বিজ্ঞাপন
ভোট, আমানত ও নাগরিক দায়িত্ব: নির্বাচনে সিদ্ধান্ত নেবেন যেভাবে
ড. আজিজুল আম্বিয়া
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১৪ এএম
বিজ্ঞাপন
জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি দেশের রাজনৈতিক জীবনের নিয়মিত ঘটনা হলেও এর সামাজিক ও নৈতিক গুরুত্ব গভীর। একটি নির্বাচনের মাধ্যমে কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনই হয় না; নির্ধারিত হয় রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং আগামী কয়েক বছরের শাসন কাঠামো। এ কারণে “কাকে ভোট দেবেন”—এই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত পছন্দের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি নাগরিক সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় রাজনীতি ও ধর্ম—দুটি বিষয়ই মানুষের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে অনেক নাগরিক ভোটের সিদ্ধান্তকে নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করেন। তবে এই বিবেচনা আবেগ বা দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে যুক্তি, তথ্য ও নৈতিক মানদণ্ডের আলোকে হওয়াই কাম্য।
ভোট একটি নাগরিক ক্ষমতা
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোট হলো নাগরিকের সবচেয়ে কার্যকর সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণ শাসনক্ষমতার অংশীদার হয়। তবে ভোট কেবল অধিকার নয়; এটি দায়িত্বও। ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব যেমন ব্যক্তিগত পর্যায়ে পড়ে, তেমনি তা সামষ্টিকভাবেও রাষ্ট্র ও সমাজকে প্রভাবিত করে।
এ কারণেই আধুনিক গণতন্ত্রে “সচেতন ভোটার” ধারণাটি গুরুত্ব পেয়েছে। সচেতন ভোটার আবেগ নয়, তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন; গুজব নয়, যাচাই করা তথ্যকে গুরুত্ব দেন।
আমানতের ধারণা ও নৈতিক দায়
ইসলামী নৈতিক দর্শনে দায়িত্ব ও ক্ষমতাকে “আমানত” হিসেবে দেখা হয়। কুরআনে বলা হয়েছে, আমানত তার যোগ্য ব্যক্তির কাছে অর্পণ করতে। অনেক ধর্মপ্রাণ নাগরিক এই ধারণাকে ভোটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য মনে করেন। তাঁদের দৃষ্টিতে ভোট দেওয়া মানে নেতৃত্ব নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করা, যার জন্য ব্যক্তি নৈতিকভাবে জবাবদিহির আওতায় থাকেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি ভোটারকে আরও সতর্ক হতে উৎসাহিত করে—কারণ এখানে সিদ্ধান্তের সঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত। তবে এই সতর্কতা যেন একপেশে বা আবেগনির্ভর না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রার্থীর যোগ্যতা ও অতীত রেকর্ড
ভোট দেওয়ার আগে প্রার্থীর যোগ্যতা মূল্যায়ন করা একটি মৌলিক বিষয়। যোগ্যতা বলতে শুধু শিক্ষাগত সনদ বোঝায় না; বরং প্রশাসনিক দক্ষতা, নৈতিকতা, আইন মানার মানসিকতা এবং জনগণের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও এর অংশ।
প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড এখানে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে। তিনি আগে কোনো দায়িত্বে থাকলে সেখানে তাঁর ভূমিকা কী ছিল—তা পর্যালোচনা করা জরুরি। দুর্নীতি, সহিংসতা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে সেগুলোর তথ্য যাচাই করা সচেতন ভোটারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
চরিত্র ও সততার প্রশ্ন
রাষ্ট্র পরিচালনায় চরিত্র ও সততার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। ইতিহাসে দেখা যায়, দুর্বল নৈতিক মানদণ্ডের নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে সংকটে ফেলে। তাই ভোটারদের কাছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সততা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হওয়া স্বাভাবিক।
এখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে আচরণ ও কাজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশ্য ধর্মচর্চা থাকলেও যদি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আচরণে স্বচ্ছতার অভাব থাকে, তাহলে সেটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। একইভাবে, ধর্মীয় পরিচয় কম হলেও যদি কেউ ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল হন, সেটিও বিবেচনায় আসা উচিত।
দক্ষতা ও বাস্তব সক্ষমতা
নৈতিকতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দক্ষতাও অপরিহার্য। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা একটি জটিল কাজ, যেখানে আইন, অর্থনীতি, কূটনীতি ও প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয় প্রয়োজন। ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের পাশাপাশি এই বাস্তব সক্ষমতা আছে কি না—সেটিও ভোটারকে বিবেচনা করতে হবে।
ইসলামী ইতিহাসেও দক্ষতার গুরুত্বের উদাহরণ আছে, যেখানে সততা ও জ্ঞান—দুই গুণের সমন্বয়কে আদর্শ হিসেবে দেখা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক।
জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা
একজন জনপ্রতিনিধির মূল পরিচয় হওয়া উচিত জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি কতটা সহজলভ্য, সাধারণ মানুষের সমস্যায় কতটা যুক্ত, এবং ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে তাঁর ভূমিকা কেমন—এসব বিষয় ভোটারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
অনেক সময় দেখা যায়, নির্বাচনের আগে জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হলেও নির্বাচনের পর সেই সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। ভোটার হিসেবে এই ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন
ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন যেকোনো রাষ্ট্রের ভিত্তি। ধর্মীয় ও সাংবিধানিক—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এটি গুরুত্বপূর্ণ। যেসব প্রার্থী বা রাজনৈতিক শক্তি আইনের ঊর্ধ্বে থাকার মানসিকতা পোষণ করেন, তারা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারেন।
ইসলামী নৈতিকতায়ও ন্যায়বিচারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে—এমনকি নিজের বা নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেও ন্যায়ের পক্ষে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নীতি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দেশপ্রেম ও জাতীয় স্বার্থ
দেশপ্রেম প্রায়ই আবেগী ভাষায় প্রকাশ পায়, কিন্তু ভোটের ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত দেশপ্রেম প্রকাশ পায় জাতীয় স্বার্থ রক্ষার মাধ্যমে—দুর্নীতি প্রতিরোধ, রাষ্ট্রের সম্পদ সংরক্ষণ এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।
ভোটার হিসেবে প্রশ্ন করা জরুরি—প্রার্থী বা রাজনৈতিক শক্তির সিদ্ধান্ত ও অবস্থান জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নৈতিক উন্নয়ন—এই তিনটি বিষয় তাদের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যেসব প্রার্থী তরুণদের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতে পারেন, তারা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে এসেছে, যেখানে সন্তানদের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।
তথ্য যাচাই ও গুজব থেকে সতর্কতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য নির্বাচনকে প্রভাবিত করার একটি বড় উপকরণ হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় শিক্ষায় যেমন খবর যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আধুনিক সাংবাদিকতাও একই নীতির কথা বলে।
একটি পোস্ট, ভিডিও বা বক্তব্য দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। একাধিক উৎস থেকে তথ্য যাচাই করা সচেতন নাগরিকত্বের অংশ।
ভোট না দেওয়ার প্রশ্ন
অনেকে মনে করেন, ভোট না দিয়ে নিরপেক্ষ থাকা যায়। বাস্তবে ভোট না দেওয়া মানে সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, যার ফলে অন্যের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে ওঠে। ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হলে অংশগ্রহণ না করাও একটি সিদ্ধান্ত—এবং তার প্রভাবও থাকে।
উপসংহার
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নাগরিকদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে—দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ। ধর্মীয় নৈতিকতা, নাগরিক কর্তব্য ও বাস্তব বিশ্লেষণ—এই তিনটির সমন্বয়েই একটি পরিমিত ও সচেতন ভোটের সিদ্ধান্ত সম্ভব।
ভোট কোনো একদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের ভিত্তি গঠনের একটি প্রক্রিয়া। তাই আবেগ নয়, বিবেক ও তথ্যের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হতে পারে এই সময়ের সবচেয়ে দায়িত্বশীল নাগরিক ভূমিকা।
লেখক পরিচিতি : ড. আজিজুল আম্বিয়া , কলাম লেখক ও গবেষক ।
বিজ্ঞাপন