Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

১০৬ দেশের ভোটে এলডিসি উত্তরণে ৩ বছর সময় পেল বাংলাদেশ

Icon

জাগো বাংলা প্রতিবেদন

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৮ এএম

১০৬ দেশের ভোটে এলডিসি উত্তরণে ৩ বছর সময় পেল বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপন

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ১০৬টি দেশ, বিপক্ষে ছিল ১৮টি সদস্য রাষ্ট্র। ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণের সুযোগ পাবে বাংলাদেশ।

গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের পক্ষে উরুগুয়ে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সময় বাড়ানোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত এলেও বাড়তি সময়ের সুফল পেতে দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

তাদের মতে, সময় বাড়ানো সাময়িক স্বস্তি দিলেও এটি সংস্কার পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নয়। ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের দুর্বলতা দূর করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং প্রধান রপ্তানি বাজারে বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে ২০২৯ সালে উত্তরণের পরও রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি হতে পারে।

সংস্কার বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) গত মে মাসের ‘ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট: বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশীয় সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়া বাড়তি প্রস্তুতিকাল কীভাবে টেকসই উত্তরণে সহায়তা করবে, তা বোঝা কঠিন। ভবিষ্যতে আবার সময় বাড়ানোর আবেদন সমর্থনের সম্ভাবনাও দেখছে না কমিটি।

বাংলাদেশ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মসৃণ উত্তরণ কৌশল গ্রহণ করে। এতে পাঁচটি কৌশলগত ক্ষেত্রের আওতায় ১৫৭টি সময়বদ্ধ পদক্ষেপ রয়েছে। তবে জাতিসংঘের মূল্যায়নে বাস্তবায়নের ধীরগতি, মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়হীনতা এবং দুর্বল জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

রপ্তানিতে পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) ১৯ অক্টোবরের উপস্থাপনা অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একই সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমাতে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ ও প্রযুক্তিপণ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিল্পের উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, শ্রমিকের দক্ষতা ও পণ্যের মান উন্নত করাও জরুরি।

লজিস্টিকস ব্যয় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার আরেকটি বড় বাধা। এ ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক মান প্রায় ১০ শতাংশ। বন্দরজট, শুল্কায়নে বিলম্ব ও দুর্বল পরিবহনব্যবস্থার কারণে পণ্য সরবরাহে ব্যয় বাড়ছে। তাই বন্দর ও শুল্কপ্রক্রিয়া সহজ করা, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো কার্যকর করা এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখার উদ্যোগ

এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ হবে আন্তর্জাতিক বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখা। তবে প্রস্তুতিকাল বাড়লেই সব শুল্কসুবিধার মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না। বাজারভেদে নিয়ম ও শর্ত আলাদা হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাসসহ বিকল্প সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।

এদিকে, এলডিসি হিসেবে পাওয়া মেধাস্বত্ব ও ওষুধের পেটেন্টসংক্রান্ত বিশেষ ছাড়ের ক্ষেত্রে উত্তরণের পর পরিবর্তন আসতে পারে। তাই ওষুধশিল্পে গবেষণা, উন্নয়ন ও কাঁচামাল উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক মান পূরণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের তাগিদ

অ্যামচ্যামের সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ এনপিবি নিউজকে বলেন, এলডিসি উত্তরণকে শুধু ঝুঁকি হিসেবে না দেখে অর্থনীতির কাঠামো বদলের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে জোর দেওয়ার পাশাপাশি নতুন রপ্তানি খাত বিকাশ করতে হবে।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এনপিবি নিউজকে বলেন, উত্তরণের পর অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা হারানো ব্যবসার প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর বড় ধাক্কা হতে পারে। বাড়তি সময় কাজে লাগিয়ে সংস্কার বাস্তবায়ন এবং রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত মানদণ্ড পূরণের প্রস্তুতি নিতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। তবে বাড়তি সময়কে স্বস্তির অবকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোন সংস্কার কখন বাস্তবায়ন হবে, কোন প্রতিষ্ঠান দায়িত্বে থাকবে এবং অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে—তা নির্দিষ্ট করে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও রাজস্ব, ব্যাংকিং ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে অগ্রগতি ছাড়া শুধু সময় বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী তিন বছরে ব্যাংকিং ও রাজস্ব সংস্কার, নতুন রপ্তানি পণ্য ও বাজার তৈরি, বন্দর ও জ্বালানিব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাণিজ্যচুক্তি এগিয়ে নেওয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত লক্ষ্যের বিপরীতে অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৯ সালের মধ্যে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বাড়তি সময়ের সুফল সীমিত হয়ে পড়বে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান ধরে রাখাই হবে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার