Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

মতামত

রাষ্ট্র কতটা নিষ্ঠুর হলে এমন অন্যায় সম্ভব হয়?

Icon

ড. আজিজুল আম্বিয়া

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম

রাষ্ট্র কতটা নিষ্ঠুর হলে এমন অন্যায় সম্ভব হয়?

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে নৃশংস হত্যাকাণ্ড আর ধর্ষণের খবর আজ আর মানুষকে আগের মতো চমকে দেয় না। সংবাদ শিরোনামে এগুলো এখন প্রায় “রুটিন আইটেম”। কিন্তু কিছু ঘটনা থাকে, যেগুলো কেবল অপরাধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সেগুলো আসলে রাষ্ট্রের বিবেক, প্রশাসনের দায়িত্ববোধ এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা—সবকিছুকেই একসঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাগেরহাটে ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী ও শিশু সন্তানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড তেমনই একটি ঘটনা।

এটি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার পরিবারের ওপর হামলা নয়, এটি দেখিয়ে দিয়েছে—রাষ্ট্র কতটা নিষ্ঠুর হলে অপরাধীরা এমন দুঃসাহস দেখাতে পারে, আর বিচার সংস্কৃতি কতটা ভেঙে পড়লে একজন স্বামী ও পিতাকে স্ত্রী–সন্তানের নতুন লাশ দেখতে যেতে হয় জেলগেট পর্যন্ত।

নৃশংসতা যখন মানবতাকেই হত্যা করে

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, সাদ্দামের স্ত্রীকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে। এরপর তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়—যাতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এখানেই নৃশংসতা শেষ নয়। তাদের ছোট্ট শিশুটিকেও হত্যা করা হয়েছে। নিষ্পাপ সেই শিশুকে ঘরের মেঝেতে ফেলে রাখা হয়।

এই জায়গায় এসে সব প্রশ্ন থেমে যায়। একটি শিশু—যে রাজনীতি বোঝে না, ক্ষমতা বোঝে না, প্রতিহিংসা বোঝে না—সে কী অপরাধ করেছিল? কার বিরুদ্ধে সে হুমকি ছিল?

এই প্রশ্নের কোনো যুক্তিসঙ্গত উত্তর নেই। আছে শুধু মানবতার পরাজয়।

কারাবন্দিত্ব কি পরিবারকে শিকার বানানোর লাইসেন্স?

সাদ্দাম প্রায় ১১ মাস ধরে কারাগারে। পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, তিনি রাজনৈতিক হয়রানির শিকার। এই দাবি সত্য কি মিথ্যা—তা বিচারাধীন বিষয়। কিন্তু রাষ্ট্র কি এই বাস্তবতা অস্বীকার করতে পারে যে, একজন পুরুষ দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলে তার স্ত্রী ও সন্তান সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে চলে যায়?

একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল—এমন পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে কী হয়েছে?

অভিযোগ উঠেছে, সাদ্দামের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে “সমন্বয়ক” পরিচয়ধারী শিবির সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এই অভিযোগ এখনও প্রমাণিত নয়—কিন্তু এত গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা কোথায়?

নীরবতা কি অপরাধীদের জন্য সবচেয়ে বড় বার্তা নয়—“তোমরা পার পেয়ে যাবে”?

বিচার সংস্কৃতির ভাঙনই অপরাধীর সবচেয়ে বড় শক্তি

বাংলাদেশে অপরাধীরা অপরাধ করে শুধু সাহসের জোরে নয়—তারা করে বিচারহীনতার নিশ্চয়তা নিয়ে। বছরের পর বছর ধরে আমরা দেখছি, বড় অপরাধের বিচার হয় না, বা হলেও তা দীর্ঘসূত্রতায় ঝুলে থাকে। এই সংস্কৃতিই অপরাধীকে শেখায়—ধর্ষণ করো, হত্যা করো, ক্ষমতা থাকলে কিছু হবে না।

এই ঘটনায় যদি ধর্ষণের অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি শুধু একটি হত্যা নয়—এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় লজ্জা। কারণ ধর্ষণের মামলাগুলোতে ফরেনসিক পরীক্ষা, আলামত সংরক্ষণ, দ্রুত চার্জশিট—এসব না হলে সত্য চাপা পড়ে যায়। আর চাপা পড়া মানেই অপরাধীর বিজয়।

প্রশ্ন হলো—এই মামলায় কি সত্য উদঘাটনের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?

প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া: আইনের কঠোরতা না নিষ্ঠুরতা?

এই ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় হলো—স্ত্রী ও সন্তানের জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান।

বাংলাদেশে বহুবার দেখা গেছে, গুরুতর অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকেও মানবিক কারণে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সেখানে একজন বিচারাধীন বন্দি, যার স্ত্রী ও সন্তান নৃশংসভাবে নিহত—তাকে সেই সুযোগ না দেওয়া কি আইনের কঠোর প্রয়োগ, না প্রশাসনিক নিষ্ঠুরতা?

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটে মাত্র পাঁচ মিনিট। হাতকড়া পরা অবস্থায়। স্ত্রী ও সন্তানের নিথর দেহ ছুঁয়ে দেখারও অনুমতি নেই।

রাষ্ট্র কি ভুলে গেছে—কারাগারের ভেতরেও একজন মানুষ থাকে?

জেলগেটে লাশ দেখা: রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতীক

একজন স্বামী, একজন পিতা—স্ত্রী ও সন্তানের নতুন লাশ দেখতে যায় জেলগেটে। এই দৃশ্য কোনো ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক।

রাষ্ট্র যদি মানবিক হতো, তাহলে অন্তত এই মুহূর্তে কঠোরতার বদলে সহানুভূতি দেখাত। কিন্তু এখানে দেখা গেল—আইনের অজুহাতে মানবতাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

এই প্রশ্ন আজ শুধু সাদ্দামের নয়—আগামী দিনে যে কোনো বন্দির পরিবারের জন্যই এটি একটি আতঙ্কজনক দৃষ্টান্ত।

প্রশাসনের নীরবতা: দায়িত্ব এড়ানোর সংস্কৃতি

ঘটনাটি নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়া (বা প্রতিক্রিয়ার অভাব) জনমনে আরও ক্ষোভ তৈরি করেছে। একজন দায়িত্বশীল উপদেষ্টা যখন এমন একটি ঘটনায় প্রশ্ন এড়িয়ে যান, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত আচরণ নয়—এটি রাষ্ট্রের অবস্থানকেই প্রকাশ করে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের প্রশ্নকে “অপ্রাসঙ্গিক” বলা মানে নাগরিককেই অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা।

ভয়ের সমাজ, নীরব মানুষ

এই হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। মানুষ কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। কেউ জানে, কেউ বোঝে—কিন্তু চুপ থাকে। কারণ সবাই জানে, সত্য বলার মূল্য অনেক বেশি।

এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি—যখন সমাজ নীরব দর্শকে পরিণত হয়, আর অপরাধীরা হয়ে ওঠে আরও বেপরোয়া।

ন্যায়বিচার দয়া নয়, অধিকার

নিহত নারী ও শিশুর পরিবার কোনো করুণা চায় না। তারা চায় ন্যায়বিচার। আর ন্যায়বিচার কোনো দয়া নয়—এটি সাংবিধানিক অধিকার।

এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের শনাক্তকরণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এটি আরও অনেক ঘটনার মতো ইতিহাসের পাতায় চাপা পড়ে যাবে। আর অপরাধীরা আরও এক ধাপ সাহসী হবে।

শেষ প্রশ্ন: রাষ্ট্র কি মানুষের পাশে দাঁড়াবে?

এই কলাম কোনো রায় নয়। এটি প্রশ্নের দলিল।

রাষ্ট্র কতটা নিষ্ঠুর হলে এমন হত্যাকাণ্ড সম্ভব হয়?

বিচার সংস্কৃতি কতটা ভেঙে পড়লে অপরাধীরা ভয়হীন হয়?

একজন মানুষকে স্ত্রী–সন্তানের লাশ দেখতে কেন যেতে হয় জেলগেটে?

আজ বাগেরহাটে যা ঘটেছে, কাল তা যে কোনো জায়গায় ঘটতে পারে। ন্যায়বিচার যদি নির্বাচিত হয়, মানবিকতা যদি শর্তসাপেক্ষ হয়—তাহলে নিরাপত্তা কেবল শব্দ হয়েই থেকে যাবে।

এখনও সময় আছে। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার। এবং অন্তত এটুকু প্রমাণ করার—রাষ্ট্র এখনও মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখে।

লেখক: ড. আজিজুল আম্বিয়া

কলাম লেখক ও গবেষক

ই-মেইল: [email protected]

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার