Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

সশস্ত্র দুই গ্রুপের আধিপত্যের লড়াইয়ে স্থবির সাজেক, নেপথ্যে কারা?

Icon

জাগো বাংলা প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৪ এএম

সশস্ত্র দুই গ্রুপের আধিপত্যের লড়াইয়ে স্থবির সাজেক, নেপথ্যে কারা?

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে পর্যটন মৌসুম চলছে। পর্যটন মৌসুমে সাজেকে পর্যটকদের ঢল নামে। বছরের এ সময় কয়েক লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে অপরূপ সাজেকে। কিন্তু পাহাড়ি দু’টি সশস্ত্র গ্রুপের আধিপত্য লড়াই ও চাঁদাবাজির কারণে পুরো সাজেক এখন স্থবির। পর্যটক না থাকায় পর্যটন নগরীর চারদিক সুনশান নীরবতা।

একটানা এক সপ্তাহের অবরোধের কারণে পুরো সাজেক অচল হয়ে পড়ছে। রিসোর্ট-কটেজে নেই অতিথি, দোকানপাটে কমছে নিত্যপণ্যের মজুত। বন্ধ আয়-রোজগার, অন্যদিকে খাদ্য ও জরুরী ঔষুধের সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা পড়েছেন বহুমুখী সংকটে।

সাজেকের মুদি দোকানি জনসিম চাকমা জানান, তার দোকানে চাল ও চিনি শেষ হয়ে গেছে। আশপাশের দোকানগুলোতেও ডাল, সয়াবিন তেল, চিনি এবং ডিজেল-অকটেনের মজুত ফুরিয়ে আসছে। পরিস্থিতি এতটা জটিল হবে, তা আগে ধারণা করতে পারেননি বলে জানান এ ব্যবসায়ী।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা জানান, কিছু এলাকায় পণ্যবাহী গাড়ি না পৌঁছানোয় স্থানীয়দের মধ্যে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফার্মেসিতে কিছু ওষুধ থাকলেও জরুরী জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর ঘাটতি রয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে পর্যটক না থাকায় হোটেল-মোটেল-কটেজ এবং রেঁস্তোরাগুলো বন্ধ রয়েছে। পর্যটন নির্ভও যানগুলো চলাচল করছে না। যে কারণে সংশ্লিষ্ট মালিক লোকসান গুণছে আর শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছে।

সাজেকের রেঁস্তোরা ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তার হোটেলে আটজন কর্মচারী কাজ করেন। অবরোধের কারণে তারা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী জিয়াউল হক যুবরাজ জানান, পর্যটক না থাকলেও রিসোর্ট ও কটেজে অনেক কর্মচারী অবস্থান করছেন। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় সেখানে সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে সাজেকের সংকট নিরসনে গত ২৬ অক্টোবর উজোবাজারে প্রশাসনের প্রতিনিধি ও অবরোধকারীদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া ও রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, দুই জেলার জেলা প্রশাসক এবং দুই জেলার পুলিশসহ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তার উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে অবরোধকারীদের সাথে পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আলোচনা হয়। এতে ৪দফা দাবি নিয়ে উভয়ের আলোচনা সফল হয়। তবে একটি দফা নিয়ে কোন পক্ষ এক হতে পারিনি। অবরোধকারীরা যে কারণে মূল দাবি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য এ্যাড. দীপেন দেওয়ান বলেন, আমাদের আলোচনা অবশ্যই ফলপ্রসু হয়েছে। তাদের ৫দফা দাবি ছিলো। ৫দফা দাবির মধ্যে তাদের ৪টি দাবি বুঝাতে সক্ষম হয়েছি, তারা মেনে নিয়েছে। আরেকটা দাবি সময় সাপেক্ষ। হুট করে কোন সিন্ধান্ত দিতে পারি না। সেটা আইন শৃঙ্খলার বিষয়। ওরা যেভাবে গ্যারান্টি দেয় আমরা সেরকম ভাবে গ্যারান্টি দিতে পারি না। বাস্তবতার নিরিখে আমাদের সিন্ধান্ত নিতে হবে। ওনাদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছি যে এটা সময় সাপেক্ষ। তাদেরকে বলেছি আপনারাও ভাবেন, চিন্তা করেন। একটা সুন্দর পরিবেশ যেন গড়ে উঠে। যে কারণে এক দফা ঝুলে আছে। আশাকরি তারা বুঝবে। এটা বাস্তবায়নে প্রয়োগের ক্ষেত্রে সময় সাপেক্ষ।

সাজেক নিয়ে যে সংগঠনটি নামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের নেপথ্যে কারা?

সাজেকের মোটেল মালিকরা এ খাত থেকে প্রায় ৩০কোটি টাকার মতো বাণিজ্য করে থাকে। পর্যটকদের ভুঁজি ভোজনে রয়েছে অনেক রেঁস্তোরা। এ রেঁস্তোরাগুলো প্রতি বছর পর্যটক মৌসুমে প্রায় ২২-২৫কোটি টাকার বাণিজ্য করে।

এছাড়াও পর্যটকদের পরিবহনে সাজেকে একটি ট্যুরিস্ট নির্ভর পরিবহন খাত গড়ে উঠেছে। পরিবহনগুলোর কাজ হলো সারা বছর পর্যটকদের সাজেক থেকে খাগড়াছড়ি এবং খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক আনা-নেওয়া করা। পরিবহন খাতের মালিকরা পুরো বছর জুড়ে ৩০ কোটি টাকার মতো পরিবহন ব্যয় পেয়ে থাকে।

এছাড়াও মসলা জাতীয় পণ্য আদা, হলুদ, বৃক্ষের মধ্যে- ফুলঝাড়– এবং বাঁশ সাজেকের অন্যতম অর্থনৈতিক বড় খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে।

এসব খাত থেকে শান্তিচুক্তি বিরোধী, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট সংক্ষেপে ইউপিডিএফ সাজেকে পর্যটন ব্যবসা, পরিবহন খাত, ট্যুরিস্টদের জন্য ঝরণা থেকে সংগ্রহ করা পানি এবং কৃষি পণ্য ও বাঁশ, ফুলঝাড়– ব্যবসা থেকে চাঁদা নিয়ে থাকে। চাঁদা পরিশোধ করে সাজেকে ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে ব্যবসায়ীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিকার করেছেন।

সাজেকে পিসিজেএসএস’র যে ভাবে আবির্ভাব

জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সংক্ষেপে পিসিজেএসএস দলের সশস্ত্র সংগঠন চোখ দেয় পর্যটন নগরী সাজেকে। অনেক বছর ধরে সাজেক নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে পিসিজেএসএস। কিন্তু কিছুতেই ইউপিডিএফ’র কৌশলে নিয়ন্ত্রণ নিতে পারিনি।

অবশেষে বেশ কয়েক মাস আগে সুকৌশলে সাজেক নিয়ন্ত্রণ নেয় পিসিজেএসএস। স্থানীয়দের মতে, সাজেকের প্রায় ৭০ভাগ এরিয়া দখলে নিয়েছে সন্তু লারমার সংগঠনটি। সাজেক দখলে নিতে যিনি সামনে থেকে পিসিজেএসএসকে সফলতার সাথে সহযোগিতা করছেন তার নাম হলো তরু চাকমা।

কে এই তরু চাকমা?

তরু চাকমা একজন সশস্ত্র ক্যাডার। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট সংক্ষেপে ইউপিডিএফ সংস্কার নামে পরিচিতি ছোট সংগঠনটির খাগড়াছড়ি শাখার সশস্ত্র কমান্ডার। বসবাস করে খাগড়াছড়ি সদরে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি ভারতের মিজোরাম প্রদেশের আইজলের স্থায়ী নাগরিক। তার পরিবার নিয়ে তিনি সেখানে বসবাস করেন। সশস্ত্র কর্মকান্ড পরিচালনা করতে তিনি বাংলাদেশের খাগড়াছড়িতে বসবাস করছেন একা।

মাস দু’য়েক আগে তিনি মিজোরামের নিজ জেলা আইজলে অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন। পরে পিসিজেএসএস’র ভারতীয় শাখার সহযোগিতায় তিনি জেল থেকে ছাড়া পান এবং রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার খেদারমারা ইউনিয়নে এসে অবস্থান করেন। এখান থেকে তিনি পিসিজেএসএস’র নেতাদের সাথে যোগাযোগ করতে থাকেন। পরে তিনি সারোয়াতলী হয়ে পিসিজেএসএস’র নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যোগ দেন এবং তার হাত ধরে পিসিজেএসএস সাজেকে কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করে ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত বেশির ভাগ এরিয়া দখলে নেয়।

কূলহারা ইউপিডিএফ সাজেকের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে নয়া কৌশল

প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ অস্ত্রের বলে এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারায় তারা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। তারা এলাকার স্থানীয় এবং তাদের রাজনৈতিক শাখার কর্মীদের নিয়ে একটি ছায়া সংগঠন দাড় করায়। সংগঠনটির নাম ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। স্থানীয় জনগণ, সংবাদ কর্মীদের সাথে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। এ সংগঠনটি ২০২৪ সালের ১৮জুন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউপিডিএফ যখন দিশেহারা তখন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে তারাতাদের ছায়া সংগঠন সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটিকে মাঠে নামায়। সংগঠনটিতে তাদের বিভিন্ন শাখার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ছাড়াও তাদের সমর্থিত নারী-পুরুষকে সম্পৃক্ত করে। এ সংগঠনটিতে সামনে সারী থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাবুধন চাকমা।

কে এ বাবুধন চাকমা?

বাবুধন চাকমা বর্তমানে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহবায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে সাজেক থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে দিতে এবং সাজেকে ধারাবাহিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি, সাধারণ মানুষকে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রতিবাদ এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও স্থানীয়দের সার্বিক নিরাপত্তা ও জানমাল রক্ষার দাবিতে ১১ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে সাজেকে সড়ক অবরোধের কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে। পূজার জন্য ১৬-২১অক্টেবর এ অবরোধ কর্মসূচি বন্ধ থাকলেও পূজার ছুটি শেষে এ অবরোধ কার্যক্রম আবারো সচল করা হয়।

অতীতে রাঙামাটির লংগদু উপজেলার মাইনী এলাকায় বসবাস করতেন বাবুধন চাকমা। আনুমানিক দেড় দশক আগে সাজেকের মাচালং বাজারে এসে ভাসমান কাপড় বিক্রি শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট, করেঙ্গাতলীতে ভাসমান কাপড় বিক্রি করেন।

মাচালং বাজার ইউপিডিএফ অধ্যুষিত শক্তিশালী অঞ্চল। ব্যবসার সুবিধা তার সাথে ইউপিডিএফ’র সখ্যতা গড়ে উঠে। মোটামুটি শিক্ষিত এবং চতুর হওয়ায় সহজে ইউপিডিএফ’র বিশ^স্থতা অর্জন করে ফেলেন তিনি।

কয়েক বছরের মধ্যে তিনি মাচালং বাজারে ইউপিডিএফ’র কালেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে তার কাজে সন্তুষ্টি হয়ে ইউপিডিএফ তাকে পুরো সাজেকের তাদের বিচার বিভাগের প্রধান করে।

পরবর্তী সময়ে তিনি ইউপিডিএফ’র বিচার বিভাগ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি তিনি সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমানে তিনি এ সংগঠনটির আহবায়কের দায়িত্ব পালন করছেন।

পাশাপাশি তিনি গঙ্গারাম উজোবাজার ব্যবসায়ী কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। বিয়ে করেছিলেন, বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী ইউনিয়ন থেকে। তার উজোবাজারে একটি কাপড় ও জুতোর দোকান রয়েছে। স্থানীয় জনগণ এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাজেকের মাচালং বন বিভাগের কার্যালয়ে হামলা ও ভাংচুরের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেছিলো বন বিভাগ। এ মামলার আসামীদের মধ্যে তিনি ছয় নম্বরে রয়েছেন। পুলিশের চোখে তিনি পলাতক হলেও সাজেকে ইউপিডিএফ’র হয়ে প্রকাশ্যে সামনের সারি থেকে অবরোধের মতো কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।

ইউপিডিএফ’র কেন্দ্রীয় সংগঠক ও মুখপাত্র মাইকেল চাকমা বলেন, সাজেক নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী একটি নাটক করেছে। তারা বল প্রয়োগ করে পর্যটকদের নিয়ে আসার নামে অবরোধ ভাঙ্গার চেষ্টা করেছিলেন। যারা সাজেক নিয়ে যৌক্তিক আন্দোলন করছে তাদের সাথে ইউপিডিএফ’র কোন সম্পৃক্তা নেই। যারা আন্দোলন করছে তাদের মধ্যে কৃষক, ব্যবসায়ী, কার্বারী রয়েছেন। তবে তাদের এ আন্দোলনে আমাদের সংহতি আছে বলে যোগ করেন তিনি।

তবে এ ব্যাপারে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সংক্ষেপে পিসিজেএসএস দলের কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার