বিজ্ঞাপন
নামাজ নিয়ে বক্তব্যের খণ্ডিত ভিডিও ভাইরাল, বিপাকে হিন্দু শিক্ষক
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৭ এএম
বিজ্ঞাপন
স্কুলে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য নামাজ বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শিরিন হক পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায়। স্কুলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা তার এই পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করলেও প্রতিপক্ষরা তাঁর বক্তব্যের খণ্ডিত একটি অংশ প্রচার করে এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
মূল ঘটনা হলো, ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে সমর কৃষ্ণ রায় নামাজ নিয়ে দীর্ঘ একটি বক্তব্য দেন। সেই বক্তব্যে তাঁকে শিক্ষার্থীদের জন্য নামাজ বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিতে শোনা যায়। বারবার তিনি নামাজের গুরুত্ব তুলে ধরেন। একটি বাক্যে বলেন, নামাজ না পড়লে ১০ মার্ক কেটে নেওয়া হবে। এখানে ভুল করে ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে।
সমর কৃষ্ণের অভিযোগ, তাঁর প্রতিপক্ষরা বক্তব্যের এই অংশটুকু কেটে প্রচার করছেন। পুরো বক্তব্যের ভিডিও তিনি কালবেলাকে পাঠিয়ে সবাইকে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান।
আসল ভিডিওতে নামাজ, ধর্ম ও মহানবীকে নিয়ে তিনি আবেগী বক্তব্য দেন। এ ছাড়া ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠান সুন্দর করতে তার প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে আগত অতিথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি অনুষ্ঠানটি বড় পরিসরে আয়োজন করতে তিনি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করেছেন, সেটিও বক্তব্যে তুলে ধরেন। কিন্তু এত দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বক্তব্যের মাত্র ৬ সেকেন্ড ভাইরাল করা হয়েছে!
এদিকে, রোববার (১১ অক্টোবর) এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। তারা সঠিক তথ্য তুলে ধরার দাবি জানায়। প্রধান শিক্ষকও বক্তব্য দেওয়ার সময় অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ার কথা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম বলেন, ‘আমি এই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এবং মুসলিম। সাংবাদিকতা আমাদের সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে মুসলিম ধর্মের প্রতি তাঁর আগ্রহ ও শ্রদ্ধা দেখেছি। তিনি মুসলিম ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করেন এবং ছাত্রীদের নামাজ পড়তে উৎসাহ দেন। সম্প্রতি নামাজের জন্য একটি কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন এবং প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকার জায়নামাজ কিনে দিয়েছেন বলে আমি জানি।
তিনি বলেন, কোনো ছাত্রী নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় তার ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে। কিন্তু কিছু সাংবাদিক কী কারণে এমন একটি বক্তব্য প্রচার করেছেন, তা আমার বোধগম্য নয়। আমরা চাই, বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করা হোক এবং প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা হোক।’
তিনি আরও বলেন, চার-পাঁচ-সাত বছর আগের পরীক্ষার খাতা, পুরোনো নোট ও শিক্ষকদের সৌজন্যে পাওয়া গাইড বইয়ের কার্যকারিতা থাকে না। অফিস স্থানান্তরের সময় এসব পুরোনো কাগজপত্র সরানো হয়। ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানের খরচের জন্য কমিটির অনুমোদন ও রেজুলেশন অনুযায়ী প্রায় ৬০০ কেজি পুরোনো খাতা ও বই ১০ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। বিক্রির টাকা প্রধান শিক্ষক নিজের হাতে নেননি; অনুষ্ঠানের আয়োজক কমিটির মাধ্যমে তা ব্যয় করা হয়েছে। সেখানে বোর্ডের প্রকাশিত পাঠ্যবই বিক্রি করা হয়নি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নীলা বলেন, ‘স্যার আমাদের নামাজ পড়ার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও মুসলিম ছাত্রীদের নামাজ পড়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেন। আমাদের জন্য কার্পেট ও জায়নামাজের ব্যবস্থা করেছেন। নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে বলেও তিনি বলেছেন। তবে আমরা মনে করি, স্যারের বক্তব্যের বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। আমরা এর প্রতিবাদ জানাতে চাই।’
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাবাসসুম বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকরা প্রতিদিন নামাজ পড়ার বিষয়ে খোঁজ নেন এবং নামাজের জন্য উৎসাহ দেন। স্যারের যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণভাবে প্রচার করা হয়নি বলে আমাদের মনে হয়েছে। স্যার নামাজ না পড়লে ১০ নম্বর কম দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু বক্তব্যের ‘না’ শব্দটি বাদ দিয়ে প্রচার করায় তাঁর সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা চাই, যে সংবাদ প্রচার করা হবে, তা যেন সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে হয়।’
শিক্ষার্থী আয়েশা তাহাসিন পুথি বলেন, ‘আমাদের প্রধান শিক্ষক কখনো কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেন না। মুসলিম ছাত্রীদের নামাজ পড়ার জন্য তিনি একটি সুন্দর কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন। ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁর কথার একটি অংশ ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা চাই, পুরো বক্তব্য বিবেচনা করে সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হোক। স্যার ক্লাসের সময় থাকলেও ছাত্রীদের নামাজ আদায়ে উৎসাহ দেন।’
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা শারমিন খাতুন বলেন, ‘আমাদের প্রধান শিক্ষক ধর্মীয় বিষয়ে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করেন না। তিনি বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই ছাত্রীদের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, মেয়েরা যেন ঠিকমতো নামাজ পড়ে। নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় ১০ নম্বর কম দেওয়ার কথাও তিনি ধর্মীয় শিক্ষককে বলেছেন।’
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমাদের প্রধান শিক্ষক ধর্মীয় বিষয়কে আলাদা করে দেখেন না। বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই তিনি সবাইকে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার কথা বলে আসছেন। মুসলিম ছাত্রীদের নামাজ আদায়ের জন্য তিনি আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন এবং সেটি সাজানোর জন্য অর্থও ব্যয় করেছেন। ধর্মীয় শিক্ষককে তিনি বলেছেন, কোনো ছাত্রী নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে।’
প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় বলেন, ‘আমি হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও মুসলিম ছাত্রীদের নামাজের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করেছি এবং প্রায় ২২ হাজার টাকার জায়নামাজ কিনেছি। নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় ১০ নম্বর কেটে নেওয়ার কথা বলেছি। তবে বক্তব্য দিতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে যায়। এ অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কাউকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্য আমার ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘কমিটির অনুমোদনে পুরোনো খাতা ও নোট বিক্রি করে পাওয়া ১০ হাজার ৫০০ টাকা ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে ব্যয় করা হয়েছে। শিক্ষকদের ও ছাত্রীদের কাছ থেকেও টাকা সংগ্রহ করা হয় এবং বিদ্যালয়ের সভাপতি আর্থিক সহযোগিতা করেন। অনুষ্ঠানে প্রায় ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। মুসলিম ধর্মের প্রতি অসম্মান থাকলে এত আয়োজন করে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করতাম না।’
এ বিষয়ে ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান বলেন, ‘সাংবাদিকেরা হচ্ছেন সমাজের দর্পণ। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। তাই কোনো বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা সঠিক তথ্য তুলে ধরুন। সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে উপস্থাপন করুন। আমি পুরো বক্তব্যটি দেখেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রধান শিক্ষক অসাবধানতাবশত কথাটি বলে ফেলেছেন। পরে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তাই বিষয়টি সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে সংবাদ প্রকাশ করার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’