে হবে বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক সংস্কারের অংশ হিসেবে। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের ওপর করের চাপের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বেতন বাড়বে, কিন্তু বাজারদর যেন তার চেয়ে দ্রুত না বাড়ে; সরকারি ব্যয় বাড়বে, কিন্তু রাজস্ব ও উৎপাদনশীলতাও যেন একই সঙ্গে বাড়ে; কর্মচারীর আর্থিক নিরাপত্তা বাড়বে, কিন্তু জনগণের সেবার মানও যেন দৃশ্যমানভাবে উন্নত হয়। সঠিক পরিকল্পনা, ধাপে বাস্তবায়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব সংস্কার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে নবম পে-স্কেল শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক স্বস্তি নয়—বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক কর্মপরিবেশ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: ফরিদুল ইসলাম, চিন্তক, শিক্ষাবিদ, কবি ও গবেষক।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার