বিজ্ঞাপন
হঠকারী সিদ্ধান্ত ক্ষতিগ্রস্ত করবে প্রাথমিকের ২ কোটি শিক্ষার্থীকে
মাছুম বিল্লাহ
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৯ এএম
বিজ্ঞাপন
চলতি জানুয়ারি থেকে সারা দেশের এক লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই কোটি ৫ লাখ শিক্ষার্থীকে নতুন মুল্যায়নের আওতায় নিয়ে আসার কথা বলছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
আমাদের শিশু শিক্ষার্থীরা যেন গিনিপিগ! তাদের অসহনীয় যন্ত্রণা আর জীবন শেষ করে দেয়ার বিনিময়ে তাদের নিয়ে পরীক্ষার ওপর পরীক্ষা চলছে, এ আর কতদিন? প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে হঠাৎ মূল্যায়ন পদ্ধতি ও মানবন্টনে পরিবর্তনের ছক কষেছে এনসিটিবি। বছর বছর খুদে শিক্ষার্থীদের ওপর এই হঠকারী সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের শারীরিক ও মানসকি যন্ত্রণা! যখন তখন হুটপাট পরিবর্তন করার অধিকার তাদের কি আসলেই আছে? চলতি জানুয়ারি থেকে সারা দেশের এক লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই কোটি ৫ লাখ শিক্ষার্থীকে নতুন মুল্যায়নের আওতায় নিয়ে আসার কথা বলছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হচেছ। আর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমানো হয়েছে এবং সব বিষয়ে রাখা হয়েছে মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষা। শিশুদের নিয়ে লেখাপড়া শেখানোর নামে এতো টানাটানি কেন? সবাই শুধু মুল্যায়ন নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু কার্যকরী শ্রেণিকার্যক্রম যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কার্যকরীভাবে কিছু শিখবে সেই ব্যবস্থাটির কথা কেউ বলছেনা। কিসের মূল্যায়ন, কাদের মূল্যায়ন? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফলপ্রসূ লেখাপড়া কতটুকু হচেছ? দেশব্যাপী কোচিংয়ের প্রসার ঘটছে, শিক্ষার মান কমছে আর আমাদের শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ক’ দিন পরপর নতুন মূল্যায়ন নিয়ে যেন ব্যস্ত।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ থেকে ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সাতবার শিক্ষাক্রম বা শিক্ষাপদ্ধতিতে পরির্বতন আনা হয়েছে, ভাবখানা এমন যে, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ তাই যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির সর্বশেষ পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে এত ঘন ঘন পরিবর্তন আনা হচেছ! আসলে এর সাথে জড়িত রাজনীতি, অর্থ, শিক্ষা নিয়ে সঠিক চিন্তা না করা আর অনেকটাই না বুঝে করা। উন্নত বিশ্বের দোহাই দেয়া হয় কারিকুলাম পরিবর্তনের সময়ে। উন্নত বিশ্বে যে পরিবর্তন আনা হয় তা সময়ের সাথে তাল মেলানোর জন্য কারিকুলামের আংশিক পরিবর্তন। আমাদের মতো সব উল্টিয়ে হা করে বসে থাকা নয়। যে চিত্র আমরা ’ কম্পিটেন্সি বেজড’ কারিকুলামের নামে দেখেছি! এই উল্টা-পাল্টার সাথে যারা জড়িত থাকে তাদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
বিগত সরকারের আমলে সমস্ত জনমত উপেক্ষা করে, শিক্ষকদের এবং শিক্ষাবিদদের কথা অমান্য করে পত্রি-পত্রিকার কথায় কর্ণপাত না করে যারা সরকারকে তথাকাথিত ’ কম্পিপেন্সি বেজড’ কারিকুলাম করার জন্য উৎসাহ দেয়াসহ সব কিছু করেছেন তাদের শাস্তির প্রয়োজন ছিল কারন তাদের কোনও অধিকার ছিলনা কোটি কোটি শিক্ষার্থী, কোটি কোটি অভিভাবকদের পুরো অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়া, পুরো শিক্ষক সমাজকে এক ধন্দের মধ্যে ফেলে দিয়ে তাদের ‘নেফারিয়াজ ডিজাইন’ বাস্তবায়ন করার সংকল্প বাস্তবায়ন করার। ওইসব কুশীলবদের শাস্তি হয়নি। ফলে, আবার নতুন করে তাদেরই কিছু অনসারীরা মাথাচড়া দিয়ে উঠছে। দেশে শিক্ষা নেই, শিক্ষার মান নেই, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসেনা, শিক্ষকরা টিউশনি নিয়ে ব্যস্ত, তারা পড়াশোনা করেন না। এধরনের প্রতিটি বিষয় গভীর পর্যবেক্ষণ, রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ দাবী করে। সেসবের দিকে না যেয়ে ক’দিন পর পর কারিকুলাম পরিবর্তন, মূল্যায়ন পরিবর্তন আর নম্বর বন্টনে পরিবর্তন! যেন সেই পুরনো খেলা! এ খেলা তো গত পনের বছরে এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তা নিয়মিত করতো, শুধু অর্থের জন্য। এর পেছনে সৎ কোন উদ্দেশ্যে ছিলনা।
আমাদের কারিকুলাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচবার ৫-১০ শতাংশ পরিবর্তন করা হয়েছিল। এটি যৌক্তিক! কারণ হঠাৎ করে সব উল্টিয়ে দেয়া বাস্তবসম্মত নয়। তারপরেও অনেকে বলেন ‘আমুল পরিবর্তন করতে হবে কিংবা ঢেলে সাজাতে হবে’ এটি সেই অর্থে বাস্তব সম্মত কথা নয়। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষাক্রমে আনা হয় বড়সর পরিবর্তন। ঐ শিক্ষাক্রমটি ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ নামে পরিচিতি ছিল। কিন্তু সৃজনশীলের পরিবর্তে মুখস্ত করার প্রবণতা আরও বেড়ে যায়, নকল করার গতি বেড়ে যায়, আর নোট ও গাইডের ব্যবসা আরও বেশি হয়েছে কারন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সিকিভাগও বিষয়টি আয়ত্ত্ব করতে পারেননি। এ পদ্ধতি প্রণয়নের ৯ বছরের মাথায় ২০২১ আবারও শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনা হয়। সবশেষ বিগত সরকার যে শিক্ষাক্রমটি প্রণয়ন করেছিলো তা আগের যে কোনো শিক্ষা পদ্ধতির চেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়ে, পড়তে বাধ্য কারন তারা পুরোপুরি উল্টিয়ে দিয়ে সমাধানের কোন পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। লিখিত পরীক্ষা পুরো বাদ দেয়া হয়েছিল।
সেই একই খেলা শিক্ষার্থীরা কি পড়ছে, কি জানছে, শ্রেণিকক্ষে কি হচেছ, শিক্ষকরা কি করছেন এসবের তোয়াক্কা না করে ’ ইউটোপিয়ান’ আইডিয়া বাস্তবায়নে সবধরনের চেষ্টাই করেছিল। শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের তো সিস্টেম যত সহজ হবে, তাদের জন্য তত ভাল বলে তারা মনে করেন। তারপরেও যেসব অভিভাবক অনেকটা সচেতন তারা বিষয়টি বুঝতে পেরে শেষে রাস্তায় নেমেছিলেন। কিন্তু তাদের কথা না শুনে উল্টো তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছিল সরকার। শাস্তি হওয়ার কথা ছিল এনসিটিবির তথাকথিত কর্মকর্তাদের যারা দশগুণ উৎসাহ নিয়ে সেই কাজটি করতে যাচিছলেন। সরকারকে তাদের সঠিক পরামর্শ দেয়ার কথা কারন সরকারে যারা থাকেন তাদের শিক্ষার এত গভীরে যাওয়া সম্ভব হয়না। সরকারের শিক্ষা বিভাগে যারা থাকেন তাদের উচিত সরকারকে বুঝানো কোন পদ্ধতি কার্যকর, কেন কার্যকর ইত্যাদি। সেটি না করে তারা প্রশিক্ষণের নামে কোটি কোটি রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করেছেন, করেনার পরে অস্থির শিক্ষার ব্যবস্থার ওপর তাদের অত্যাচার পুরো শিক্ষাকে ধ্বংসের প্রান্তে দাঁড় করিয়েছিল।
আবার সেই নতুন খেলায় যেন তারা মেতেছেন। নতুন এই পদ্ধতিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে শ্রেণি কার্যক্রম থাকলেও ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে সামষ্টিক মুল্যায়ন ( লিখিত পরীক্ষা) যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে শ্রেণি মুল্যায়ন ও সমাষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে নতুন করে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। নতুন এই মুল্যায়ন প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করতে শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য মাস চারেক সময় লেগে যাবে। জাতীয় নির্বাচন ও রোজার জন্য দুইমাস বন্ধ থাকবে প্রতিষ্ঠান।মন্ত্রণালয় তারপরেও এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বলেছে এনসিটিবিকে। এটি কেনো?
সামস্টিক মূল্যায়নে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা রাখা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক মুল্যায়ন ও ৫০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হবে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ৩০ শতাংশ ধারাবাহিক মুল্যায়ন ও ৭০শতাংশ সামষ্টিক মুল্যায়ন করতে বলা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে যথাক্রমে লিখিত ৩৫, ৩০ ও ৪০ নম্বর এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা হিসেবে ১৫, ২০ ও ১০ নম্বর রাখা হয়েছে। এই তিন বিষয়ে দুই ঘন্টা লিখিত পরীক্ষা ও দুই ঘন্টা মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটি বিষয়ের জন্য চার ঘন্টার পরীক্ষা মানে শিক্ষার্থীদের শরীর ও মনের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করা। আমাদের মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের কোন পরীক্ষাও চার ঘন্টার নেই, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দুই একটি কোর্সে চার ঘন্টার পরীক্ষা থাকে। আমাদের মনে আছে পরিণত বয়সেও যেদিন চারঘন্টার পরীক্ষা থাকতো আমাদের চোখ মুখ শুকিয়ে যেত। সেই যাতনা একেবারে শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচেছ। এটি তো রীতিমতো অন্যায়!
এতো দেখছি বিদেশের পরামর্শে করা তথাকথিত কারিকুলামের পুনরাবৃত্তি! বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ২০ নম্বর রাখা হয়েছে। শ্রেণিকাজে সক্রিয়তার জন্য আরও ৫ নম্বর পাবে শিক্ষার্থীরা। ভাষাগত দক্ষতায় ১০ নম্বর, ক্লাস টেস্টে ১৫ নম্বর রয়েছে। বাদ হওয়া কারিকুলামের মতো মুল্যায়নের তথ্য সংরক্ষণ, শিখন অগ্রগতির প্রতিবেদন, পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে হলে অন্তত ৪০ পয়েন্ট অর্জন করার কথাও বলা হয়েছে। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার আসল হাক-হলিকত কি এসব কর্তাব্যক্তিরা জানেন যে তারা এতসব বাস্তবায়নের কথা চিন্তা করছেন? বিদ্যমান ব্যবস্থায় ধারাবাহিক মূল্যায়ন ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে। লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষা ছিলনা। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষা ছিল ৮০ নম্বরের এবং ছিল ধারাবাহিক মূল্যায়ন। অন্তবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শুরু হয় নতুন কারিকুলাম স্থগিত করে ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠ্যবই প্রণয়ন করে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষাকার্যক্রম চলেছে। সরকার অবশ্য ঘোষণা দিয়েছে যে, ২০২৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করা হবে। কিন্তু ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ যার মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন আর রমযানের বন্ধসহ প্রায় দুই মাস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। মাত্র কয়েক মাসের জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন এই চাপ কেনো? এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষার কনসালটেশন কমিটিরও কোন মতামত নেওয়া হয়নি। তারা বহু সুপারিশ দাখিল করেছেন কিন্তু সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। এ কেমন কথা?
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বারবার ধাক্কা দিয়ে এক অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়া হচেছ। পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের পাশাপাশি মুল্যায়ন পদ্ধতি চার বছরে চার বার পরিবর্তনের ফলে সবাই যেন খেই হারিয়ে ফেলছে। বর্তমানে যে সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচেছ তার পেছনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যাচেছ। বারবার শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। এটি নিয়ে আর যেন কেউ খেলা না করেন! নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন যে সরকার আসবে তাদের ভেবেচিন্তে কিছু একটা করতে দিন, দয়া করে নিজেরা নিজেদের স্বার্থে বিশেষ করে শিক্ষা বিভাগের কিছু লোভী আর অর্বাচীন কর্মকর্তাদের এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকার অনুরোধ করছি।
লেখক: সাবেক ক্যাডেট কলেজ শিক্ষক
বিজ্ঞাপন