বিজ্ঞাপন
মজুরি বোর্ড কীভাবে কাজ করে? কারা থাকেন এই বোর্ডে
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২৮ পিএম
বিজ্ঞাপন
জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার কারনে কিছুদিন পরপরই পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি ওঠে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গত কয়েক দিনের আন্দোলন, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কত হওয়া উচিত এই বিষয়টি।
মাসে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরি, কালো তালিকাভুক্তি প্রথা বন্ধ এবং চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহালের দাবিতে মিরপুর, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। শ্রমিকরা বলছেন, বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াতসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেশের বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মজুরি বোর্ড। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং শিল্পের উৎপাদন খরচসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করে এই বোর্ড। সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত হয় এই বোর্ড। এই বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত মজুরি ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠিত হয়। বোর্ডের কাজ, সদস্যদের দায়িত্ব এবং মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই, এই সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হল।
মজুরি বোর্ডে কারা থাকেন?
নিম্নতম মজুরি বোর্ডে স্থায়ীভাবে চারজন সদস্য থাকেন। তারা হলেন একজন চেয়ারম্যান, একজন নিরপেক্ষ সদস্য, একজন মালিক প্রতিনিধি ও একজন শ্রমিক প্রতিনিধি।
কোনো নির্দিষ্ট শিল্পের জন্য মজুরি নির্ধারণের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট শিল্পের মালিক ও শ্রমিকপক্ষের একজন করে প্রতিনিধি বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এভাবে মোট ছয় সদস্যের বোর্ড গঠিত হয়।
পোশাকশিল্পের নতুন মজুরি বোর্ডে কারা আছেন?
টানা বিক্ষোভ ও কারখানা বন্ধের ঘটনার মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। রোববার (১ নভেম্বর) সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
বিচারপতি শেখ আশফাকুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে ছয় সদস্যের এ বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
বোর্ডের বাকি সদস্যরা হলেন মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামছুদ্দিন ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। অন্যদিকে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিআইডাব্লিউএফ) সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। এ ছাড়া বোর্ডে নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। এই বোর্ড সব পদে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির সুপারিশ করবে। বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা ও গেজেট হিসেবে প্রকাশ করবে সরকার।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০২৬)-এর ক্ষমতাবলে এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কীভাবে কাজ করে মজুরি বোর্ড?
সরকার, মালিকপক্ষ কিংবা শ্রমিকপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো শিল্পের নিম্নতম মজুরি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আইন অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান রয়েছে। বর্তমানে দেশে ৪৬টি খাতের জন্য মজুরি বোর্ড কাজ করছে।
বোর্ড গঠনের পর চেয়ারম্যান সভা আহ্বান করেন। এরপর সংশ্লিষ্ট শিল্পের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, আয়-ব্যয় ও কর্মপরিবেশ সম্পর্কে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ তৈরি করা হয়।
মজুরি নির্ধারণে যে সকল বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়
১. শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও জীবনমান।
২. দেশের মুদ্রাস্ফীতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।
৩. উৎপাদন খরচ ও শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা।
৪. উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্য।
৫. কাজের ধরন, ঝুঁকি ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা।
এসব বিষয় পর্যালোচনা করে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।
মজুরি চূড়ান্ত হয় যেভাবে
বোর্ডের কাজ শেষ হলে প্রথমে মজুরি নির্ধারণের একটি খসড়া সুপারিশ তৈরি করা হয়। এরপর তা গেজেট আকারে প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত ও আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়। এ জন্য ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাওয়া আপত্তি ও পরামর্শ পর্যালোচনা করে বোর্ড চূড়ান্ত সুপারিশ সরকারের কাছে পাঠায়। বোর্ড গঠনের নির্দেশ পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে সুপারিশ জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে বোর্ডের সুপারিশই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। শ্রম আইনের ১৪০ ধারা অনুযায়ী, সরকার সুপারিশ পাওয়ার পর মজুরি নির্ধারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। প্রয়োজন হলে সরকার ৪৫ দিনের মধ্যে সুপারিশ পুনর্বিবেচনার জন্য বোর্ডে ফেরত পাঠাতে পারে। বোর্ড পুনরায় পর্যালোচনা করে সংশোধিত সুপারিশ দিলে সরকার গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে চূড়ান্ত মজুরি ঘোষণা করে। গেজেট প্রকাশের দিন থেকে নতুন মজুরি কার্যকর হয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকে। আইন অনুযায়ী, গেজেটে প্রকাশিত মজুরির হারই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।